নবম শতাব্দীতে খেলাফতের পতনোন্মুখ অবস্থায় আব্বাসীয় প্রশাসন এবং শিয়াদের মধ্যকার বৈরিতা আবার প্রকাশিত হয়ে পড়ে। খলিফাহ্ আল-মুতাওয়াক্কিল (৮৪৭-৬১) দশম ইমাম আলী আল-হাদিকে মদীনা থেকে সামারায় ডেকে এনে গৃহবন্দী করে রাখেন। পয়গম্বরের এই সরাসরি বংশধরকে মুক্ত রাখা নিরাপদ নয় বলে ভেবেছিলেন তিনি। এরপর থেকে ইমামগণ কার্যত: শিয়াদের নাগালের বাইরে চলে যান এবং কেবল “প্রতিনিধি”র মাধ্যমেই বিশ্বাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ৮৭৪-এ একাদশ ইমামের পরলোকগমনের পর বলা হয় যে তিনি একজন তরুণ পুত্র সন্তান রেখে গেছেন যিনি আত্মরক্ষার খাতিরে আত্মগোপন করেছেন। দ্বাদশ ইমামের কোনও সন্ধান স্বভাবতই আর পাওয়া যায়নি, হয়ত আগেই পরলোকগমন করে থাকতে পারেন তিনি। কিন্তু আজও প্রতিনিধিগণ তাঁর পক্ষে শিয়াদের শাসন করছেন, তাদের কুরানের গূঢ়ার্থ পাঠে সাহায্য করছেন, যাকাত আদায় করছেন এবং আইনি রায় প্রদান করছেন। ৯৩৪-এ গোপন ইমাম স্বাভাবিক জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছালে “প্রতিনিধি” শিয়াদের জন্য তাঁর কাছ থেকে এক নতুন বাণী এনে হাজির করেন। তিনি “গোপন স্থানে” (occultation) চলে গেছেন এবং ঈশ্বর অলৌকিক উপায়ে তাঁকে লুকিয়ে রেখেছেন; তিনি আর শিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। একদিন আবার ফিরে আসবেন তিনি, ন্যায় বিচারের যুগের উদ্বোধন করার জন্যে, কিন্তু সেটা দীর্ঘ কয়েক যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর। গোপন ইমামের “গোপন স্থানে” যাবার কিংবদন্তী আক্ষরিক অর্থে পার্থিব ঘটনার বিবরণ হিসাবে গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে অবতারণা করা হয়নি। এটা অতীন্দ্রিয়বাদী মতবাদ যা ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের অনুভূতিকে ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট বা ধরা-ছোঁয়ার অতীত হিসাবে প্রকাশ করে, এই জগতে উপস্থিত থাকলেও তা জগতের অংশ নয়। এটা এই জগতে প্রকৃত ধর্মীয় নীতির বাস্তবায়নের অসম্ভাব্যতাকেও প্রতীকায়িত করে, কেননা খলিফাগণ পৃথিবী হতে আলীর বংশধারা ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং ইলম্ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। এরপর থেকে শিয়া উলেমাগণ গুপ্ত ইমামের প্রতিনিধিতে পরিণত হন এবং তাঁর ইচ্ছা উপলব্ধি করার জন্যে তাঁদের নিজস্ব অতীন্দ্রিয়বাদী ও যৌক্তিক দর্শনের প্রয়োগ করেন। দ্বাদশবাদী (Twelver) শিয়ারা (যারা বারজন ইমামে বিশ্বাসী) আর রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণ করেনি, কেননা উম্মাহর প্রকৃত নেতা গোপন ইমামের অনুপস্থিতিতে কোনও সরকার বৈধ হতে পারে না। তাদের মেসিয়ানিক ধর্মানুরাগ, যা ইমামের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় রয়েছে, সমাজের অবস্থার সঙ্গে স্বর্গীয়লোকের অসন্তোষের পরিচয় প্রকাশক।
শিয়াদের সবাই দ্বাদশবাদী ছিল না, সবাই রাজনীতিও ত্যাগ করেনি। কেউ কেউ (সপ্তবাদী– Seveners বা ইসমায়েলি) মনে করে যে আলীর বংশধারা জাফর আস- সাদিকের পুত্র ইসমায়েলের সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে, যিনি মনোনীত ইমাম ছিলেন কিন্তু পিতার আগেই পরলোকগমন করেছেন। সুতরাং তারা জাফরের দ্বিতীয় পুত্র মুসা আল-কাযিমের বৈধতা স্বীকার করেনি, দ্বাদশবাদীরা যাকে সপ্তম ইমাম হিসাবে মর্যাদা দিয়েছিল। তারাও এক গূঢ় আধ্যাত্মিকতার বিকাশ ঘটিয়েছিল যা ঐশীগ্রন্থের গোপন (বাতিন) অর্থের সন্ধানী কিন্তু প্রকাশ্য জীবনধারা থেকে সরে যাবার বদলে তারা একেবারে ভিন্নতর রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়াস পেয়েছিল এবং প্রায়ই সক্রিয় কর্মী ছিল তারা। ৯০৯-এ এক ইসমায়েলি নেতা টিউনিসিয়ার এক প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ আয়ত্ত করতে সক্ষম হলে নিজেকে মেসিয়ানিক খেতাব আল- মাহদি (নির্বাচিত ব্যক্তি) প্রদান করেন। ৯৮৩-তে ইসমায়েলিরা আব্বাসীয়দের কাছ থেকে মিশর ছিনিয়ে নিয়ে কায়রোয় পাল্টা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করে, যা প্রায় দু’শ’ বছর টিকে ছিল। সিরিয়া, ইরাক, ইরান এবং ইয়েমেনেও গোপন ইসমায়েলি সেল ছিল। সদস্যরা স্থানীয় দাই (dai: প্রতিনিধি) দ্বারা আস্তে আস্তে সম্প্রদায়ের অঙ্গীভূত হত। নিম্ন পর্যায়ের অনুসৃত ধর্ম সুন্নীবাদের বিপরীত কিছু ছিল না, কিন্তু শিক্ষার্থী অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আরও বিমূর্ত দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হত যেখানে দুয়ের বিস্ময়ের অনুভূতি জাগিয়ে তোলার জন্যে গণিত আর বিজ্ঞানের প্রয়োগ করা হত। কুরান নিয়ে ইসমায়েলিদের ধ্যান ইতিহাস সম্পর্কে তাদের মাঝে আবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি জাগিয়েছিল, যাকে তারা ঈশ্বরের সঙ্গে শয়তানের বিরোধিতার পর থেকে ক্রমাবনতিশীল বলেই বিশ্বাস করেছে ৷ মোট ছয়জন মহান পয়গম্বর ছিলেন [অ্যাডাম, নোয়াহ্, আব্রাহাম, মোজেস, জেসাস এবং মুহাম্মদ(স:)] যাঁদের প্রত্যেকেই এই নিম্নমুখী প্রবণতা উল্টে দিয়েছেন। প্রত্যেক পয়গম্বরের একজন করে “কর্মী” (executor) ছিলেন যিনি তাঁর বাণীর গোপন অর্থ যোগ্যদের শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন উদাহরণস্বরূপ, অ্যারন ছিলেন মোজেসের কর্মী আর আলী ছিলেন মুহাম্মদের(স:)। বিশ্বাসীরা যখন তাদের শিক্ষা বাস্তবায়নের সংগ্রামে লিপ্ত হবে তখন তারা পৃথিবীকে চূড়ান্ত শান্তির পর্বের জন্যে প্রস্তুত করে তুলবে, সপ্তম পয়গম্বর মাহুদি যার সূচনা ঘটাবেন।
