আমাদের তথ্য ভাণ্ডার এখনও সমৃদ্ধ হয়নি তাই আমরা এখনও জানি না আনাট কিভাবে বাআলকে পুনরায় জীবিত করেছিল। বাআল আর মট দু’জনেই ঐশ্বরিক, সেজন্যই কাউকে পুরোপুরি নাশ করা সম্ভব না। দু’জনের ভিতরে সংঘর্ষ চলতেই থাকবে, এবং মৃত্যুর থাবা বাঁচিয়ে প্রতি বছর শস্য ঘরে তোলা হবে। পুরাণের একটা ভাষ্যে আছে, আনাট বাআলকে এতটাই পরিপূর্ণভাবে একত্রিত করে যে মট পরবর্তীকালে তাকে আক্রমণ করলে সে পূর্বাপেক্ষা তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে তার জবাব দিতে সক্ষম হয়। বৃষ্টি পৃথিবীতে ফিরে আসে, উপত্যকায় মধুর নহর বইতে আরম্ভ করে এবং স্বর্গের মূল্যবান তেল বৃষ্টির আকারে বর্ষিত করে। বাআল আর আনাটের শারীরিক মিলন দিয়ে গল্পটা শেষ হয়, পরিপূর্ণতা এবং সমাপ্তির একটা ছবি, প্রতি বছর নবান্নের সময় ধর্মীয় প্রার্থনার ভঙ্গিতে বার বার যা অভিনীত হয়।
মিশরে আমরা একই ধরনের পুরাণ দেখতে পাই তবে আনাটের চেয়ে আইসিস অনেক দুর্বল। ওসিরিস, মিশরের প্রথম সম্রাট, তার লোকদের চাষাবাদের জ্ঞান দান করেন। তার ভাই সেথ ছিল, সিংহাসনপ্রত্যাশী, সে তাকে হত্যা করে এবং আইসিস তার বোন এবং স্ত্রী সারা পৃথিবী তার দেহের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। সে যখন মৃতদেহ খুঁজে পায়, সে তাকে সামান্য সময়ের জন্যেই পুনর্জীবিত করতে পারে যখন সে তার এক পুত্র হোরাসকে তার বংশ রক্ষার জন্য রাজি করায় তার পরেই সে আবার মারা যায়। তারপরে ওসিরিসের শরীর টুকরো টুকরো করে কাটা হয় এবং প্রতিটা খণ্ড বীজের ন্যায়, মিশরের বিভিন্ন অংশে রোপণ করা হয়। সে মৃতদের পৃথিবী দোয়াতের শাসনকর্তা হয় এবং প্রতি বছর নবান্ন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব তারই, তার মৃত্যু এবং অঙ্গহানি, শস্য কাটা এবং ঝারাইয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় আচারের ভঙ্গিতে অভিনীত হয়। মৃতের দেবতা প্রায়শই ফসলেরও দেবতা, জীবন আর মৃত্যু অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত সেটাই দেখায়। একটাকে ছাড়া আরেকটাকে পাওয়া সম্ভব না। দেবতা মারা গিয়ে আবার প্রাণ ফিরে পাওয়া একটা বিশ্বজনীন প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে অনেকটা ঋতুর আগমন আর বিদায় নেবার মতো। নূতন প্রাণের আবাহন হয়তো হবে কিন্তু এসব পুরাণের মূল বৈশিষ্ট্য এবং শস্যদায়ী দেবতার মৃত্যুর এই প্রথা সবসময়েই বিপর্যয় আর রক্তপাতে মেদুর এবং প্রাণের শক্তির বিজয় কখনও সমাপ্ত হয় না।
পারস্যের দেবী ইনানার পাতাল প্রবেশের ঘটনা যে পুরাণে বিবৃত হয়েছে সেখানে এটা পরিষ্কার বোঝা যায়। দিকশূন্যপুরে আরেকটা অভিমন্ত্রণের যজ্ঞ হিসাবে এটাকে দেখা যেতে পারে, মৃত্যুর অভিজ্ঞতা যা নতুন জীবনের সূচনা করবে। পৃথিবীর গর্ভে ইনানার এই বিপদসঙ্কুল যাত্রার পেছনে তার কোনো শুভ উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের সূত্র ঘেঁটে, যা অসম্পূর্ণ, আমরা যতদূর বলতে পারি, তার উদ্দেশ্য ছিল তার বোন এরেসকিগাল, নরকের রানী, যে আবার অন্যদিকে প্রাণের সঙ্গী, তার রাজ্য অন্যায়ভাবে দখল করা। এরেসকিগালের লাপিস লাজুলি প্রাসাদে প্রবেশের আগে বোনের শহরের সাতটা দেয়ালের সাতটা দরজা তাকে অতিক্রম করতে হবে। প্রতিবার দ্বাররক্ষী ইনানাকে থামার নির্দেশ দিয়ে পরিচয় জানতে চায় এবং তাকে বাধ্য করে তার পরিধেয় বস্ত্রের একটা অংশ ত্যাগ করতে, এভাবে অবশেষে বোনের সামনে হাজির হলে দেখা যায়, ইনানা তার সব রক্ষাকবচ খুইয়ে ফেলেছে তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পাতালের সাত বিচারক ইনানাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় এবং তার শবদেহ একটা শূলে গেঁথে প্রদর্শনের জন্য রেখে দেয়া হয়।
ইনানাকে অবশ্য অন্য দেবতারা উদ্ধার করে এবং এক দঙ্গল শয়তানের সাথে পৃথিবীতে তার প্রত্যাবর্তন ভয়ংকর এবং উল্লাসপূর্ণ। সে যখন প্রাসাদে ফিরে আসে, দেখে তার সুদর্শন তরুণ মেষপালক স্বামী দুমুজি, তার সিংহাসনে বসার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। ক্রোধে কুপিত হয়ে, ইনানা তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে, দুমুজি পালায়, শয়তানের প্ররোচনা তাকে বাধ্য করে পাতালে গিয়ে ইনানার স্থান নিতে কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা সমঝোতা হয়, সেখানে দুমুজি আর তার বোন জেসটিনানার মাঝে বছরকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়, প্রত্যেকেই এরেসকিগালের সাথে পাতালে ছয়মাস পর্যায়ক্রমে কাটাবে। কিন্তু ইনানার অভিযানের ফলে পৃথিবীর চিত্র চিরকালের মতো বদলে যায়, দুমুজি অনুপস্থিত বিধায়, এখন শস্যের নতুন দেবতা ঋতু পরিবর্তন ঘটাতে থাকেন। সে যখন ইনানার কাছে ফিরে আসে, মেষশাবকের জন্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবী প্রাণবন্ত হয়ে উঠে, এবং শস্যে ফুল ফুটতে শুরু করে, দ্রুত নবান্ন এসে হাজির হয়। সে যখন পাতালে চলে যায় তখন পৃথিবীতে গ্রীষ্মের দাবদাহ লম্বা খরা বয়ে আনে। মৃত্যুর উপরে কেউ চূড়ান্তভাবে জয়ী হতে পারে না। যে সুমেরীয় কবিতায় এই পুরাণটা বিধৃত হয়েছে সেটা শেষ হয়েছে একটা আর্তির মধ্য দিয়ে : এরিসকিগাল! তোমার প্রশংসা মহান![৩৭] যেটকু মনে থাকে তা নারীর মর্মান্তিক বিলাপ, বিশেষ করে, দুমুজির মা, যখন নিজের সন্তান হারাবার জন্য শোক প্রকাশ করে, ‘একটা নিঃসঙ্গ স্থানে একাকী; যেখানে সে এক সময় জীবিত ছিল, এখন ভূমিশয্যা নিয়েছে যুবা ষাড়ের মতো’।[৩৮]
আমাদের এই ধরিত্রী দেবী ত্রাণকর্তা নন, বরং মৃত্যু আর কষ্টের কারণ। তার যাত্রা একটা, পরিবর্তনের আচার যা আমাদের প্রত্যেকের জন্যই প্রয়োজনীয়। ইনানা পাতালে যায় তার বোনের সাথে দেখা করতে, তার নিজের সত্তার একটা চাপা পড়া অশঙ্কিত রূপ। এরেসকিগাল চূড়ান্ত বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। মূলত এসময় থেকেই, অনেক পুরাণে, ধরিত্রী দেবীর সাথে দেখা হওয়াটাকেই নায়কের চূড়ান্ত অভিযান হিসাবে দেখানো হয়, চরম উদ্ভাসন। জীবন ও মৃত্যুর দয়িতা এরেসকিগালও একজন ধরিত্রী দেবী, যিনি ক্রমাগত জন্ম দিয়ে চলেছেন। তার নিকটে পৌঁছাতে চাইলে, এবং সত্যিকারের অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে হলে, ইনানাকে তার কাপড় সরিয়ে রেখে যা তার ঘাতোপযোগিতাকে রক্ষা করে, আত্মপ্রচার জলাঞ্জলি দিয়ে, নিজের পুরাতন সত্তাকে হত্যা করে, যা আপাতদৃষ্টিতে তার বিপরীত আর বৈরী তাকে আত্তীকৃত করে, এবং অসহ্যকে গ্রহণ করে : যথা, মৃত্যু অনুকার এবং বঞ্চনা ব্যতীত কোনো জীবন থাকতে পারে না।[৩৯]
