আবার, মানুষ যখন তাদের গোত্রের বীরদের এসব গল্প অন্যদের বলে, শ্রোতার মনোরঞ্জনই কেবল তারা আশা করে না। পুরাণ আমাদের বলে দেয় পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হতে চাইলে আমাদের কি করতে হবে। আমাদের প্রত্যেককেই জীবনের কোনো না কোনো একটা পর্যায়ে নায়কের ভূমিকা নিতে হবেই। জরায়ুর সংকীর্ণ গলিপথ দিয়ে প্রতিটা শিশুকেই জোর করে ঠেলে দেয়া হয়, লাসাউক্সের জটপাকানো সুড়ঙ্গপথের সাথে তার কি গভীর সখ্য, তাকে বাধ্য করা হয় মাতৃজঠরের নিরাপদ নিভৃত আশ্রয় ত্যাগ করতে এবং অপরিচিত পৃথিবীর ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রতিটা মা যে সন্তান জন্ম দেয় এবং নিজের সন্তানের মৃত্যুর ঝুঁকি নেয়, সেটাও বীরোচিত।[২৩] সবকিছু ত্যাগ করার জন্য তৈরি না থাকলে কেউ বীর হতে পারে না; অন্ধকারের গর্ভে অবক্রান্তি ব্যতীত আলোর উচ্চতায় উঠা সম্ভব না, মৃত্যুর স্পর্শ ব্যতীত নতুন প্রাণের আবাহন অসম্ভব। আমাদের জীবনে সবসময়েই আমরা অপরিচিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হই এবং বীরের পুরাণ বলে দেয় আমাদের আচরণ কি ধরনের হওয়া উচিত।
আমাদের অবশ্যই যাত্রা পথে শেষকৃত্যের মুখোমুখি হতেই হবে, যা মৃত্যুর মোহরখচিত।
পরবর্তীকালের পৌরাণিক সাহিত্যে প্যালিওলিথিক যুগের কিছু বীর স্থান পেয়েছে। গ্রীক দেবতা হেরাক্লিস, যেমন নিশ্চিতরূপেই শিকারী পর্বের টিকে থাকা স্মারক।[২৪] গুহামানবের মতো তার পরনে পশুর চামড়া এবং হাতে লাঠি। হেরাক্লিস একজন শামান, পশুপাখির ব্যাপারে, তার জ্ঞান সুবিদিত; তিনি পাতালে যান, অমরত্বের সন্ধানে এবং অলিম্পাস পাহাড়ে দেবতাদের রাজ্যে পৌঁছান।[২৫] আবার গ্রীক দেবী আর্টেমিসকে বলা হয় ‘পশুর কর্ত্রী’ একজন শিকারী এবং প্রকৃতিকে বশে রাখতে সাহায্যকারী, তিনিও প্যালিওলিথিক পর্বের একজন হতে পারেন।[২৬]
শিকার একান্তভাবে পুরুষদের কাজ এবং তারপরেও প্যালিওলিথিক পর্বের অন্যতম শক্তিশালী শিকারী একজন নারী। গর্ভবতী মহিলাকে বর্ণনা করে খোদিত অতিপ্রাচীন ক্ষুদ্রাকৃতি প্রস্তরমূর্তি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ আর আফ্রিকা জুড়ে যা পাওয়া গেছে, সবই এই পর্বের। আর্টেমিসকে গ্রীক দেবীরূপে কেবল আত্মস্থ করা হয়েছে, ভীতিকর দেবী যে পশুদের কর্ত্রীই কেবল না সেই সাথে প্রাণের উৎসও বটে। প্রতিপালনকারী মমতাময়ী মা না বরং নিষ্করুণ, প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং স্বার্থপর। শিকারের পূর্বে আচরিত কৃত্য পালনে ভুল হলে, রক্তপাত আর বলি আদায়ের কারণে কুখ্যাত। এই পরাক্রমশালী দেবী প্যালিওলিথিক পর্ব ভালো করেই উতরে এসেছেন। তুরস্কের কাটাল হুইউক শহরে, সপ্তম কি অষ্টম সহস্রাব্দের, জন্মদানের প্রক্রিয়ায় রত দেবীদের চিত্র খোদাই করা বিশাল বিশাল পাথরের চাই প্রত্নতত্ত্ববিদরা খুঁজে পেয়েছেন। তাকে বেষ্টন করে থাকে কখনও পশুর দল, মহিষের শিং বা শূকরের করোটি– সফল শিকারের স্মারক বা কখনও পুরুষের প্রতিকৃতি।
প্রবলভাবে পুরুষ শাসিত সমাজে একজন দেবী কিভাবে এতটা পরাক্রমশালী হয়ে উঠেন? হয়তো নারীর প্রতি অবচেতন বিরক্তিই এর কারণ। কাটাল হুইউকের দেবী অনন্তকাল ধরে জন্ম দিয়ে যান কিন্তু তার সঙ্গী ষাড়কে নিশ্চিত মৃতুবরণ করতে হবে। নারী এবং শিশুদের বাঁচাতে শিকারীরা নিজের প্রাণ বিপন্ন করে। শিকারের কারণে উদ্ভূত দুশ্চিন্তা আর অপরাধবোধ সাথে পালনীয় কৌমার্য থেকে উৎপন্ন হতাশা একজন শক্তিশালী নারীর চিত্র প্রক্ষেপ করতে পারে, যে, নিরন্তর রক্তপাত দাবী করে।[২৭] শিকারীদের কাছে সেই মহিলাটা নতুন প্রাণের উৎস- তাদের কারণে– খরচযোগ্য পুরুষরা না– গোত্রের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়। নারী এভাবেই জীবনের সম্ভ্রম উদ্রেককারী প্রতাঁকে পরিণত হয়– একটা জীবন যা পুরুষ আর পশুর বিরামহীন বলি দাবী করে।
আমাদের প্যালিওলিথিক অতীতের এসব খণ্ডিত অংশ দেখায় যে, পুরাণতত্ত্ব সর্বরোগ নিরাময়কারী, কোনো উপায় না। জীবন আর মৃত্যুর নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে এটা মানুষকে সাহায্য করে। মানুষের একটা বিয়োগান্তক অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে। স্বর্গের উচ্চতায় পৌঁছাবার জন্য তারা ব্যগ্র যদিও বুঝতে পারে যে নিজেদের নশ্বরতার মুখোমুখি হলেই কেবল সেটা সম্ভব। নিরাপদ পৃথিবী ত্যাগ করে, পাতালে অবতরণ করতে হবে এবং নিজের পুরাতন সত্তার মৃত্যু ঘটাতে হবে। পুরাণতত্ত্ব আর এর সাথে আচরিত কৃত্যানুষ্ঠান প্যালিওলিথিক পর্বের মানুষকে জীবনের একটা স্তর থেকে অন্য স্তরে নিতে সাহায্য করেছে এমনভাবে যখন মৃত্যু এসে উপস্থিত হয় তখন সেটাকে সম্পূর্ণ অজানা সত্তায় চূড়ান্ত এবং শেষ অভিমন্ত্রণ হিসাবে দেখা যায়। এই সব প্রাচীন অন্তজ্ঞান কখনও লুপ্ত হয়নি যখনই মানব ইতিহাসের পরবর্তী মহান বিবর্তনের পর্যায় শুরু হয়েছে সে তাদের পথ দেখিয়েছে।
৩. নিওলিথিক পর্ব : কৃষাণের পুরাণ কথা
(অষ্টম সহস্রাব্দ থেকে চতুর্থ সহস্রাব্দ)
আনুমানিক দশ হাজার বছর আগে মানুষ কৃষিকাজ রপ্ত করে। শিকার এখন আর খাদ্যের প্রধান উৎস না কারণ তারা আবিষ্কার করেছে পৃথিবী নিজেই খাদ্যের আপাত অফুরন্ত উৎস। কৃষিভিত্তিক নিওলিথিক বিবর্তনের চেয়েও মানবজাতির জন্য কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। অগ্রবর্তী এসব কৃষকদের সম্ভ্রমমিশ্রিত ভয়, আনন্দ আর আতঙ্ক আমরা অনুভব করি, নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেবার সময়ে তাঁরা যে পুরাণের নির্মাণ করেছিল, পরবর্তীকালের সংস্কৃতির পৌরাণিক আখ্যানে তা খণ্ডিতভাবে রক্ষিত আছে। লোগোসের ফসল হলো কৃষিকাজ কিন্তু আমাদের আজকের প্রযুক্তিগত বিবর্তনের মতো, একে সম্পূর্ণ লোকায়ত উদ্যোগ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া যাবে না। এর দায় বর্তায় একটা মহান আধ্যত্মিক জাগরণের উপরে যা মানুষকে তাদের পৃথিবী এবং নিজেদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন ধারণা দেয়।
