পরবর্তী খলিফাগণও শিয়াদের কাছে টানার প্রয়াস পেয়েছিলেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপদলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালান, কিন্তু কোনও ফল মেলেনি তাতে। খলিফাহ্ আল-মুতাসিম (৮৩৩-৪২) সেনাবাহিনীকে ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। এই সৈন্যরা ছিল তুর্কি ক্রীতদাস যাদের ওক্সাস নদীর অপর পাড় থেকে ধরে এনে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। কিন্তু এই পদক্ষেপ তাঁকে জনগণ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং টার্কিশ সৈন্য ও বাগদাদের জনগণের ভেতর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই উত্তেজনা দূর করতে খলিফাহ্ আনুমানিক ষাট মাইল দক্ষিণে, সামারায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেন, কিন্তু এতে করে তাঁর বিচ্ছিন্নতা আরও বৃদ্ধি পায়। এদিকে জনগণের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কবিহীন তুর্কিরা দশকে দশকে ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত খলিফাঁদের কাছ থেকে সাম্রাজ্যের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণভার ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষমতা অর্জন করে তারা। নবম শতাব্দীর শেষ এবং দশম শতাব্দীর শুরুর দিকে যেসব জঙ্গি শিয়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত ছিল বলে অতীন্দ্রিয়বাদী শান্তি বাদের পথে পা বাড়ায়নি তাদের দ্বারা অসংখ্য সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়।
কিন্তু রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাবাদের এই সময়কালে সুন্নী ইসলাম নামে পরিচিতি হয়ে ওঠা অংশটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আস্তে আস্তে বিভিন্ন আইনবিদ, মুতাযিলা এবং আহল আল-হাদিস তাদের মতভেদ বিসর্জন দিয়ে পরস্পরের কাছাকাছি হয়। এই প্রক্রিয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন আবু আল-হাসান আল-আশারি (মৃত্যু: ৯৩৫), যিনি মুতাযিলা এবং হাদিসপন্থীদের থিয়োলজি সমন্বিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। এতদিন পর্যন্ত মুতাযিলারা ঈশ্বরের মানুষরূপী ধারণার প্রতি এতই আতঙ্কিত ছিল যে ঈশ্বরের কোনও “মানবীয়” গুণ থাকার ব্যাপারটি অস্বীকার করে এসেছিল তারা। আমরা কেমন করে বলি যে ঈশ্বর “কথা বলেন” বা “সিংহাসনে বসেন” –যেভাবে কুরান নিশ্চিত করে বলছে– কীভাবে আমরা ঈশ্বরের “জ্ঞান” বা “ক্ষমতা” নিয়ে আলোচনা করতে পারি? আহল আল-হাদিস পাল্টা যুক্তি দেখিয়েছে যে, এই সতর্কতা ঈশ্বরের অনুভূতি পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়ে ঈশ্বরকে বিমূর্ত দার্শনিক বিষয়ে পরিণত করে যার কোনও ধর্মীয় তাৎপর্য থাকে না। একমত হন আল- আশারি, কিন্তু মুতাযিলাদের একথা বলে আশ্বস্ত করেন যে, ঈশ্বরের গুণাবলী মানুষের বৈশিষ্ট্যের মত নয়। কুরান ঈশ্বরের অনির্মিত বক্তব্য (Uncreated Speech), কিন্তু যে মানবীয় ভাষা একে প্রকাশ করে এবং খোদ গ্রন্থটির কালি এবং কাগজ নির্মিত। বাস্তবতার গভীরে রহস্যময় কোনও মূলসুর অনুসন্ধানের কোনও যুক্তি নেই। আমরা নিশ্চিত করে কেবল ইতিহাসের নিরেট বাস্তবকেই জানতে পারি। আল-আশারির দৃষ্টিতে প্রাকৃতিক নিয়ম বলে কিছু নেই। ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ নির্দেশে প্রতিমূহূর্তে বিশ্বজগৎ সংগঠিত হচ্ছে। স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই: ঈশ্বর যতক্ষণ তাদের মাঝে এবং মাধ্যমে চিন্তা না করছেন ততক্ষণ নারী বা পুরুষ কোনও কিছু ভাবতে পারে না; আগুন জ্বলে, তার কারণ এটা তার বৈশিষ্ট্য বলে নয়, বরং ঈশ্বর ইচ্ছা করেছেন বলে।
মুতাযিলারা আগাগোড়াই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপুল মুসলিমদের কাছে ভালোরকম দুর্বোধ্যই ছিল। আশারিবাদ সুন্নী ইসলামের প্রভাবশালী দর্শনে পরিণত হয়েছিল। অবশ্যই এটা যুক্তিনির্ভর বিশ্বাস নয়, বরং অধিকহারে অতীন্দ্রিয়বাদী ও ধ্যাননির্ভর অনুশীলন। এটা মুসলিমদের সর্বত্র ঐশী উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে উৎসাহ যোগায়, বাহ্যিক বাস্তবতার “ভেতর” দিয়ে অন্তস্থঃ দুর্ভেয় সত্তাকে দেখতে বলে, যেভাবে কুরান নির্দেশ দিয়েছে। এতে করে “হাদিসপন্থী”দের ধারণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠা নিরেট বাস্তবতায় ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ অনুভূতি লাভের বাসনা পূর্ণ হয়েছিল। এই দৰ্শন শরিয়ার চেতনার সঙ্গেও মানানসই ছিল। জীবনের সর্বক্ষেত্রে পয়গম্বরের সুন্নাহ্ অনুসরণের মাধ্যমে মুসলিমরা নিজেদের পয়গম্বরের সঙ্গে একীভূত করে-যাঁর জীবন ঐশ্বরিক উপাদানে সম্পৃক্ত ছিল। ঈশ্বরের প্রিয় (হাবিব)কে অনুকরণ করলে– এতীম, দরিদ্র বা পশু-পাখির প্রতি দয়া প্রদর্শন করে কিংবা খাদ্য গ্রহণের সময় সৌজন্য এবং সংস্কৃত আচরণ করে- স্বয়ং ঈশ্বরের ভালোবাসাই লাভ করা যায়। জীবনের অতি ক্ষুদ্র অংশে ঐশী আজ্ঞার বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুসলিমরা কুরান নির্দেশিত অবিরাম ঈশ্বরের স্মরণ (জিকর-dhikr) করছে। দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ এই শরিয়াহ্ ভিত্তিক ধার্মিকতা গোটা সাম্রাজ্য জুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। মোট চারটি স্বীকৃত আইন মতবাদ রয়েছে যার প্রতিটিই মুসলিম সাম্যবাদী দৃষ্টিতে সমভাবে বৈধ : হানাফি, মালিকি, শাফীই এবং হানবালি মতবাদ। শেষোক্তটি ইবন হানবাল এবং হাদিস-পন্থীদের আদর্শ ধারণ করে। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে, এই চারটি মাযহাব লক্ষণীয়ভাবে আলাদা নয়। প্রত্যেক মুসলিম অনুসরণ করার জন্য যেকোনওটি বেছে নিতে পারে, যদিও স্থানীয়ভাবে প্রচলিতটির দিকেই অধিকাংশজন আকৃষ্ট হয়ে থাকে।
