নিওলিথিক বিবর্তন সৃষ্টিকারী শক্তির উপস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলে যা পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। প্রথমে এটা ছিল পার্থক্যরহিত একটা পবিত্র শক্তি, যা পৃথিবীকে দিব্যের প্রকাশে বাধ্য করেছিল। কিন্তু পৌরাণিক কল্পনা সবসময়ে ধীরে ধীরে, নিরেট এবং পূর্ণ তথ্যজ্ঞাপক হয়ে উঠে; শুরুতে যা ছিল নিরাকার তার সংজ্ঞা নির্ণীত হয় এবং সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। আকাশের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে ঠিক যেভাবে আকাশ দেবতার মানবিককরণ সম্পন্ন হয়েছে মাতৃপ্রতিম প্রতিপালনকারী পৃথিবী ঠিক একইভাবে ধরিত্রী মাতার রূপ গ্রহণ করেছে। সিরিয়াতে তাকে বলা হয় আশেরাহ্, এল এর সঙ্গী, ঊর্ধ্ব দেবতা বা আনাট্, এল এর কন্যা; পারস্যের সুমের অঞ্চলে একে বলা হয় ইনাননা; মিশরে, আইসিস, গ্রীসে সে পরিণত হয় হেরা, ডিমিতির এবং অ্যাফ্রোডাইটে। শিকারী সমাজের মহান মাতার সাথে ধরিত্রী মাতা অঙ্গীভূত হয়ে তার ভয়ংকর গুণাবলী অনেকাংশে অক্ষুণ্ণ রাখেন। আনাট, যেমন এক নির্মম যোদ্ধা, প্রায়ই রক্তের সমুদ্রের মাঝে হেঁটে যাচ্ছে এমনভাবে তাকে চিত্রিত করা হয়; ডিমিতিরকে বলা হয়েছে প্রতিশোধপরায়ণ এবং চণ্ড এমনকি অ্যাফ্রোডাইটে ভালবাসার দেবী তিনিও ভয়ংকর প্রতিশোধ নিয়ে থাকেন।
আবার অন্যদিকে পুরাণ পলায়নী প্রবৃত্তিসম্পন্ন না। নতুন নিওলিথিক পুরাণ মৃত্যুর বাস্তবতা স্বীকার করার জন্য মানুষকে বাধ্য করে। এগুলো কেবল পল্লীজীবনের সহজ সরল দৃশ্যপট ব্যাখ্যাকারী না। এবং ধরিত্রী মাতাও নমনীয় উপশমকারী দেবী নন, কারণ কৃষিকাজকে শান্তিপূর্ণ ধ্যানমগ্ন পেশা হিসাবে বিবেচনা করা হতো না। এটা ছিল একটা চলমান যুদ্ধ প্রক্রিয়া, মরিয়া সংগ্রাম, খরা, বন্ধ্যাত্ব, দুর্ভিক্ষ আর প্রকৃতির প্রলয়ংকরী শক্তির বিরুদ্ধে, যা কিনা আবার দিব্য শক্তি হিসাবেও প্রতিভাত।[৩৪] ফসল রোপণের কল্পিত যৌনতার মানে অবশ্য এই না যে মানুষও কৃষিকাজের অভিজ্ঞতাকে প্রণয়াভিসার হিসাবে দেখতো। মানুষের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া মা এবং নবজাতকের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে, কঠিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেই কেবল ভূমি কর্ষণের কাজ সমাপ্ত হয়। জেনেসিসে, আদিম স্বর্গীয় দশার বিলুপ্তিকে কৃষিকাজে নিয়োজিত হওয়া হিসাবে বিবেচিত হয়। ইডেনে, প্রথম মানবসন্তানেরা অনায়াসে ঈশ্বরের বাগানের যত্ন নিত। পতনের পরে, নারী তার সন্তানকে দুঃখের মাঝে নিয়ে আসে, এবং পুরুষকে কপালের ঘাম ঝরিয়ে মাটির কাছ থেকে আহার্য আহরণ করতে হয়।[৩৫]
প্রাচীন পুরাণে, কৃষিকাজকে সহিংসতা হিসাবে বিবেচনা করা হতো এবং মৃত্যু আর ধ্বংসের দিব্য শক্তির বিরুদ্ধে একটা ক্রমাগত যুদ্ধ প্রক্রিয়া। পৃথিবীর অভ্যন্তরে বীজকে যেতে হবে– এবং ফসল উৎপাদনের নিমিত্তে নিজেকে আত্মত্যাগ করতে হবে এবং এই মৃত্যু কষ্টকর এবং অভিজ্ঞতাবহুল। চাষাবাদের অনুষঙ্গসমূহকে আয়ুধের মতো দেখতে লাগতো, শস্যদানাকে অবশ্যই গুঁড়ো করে ফেলতে হবে, এবং আঙ্গুর থেকে ওয়াইন উৎপাদনের আগে তাকে বিকৃত মণ্ডে পরিণত করতে হবে। ধরিত্রী দেবী সম্পর্কিত পুরাণে আমরা এসব দেখতে পাই, তার সব সহচরদের নির্মমভাবে ছিঁড়ে টুকরা করা হয়, অঙ্গহানি ঘটে এবং নিষ্ঠুরভাবে কেটে ফেলে হত্যা করা হয়, নতুন জীবন নতুন শস্যের সাথে পুনরায় মাথা তোলার আগে। মৃত্যু পর্যন্ত সংগ্রামের কথাই ধ্বনিত হয় এসব পুরাণে। প্যালিওলিথিক যুগ থেকে শুরু হওয়া বীরোচিত পুরাণে, প্রায়শই এক বীর পুরুষ বিপদসঙ্কুল পথ অতিক্রম করে তার লোকদের জন্য সাহায্য নিয়ে আসততা। নিওলিথিক বিবর্তনের পরে, পুরুষদের প্রায়শই অসহায় এবং জড় হিসাবে দেখা যায়। এখানে আমরা এক নারী ঈশ্বরীকে খাদ্যের সন্ধানে পথিবীব্যাপী ঘুরে বেড়াতে দেখি, মৃত্যুর সাথে সংগ্রাম করে সে মানবজাতির জন্য পুষ্টি বয়ে আনে। ধরিত্রী মাতা নারীর বীরত্বের প্রতাঁকে পরিণত হয় পুরাণে যা শেষ পর্যন্ত ভারসাম্য এবং সম্প্রীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথাই বলে।
ঝড়ের দেবী, বাআলের বোন এবং স্ত্রী, আনাটের পুরাণে একটা বিষয় পরিষ্কার যা কেবল কৃষিকাজের কষ্টের কথাই রূপায়িত করে না সাথে সম্প্রীতি এবং পরিপূর্ণতা অর্জনের শ্রমসাধ্যতার কথাও বলে। বাআল, রোদে বিদীর্ণ হয়ে যাওয়া পৃথিবীর বুকে যে বৃষ্টি ঝরায়, সে নিজে বিশৃঙ্খলা আর বিচ্ছিন্নতার দানবদের সাথে সৃষ্টিশীল সংঘাতে সতত লিপ্ত থাকে। একদিন, মৃত্যু, খরা আর বন্ধ্যাত্বের দেবতা তাকে আক্রমণ করে, যে পৃথিবীকে বিচ্ছিন্ন প্রান্তরে পরিণত করার হুমকি ক্ৰমাগত দিতে থাকে। মটের হুমকির মুখে, বাআল একবার ভয় দমন করে কোনো ধরনের প্রতিরোধ না গড়ে তার কাছে আত্মসমর্পণ করে। মট তাকে উপাদেয় ভেড়ার মাংসের মতো চিবিয়ে খায় এবং তাকে জোর করে পাতালে মৃতদের রাজ্যে পাঠিয়ে দেয়। বাআল আর পৃথিবীতে বর্ষা আনতে পারে না, গাছগাছালি পানির অভাবে শুকিয়ে মারা যেতে শুরু করে, চারপাশ থেকে বিলাপের সুর ভেসে আসে। এল বাআলের বাবা- এক আদর্শ আকাশ দেবতা- অসহায়। তিনি যখন বাআলের মৃত্যুর খবর জানতে পারলেন, উঁচু সিংহাসন থেকে নেমে এসে ছেঁড়া কাপড় পরিধান করেন, এবং শোকের সনাতন কৃত্য অনুযায়ী নিজের গালে ক্ষত সৃষ্টি করেন, কিন্তু তারপরেও ছেলেকে বাঁচাতে পারেন না। আনাট্ একমাত্র কার্যকর দেবী। দুঃখ আর ক্ষোভে ভারাক্রান্ত, সে সমগ্র পৃথিবী, ক্ষ্যাপার মতো নিজের অল্টার ইগো, তার বাকী অর্ধাংশের খোঁজে দাপিয়ে বেড়ায়। যে সিরিয়ান পুঁথিতে এই পুরাণটা সংরক্ষিত আছে সেখানে বলা হয়েছে যে সে বাআলের জন্য ব্যাকুল হয়েছে ‘গাভী যেমন বাছুরের জন্য ভেড়ী যেমন তার শাবকের জন্য’ হয়ে থাকে।[৩৬] সন্তানেরা যখন বিপদগ্রস্ত হয় তখন ধরিত্রী দেবী জন্তুর মতোই হিংস্র এবং নিয়ন্ত্রণের অতীত হয়ে পড়েন। আনাট বাআলের দেহাবশেষ খুঁজে পেলে তার সম্মানে সে এক যজ্ঞের আয়োজন করে এবং এলের উদ্দেশে একটা আবেগময় অভিযোগ উচ্চারণ করে, কিন্তু মটকে খোঁজা থেকে সে বিরত থাকে না। সে যখন তাঁকে খুঁজে পায়, পূজোয় ব্যবহৃত কাস্তে দিয়ে চিরে তাকে সে দু’টুকরো করে ফেলে, ঝাঁঝরি দিয়ে শস্যদানা চালার মতো করে তাকে চালে, আগুনে পোড়ায়, জাঁতায় ফেলে পেষে এবং তার মাংস সারা প্রান্তরে ছড়িয়ে দেয় ঠিক যেমন একজন কৃষক তার শস্যের সাথে ব্যবহার করে।
