ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধের সাথে কৃষিকাজের এই নতুন জ্ঞান।[২৮] প্যালিওলিথিক পর্বের লোকেরা শিকারকে পবিত্র কাজের মর্যাদা দিত এবং এখন কৃষিকাজও একটা পবিত্র সংস্কারে পরিণত হয়। জমি চাষ করার সময়ে বা শস্য কাটবার সময়ে কৃষকদের রীতিমতো আচার অনুষ্ঠান পালন করে পবিত্র থাকতে হতো। ফসলের বীজকে তারা মাটির গভীরে প্রবেশ করতে দেখে এবং অনুধাবন করে যে অন্ধকারে খোলস ছেড়ে বীজ জীবনের ভিন্নমাত্রার চমকপ্রদ রূপ সামনে নিয়ে আসে, রোপয়িতা তখন অন্তরালে কর্মরত গোপন শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়। শস্য আমাদের কাছে একটা বার্তা নিয়ে আসে, দিব্যশক্তির প্রকাশ ঘটায় এবং কৃষকরা জমি চাষ করে যখন গোষ্ঠীর লোকদের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে, তারা অনুভব করে একটা পবিত্র পরিবেশে তারা প্রবেশ করেছে এবং এক অলৌকিক প্রাচুর্যের ভাগীদার হয়েছে।[২৯] সব প্রাণীকেই পৃথিবী ধারণ করার ক্ষমতা রাখে- গাছপালা, মানুষ এবং জীবজন্তু- অনেকটা জীবন্ত মাতৃজঠরের মমতায়।
কৃত্যানুষ্ঠানগুলো পরিকল্পিত হয়েছিল এই ক্ষমতা যাতে নিঃশেষ না হয়ে নিজেকে পুনরায় ঋতুমতী করতে পারে। প্রথম শস্যদানা ‘পরিত্যাগ’ করা হতো উৎসর্গ হিসাবে, বাগানের প্রথম ফলটা ছোঁয়া হতো না, এসবই করা হতো পবিত্র শক্তিকে পুনরায় খাদ্য উৎপাদনক্ষম রাখতে। এমন নজিরও পাওয়া গেছে যে মধ্য আমেরিকায়, আফ্রিকার কিছু অংশে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলসমূহে এবং দ্রাবিড় ভারতবর্ষে নরবলি পর্যন্ত উৎসর্গ করা হতো। এসব কৃত্যানুষ্ঠানের মূলে ছিল দুটো মূলনীতি। প্রথম, কোনো কিছু উৎসর্গ না করে কিছু পাবার আশা তুমি করতে পার না; কিছু পেতে হলে তাই তোমাকেও কিছু দিতে হবে। দ্বিতীয়টা বাস্তবতার পবিত্র অন্তজ্ঞান। প্রাকৃতিক জগতের ঊর্ধ্বে কোনো বিমূর্ত বাস্তবতা হিসাবে পবিত্রতাকে অনুভব করা হতো না। পৃথিবী এবং তার অনুসঙ্গে কেবল তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা নিজেরাই পবিত্রতার স্মারকখচিত। মানুষ, দেবতা, পশুপাখি এবং গাছপালা একই প্রকৃতির মাঝে বিরাজমান এবং সেজন্য একে অন্যকে পূর্ণ প্রদীপ্ত পুষ্ট করতে পারবে।
মানুষের যৌনতার কথাই ধরা যাক, পৃথিবীকে ফলবতী উর্বরা করে যে দিব্য শক্তি তার সাথেই মূলত একে এক করে দেখা হতো। নিওলিথিক পুরাণ শুরুর দিকে, নবান্নকে দেখা হতো এই দিব্য বন্ধনের ফসল হিসাবে, একটা পবিত্র বিয়ে : মাটি হলো নারী; বীজগুলো পবিত্র বীর্য; এবং বৃষ্টি হলো স্বর্গ আর মর্ত্যের মহামিলন। ফসল বোনার সময়ে নারী পুরুষের শারীরিক মিলনে নিয়োজিত হওয়া ছিল একটা সাধারণ আচার অনুষ্ঠান। তাদের নিজস্ব মিলন নিজেই একটা পবিত্র কর্ম, মাটির উৎপাদনী শক্তিকে যা জাগিয়ে তুলবে, কৃষকের কোদাল বা লাঙল ঠিক যেন একটা সমুত্তেজিত পুরুষাঙ্গের প্রতীক যা পৃথিবীর উদর উন্মুক্ত করবে এবং বীজ দিয়ে, একে বড় করে তুলবে। বাইবেলে আমরা দেখতে পাই খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রাচীন ইসরাইলীদের পালনীয় রীতি রেওয়াজ হিসাবে বন্য যৌনোৎসব পালন করতে, যা হোসা আর এজিকিয়েলের মতো নবীদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে। জেরুজালেমের মন্দিরে পর্যন্ত আশেরাহ্ এর সম্মানে পূজার আয়োজন করা হতো, কানানের উর্বরতার দেবী এবং আম্রপালিদের বাসস্থান।[৩০]
নিওলিথিক বিবর্তনের শুরুর দিকে, অবশ্য পৃথিবীকে সব সময়ে রমণী হিসাবে গণ্য করা হতো না।[৩১] চীন এবং জাপানে ভূমির সত্তাকে ক্লীব হিসাবে গণ্য করা হতো এবং পরবর্তীকালে সম্ভবত সংসারে নারীর মমতাময়ী রূপ দেখে পৃথিবীকে নারীর রূপ আরোপিত করে মমতাময়ী রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অংশে পৃথিবীর উপরে কোনো মানবিক চরিত্র আরোপ করা হয়নি কিন্তু পবিত্র হিসাবে তাকে সম্মান করা হতো। নারীর শিশু জন্ম দেবার মতো সে তার উদর থেকে সবকিছুর জন্ম দিত। ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকায় প্রথম সৃষ্ট কিছু পুরাণ কল্পনা করেছে যে মানুষ গাছলতার মতোই প্রথমবার পৃথিবীর বুক চিরে আলোয় এসেছিল : গাছের মতোই, তাদের জীবন পাতালগর্ভে শুরু হয়েছিল যতক্ষণ না নতুন মানুষ পৃথিবী পৃষ্ঠে আবির্ভূত হয় বা ফুলের মতো প্রস্ফুটিত এবং মানব মা তাদের সংগ্রহ করে।[৩২] মানুষ এক সময় দিব্যের সাথে সাযুজ্য বিধান করতে
নিজেদের উচ্চতায় তোলার কথা কল্পনা করেছে সেই তারাই এখন পৃথিবীর পবিত্রতার সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য নানা আচার অনুষ্ঠান নির্মাণ করে। লাসাউক্সের প্যালিওলিথিক গুহার মতো নিওলিথিক গোলক ধাঁধা আবিষ্কৃত হয়েছে কিন্তু পার্থক্য হলো পাতালে পবিত্র জন্তুর সাথে সাক্ষাৎকারের বদলে উপাসনাকারীরা কল্পনা করত তারা ধরিত্রী মায়ের গর্ভে প্রবেশ করছে এবং সমস্ত প্রাণের উৎসে এক ধরনের মরমী প্রত্যাবর্তন ঘটাচ্ছে।[৩৩]
এই সমস্ত সৃষ্টি পুরাণ মানুষকে শিক্ষা দেয় পাথর, নদী আর গাছগাছালীর মতো তারাও একইভাবে পৃথিবীর অঙ্গীভূত। পৃথিবীর প্রাকৃতিক উত্থানপতনকে সম্মান জানানো তাই তাদের উচিত। অন্যেরা কোনো একটা স্থানের সাথে একটা গভীর একাত্মতা প্রকাশ করে, পরিবার বা পিতৃত্বের চাইতে গভীর কোনো বন্ধন। প্রাচীন গ্রীসে এই ধরনের পুরাণ বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ইরেকথোনিয়াস এথেন্সের পঞ্চম পৌরাণিক সম্রাট, আর্কোপলিসের পবিত্র ভূমি থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, একটা বিশেষ মন্দিরে বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই পবিত্র ঘটনাটা উদ্যাপিত হয়েছে।
