কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই সুন্নী মুসলিমদের একত্রিতকারী মূল বা প্রধান উপাদানটি ছিল রাজনৈতিক। সমাজের গৃহীত আকারে ঈশ্বর অনুভূত হন এবং এটা একজন মুসলিমের ব্যক্তিগত ধার্মিকতাকে প্রভাবিত করে। সুন্নী মুসলিমদের সবাই মুহাম্মদ(স:) এবং চার রাশিদুনের সকলকে শ্রদ্ধা করে থাকে। উসমান বা আলীর ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই শাসকগণ ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে সমসাময়িক সকল শাসককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। সুন্নীরা শিয়াদের মত প্রথম তিন রাশিদুনকে অবজ্ঞা করে না; শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী কেবল আলীই উম্মাহ্ বৈধ ইমাম ছিলেন। সুন্নী ধার্মিকতা শিয়াদের ট্র্যাজিক দৃষ্টিভঙ্গির তুলনায় অনেক বেশী আশাবাদী। এখানে সুদৃঢ় ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, এমনকি ব্যর্থতা এবং বিরোধের সময়ও ঈশ্বর উম্মাহর সঙ্গে থাকতে পারেন। সমাজের ঐক্য এক পবিত্র মূল্য, কেননা তা ঈশ্বরের একত্ব প্রকাশ করে। এটা যেকোনও সাম্প্রদায়িক বিভাজন থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং শান্তির স্বার্থে খলিফাঁদের সুস্পষ্ট দোষত্রুটি সত্ত্বেও বর্তমান খলিফাঁদের স্বীকৃতি দান অত্যন্ত জরুরি। মুসলিমরা যদি শরিয়াহ্ অনুযায়ী জীবন যাপন করে, তাহলে তারা একটা প্রতি-সংস্কৃতি সৃষ্টিতে সক্ষম হবে যা তাদের সময়ের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বদলে দেবে এবং একে ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য করবে।
গোপন ধর্মীয় আন্দোলন
এই ধার্মিকতা অবশ্য সকল মুসলিমকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, যদিও তা সংখ্যাগরিষ্ঠজনের বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিল। যারা অধিকতর বুদ্ধিজীবী বা অতীন্দ্রিয়বাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিল ধর্মকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার আবশ্যকতা ছিল তাদের। আব্বাসীয় আমলে আরও চারটি জটিল ধরনের ইসলামী দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতার আবির্ভাব ঘটেছিল যেগুলো অভিজাতদের কাছে আকর্ষণীয় ঠেকেছে। এসব ধারণা সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ শিক্ষানবীশদের বিশ্বাস ছিল স্থুল বুদ্ধির লোকজন তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং কেবল প্রার্থনা আর ধ্যানের প্রেক্ষিতেই এসবের অর্থ বোধগম্য হতে পারে। এই গোপনীয়তা আবার স্বয়ং-রক্ষক ব্যবস্থাও ছিল। শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস- সাদিক তাঁর অনুসারীদের আপন নিরাপত্তার স্বার্থেই তাক্বিয়াহ (গোপনীয়তা) বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। শিয়াদের জন্য সঙ্কটময় সময় ছিল এটা, রাজনৈতিক প্রশাসনের তরফ থেকে বিপদের আশঙ্কায় ছিল তারা। ধর্মীয় পণ্ডিত, উলেমাগণও এসব গুপ্ত সংগঠনের অর্থডক্সির ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। তাক্বিয়াহ্ সংঘাতকে সীমিত পর্যায়ে রেখেছিল। ক্রিশ্চান জগতে প্রশাসনের সঙ্গে ভিন্নমত অবলম্বনকারীরা প্রায়শ ধর্মদ্রোহী হিসাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ইসলামে এইসব প্রচ্ছন্ন ভিন্ন মতাবলম্বীরা নিজেদের ধ্যানধারণা সম্পর্কে নীরবতা বজায় রেখেছিল এবং সাধারণত নিরাপদে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করতে পেরেছে। তবে গোপনীয়তার নীতির ভিন্ন তাৎপর্যও ছিল। গুপ্ত আদর্শবাদীদের কিংবদন্তী (Myths) এবং ধর্মতাত্ত্বিক দর্শন (Theological insights) সামগ্রিক জীবনযাত্রারই অংশ ছিল। অতীন্দ্রিয় মতবাদসমূহ বিশেষত কাল্পনিক এবং স্বজ্ঞা মূলকভাবে বৈধ হিসাবে অনুভব করা যেতে পারে, কিন্তু তাই বলে সেগুলো বহিরাগত কারও যৌক্তিক উপলব্ধির নাগালের মধ্যে নাও থাকতে পারে। এগুলো কবিতা বা সঙ্গীতের মত যার প্রভাব যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এবং যার পরিপূর্ণ উপলব্ধির জন্য প্রায়শ বিশেষ মাত্রার সৌন্দর্য বিদ্যাগত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা থাকার প্রয়োজন হয়।
নিগূঢ় বিদ্যাধারীরা তাদের ধারণাকে ধর্মদ্রোহী বলে ভাবেনি। তারা উলেমাদের তুলনায় অধিকতর গভীরভাবে প্রত্যাদেশ উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখে বলে বিশ্বাস করত। একথা আবার মনে করা আবশ্যক যে ইসলামে বিশ্বাস (Beliefs) এবং মতবাদ (Doctrines) ক্রিশ্চান ধর্মের মত অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। জুডাইজমের মত ইসলাম এমন একটি ধর্ম যেখানে মানুষকে এক বিশেষ পদ্ধতি অনুসারে জীবনযাপন করতে হয়, স্রেফ নির্দিষ্ট কতগুলো বিশ্বাসগত প্রস্তাবনা মেনে নেয়া নয়। এখানে অর্থডক্সি নয় বরং অর্থপ্রাক্সির ওপরই গুরুত্ব দেয়া হয়। গূঢ় বিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট সকল মুসলিমই ইসলামের অত্যাবশ্যকীয় অনুশীলন বা পাঁচ “স্তম্ভ” (রুকন) মেনে চলেছে। তারা মুসলিম বিশ্বাসের সংক্ষিপ্ত ঘোষণা শাহাদা: “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনও ঈশ্বর নেই এবং মুহাম্মদ (স:) তাঁর পয়গম্বর” সম্পূর্ণ মেনেছে। দৈনিক পাঁচবার সালাত প্রার্থনা করেছে তারা, যাকাত দান করেছে, রমজান মাসে উপবাস পালন করেছে এবং অনুকূল পরিস্থিতিতে জীবনে অন্তত একবার মক্কায় গেছে হজ্জ করার উদ্দেশ্যে। স্তম্ভসমূহের প্রতি বিশ্বস্ত যে কেউ অবশ্যই প্রকৃত মুসলিম, তার বিশ্বাস যাই হোক না কেন।
আমরা আব্বাসীয়দের ক্ষমতারোহনের পরপর জাফর আস-সাদিক প্রবর্তিত শিয়াবাদের নীরবতম ধরন সম্পর্কে ইতিমধ্যে আলোচনা করেছি। যদিও শিয়ারা সুন্নীদের মতই শরিয়াহ্ ভিত্তিক ধার্মিকতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল এবং তাদের নিজস্ব মাযহাব (জাফরি মতবাদ, স্বয়ং জাফর আস-সাদিকের নামানুসারে) ছিল, কিন্তু তারা প্রধানত দিক-নির্দেশনার জন্য বর্তমান ইমামের দিকে চেয়ে থাকত, যিনি তাঁর প্রজন্মের জন্য স্বর্গীয় ইমের গ্রহীতা। ইমাম নিষ্পাপ আধ্যাত্মিক পরিচালক এবং আদর্শ কাজি। সুন্নীদের মত শিয়ারাও প্রথম গোষ্ঠীর মুসলিমদের মত, যারা সচক্ষে পয়গম্বরের প্রতি কুরান উন্মোচিত হতে দেখেছিল– সরাসরি ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিল। ঐশ্বরিক প্রেরণাপ্রাপ্ত ইমামের প্রতীকটি শিয়াদের পবিত্র সত্তার অনুভূতি প্রতিফলিত করে যা কেবল প্রকৃত ধ্যানীর কাছে ধরা পড়ে, কিন্তু তা সত্ত্বেও যা ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ বিপজ্জনক বিশ্বে পরিব্যাপ্ত। ইমামতের মতবাদ এও দেখায় যে সাধারণ রাজনৈতিক জীবনের করুণ পরিবেশে স্বর্গীয় আজ্ঞা বাস্তবায়ন কতখানি কঠিন। শিয়ারা মনে করে যে ইমামদের প্রত্যেকেই তাঁর সময়কালের খলিফার হাতে নিহত হয়েছেন। কারবালায় তৃতীয় ইমাম হুসেইনের শাহাদৎত্বরণ এই জগতে ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী চলার প্রয়াস কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে তার এক বিশেষ বাঙ্ময় উদাহরণ। দশম শতাব্দী নাগাদ শিয়ারা আশুরার (১০ মুহররম) উপবাসের দিন, মৃত্যু বার্ষিকীতে প্রকাশ্যে হুসেইনের শোকে মাতম করা আরম্ভ করে। তারা রাস্তায় মিছিল করে কেঁদে কেঁদে বুকে চাপড় বসিয়ে মুসলিমদের রাজনৈতিক জীবনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জীবন-বাজি বিরোধিতার ঘোষণা দেয়, যার কারণে কুরানের সুস্পষ্ট বিধান সত্ত্বেও ধনীরা দুর্বলদের ওপর নির্যাতন করার সুযোগ পাচ্ছে। জাফর আস-সাদিকের অনুসারী শিয়ারা হয়ত রাজনীতি পরিত্যাগ করেছিল, কিন্তু সামজিক ন্যায়বিচারের প্রতি আবেগ ছিল তাদের প্রতিবাদী ধার্মিকতার প্রাণ কেন্দ্ৰে ৷
