আল-শাফীর অসাধারণ কাজের ফলে অন্য পণ্ডিতগণ তাঁর মানদণ্ড অনুযায়ী আহাদিস গবেষণায় উৎসাহিত হয়ে ওঠেন। আল-বুখারি (মৃত্যু: ৮৭০) এবং মুসলিম (মৃত্যু: ৮৭৮) দু’টি নির্ভরযোগ্য এবং কর্তৃত্বপূর্ণ সংকলন সম্পাদন করেন যা ফিক্হ’র প্রতি আগ্রহ জোরাল করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত শরিয়াহ্ আইনের ভিত্তিতে এক বিশাল ইসলামী সমরূপ ধর্মীয় জীবন সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করে। আইনের অনুপ্রেরণা ছিলেন ব্যক্তি পয়গম্বর, সাম্রাজ্য জুড়ে আদর্শ মানুষ। তাঁর ব্যবহারিক জীবনের তুচ্ছ বিষয়টির অনুকরণের মাধ্যমে– তাঁর খাদ্য গ্রহণের ভঙ্গি, হাত-মুখ ধোয়া, ভালোবাসা, কথপকথন আর প্রার্থনার ভঙ্গি অনুকরণ করে মুসলিমরা ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণের তাঁর নিখুঁত ভঙ্গি অর্জনের আশা করে থাকে। ধর্মীয় আচরণ এবং ধারণাসমূহের ভিত্তি পাওয়ার কারণ এই নয় যে সেগুলো শক্তিমান থিয়োলজিয়ান দ্বারা প্রচারিত বা সেগুলোর শক্ত ঐতিহাসিক বা যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে; বরং এগুলো অনুসৃত হতে দেখা যাওয়ার কারণ বিশ্বাসীকে তা পবিত্র অলৌকিকের অনুভূতি যোগায়। মুসলিমরা আজও গভীরভাবে শরিয়াকে আঁকড়ে রেখেছে যা তাদের খুবই গভীর স্তরে মুহাম্মদের(স:) আদর্শ চরিত্রকে আত্মীকরণে সাহায্য করে এবং তাঁকে সপ্তম শতাব্দী থেকে মুক্ত করে এনে তাদের জীবনে জীবন্ত সত্তা এবং তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করে।
কিন্তু অন্য সকল ইসলামী ধার্মিকতার মত শরিয়াহ্ও রাজনৈতিক। এতে ধার্মিকদের চোখে দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিধান রয়েছে। মালিক ইবন আনাস এবং আল-শাফী উভয়েই আব্বাসীয়দের সূচনার দিকে শিয়া বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন, উভয়কেই তাঁদের রাজনীতির কারণে কারাভোগ করতে হয়েছিল, যদিও আল-মাদি এবং হারূন আল-রশিদ তাঁদের মুক্তি এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন- যাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্য জুড়ে একটা একক আইনগত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শরিয়াহ্ রাজদরবারের আভিজাত্য ও বিশেষ প্রথা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা খলিফা ক্ষমতাকে সীমিত করেছে, জোরের সঙ্গে বলেছে যে তাঁর ভূমিকা পয়গম্বর বা রাশিদুনদের অনুরূপ নয়, বরং তাঁকে পবিত্র. আইন প্রয়োগের অনুমতি দেয়া হয়েছে মাত্র। রাজদরবারের সংস্কৃতি এভাবে পরোক্ষে অনৈসলামিক হিসাবে নিন্দিত হয়েছে। কুরানের মত শরিয়ার বৈশিষ্ট্যও সাম্যবাদী। দুর্বলদের রক্ষা করার জন্য বিশেষ বিধি-বিধান রয়েছে এতে এবং খেলাফত বা রাজদরবারের মত কোনও প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং বিশ্বাসে নাক গলানোর কোনও ক্ষমতা ছিল না। প্রত্যেক মুসলিমের ঈশ্বরের নির্দেশ প্রতিপালন করার বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে এবং কোনও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান (“গির্জার” মত) এবং “পুরহিত”দের বিশেষায়িত কোনও দল ঈশ্বর এবং ব্যক্তি মুসলিমের মধ্যে নাক গলাতে পারবে না। সকল মুসলিমের অবস্থান সমপর্যায়ের, এখানে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে যাজকগোষ্ঠী বা পুরহিততন্ত্রের অস্তিত্ব থাকতে পারবে না। এভাবে রাজদরবারের মানদণ্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মান অনুযায়ী সমাজ পুর্নগঠনের একটা প্রয়াস ছিল শরিয়াহ্। একটা পাল্টা সংস্কৃতি আর প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলা ছিল এর উদ্দেশ্য যা অচিরেই একে খেলাফতের বিরুদ্ধে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
হারুন আল-রশিদের শাসনামলের শেষনাগাদ এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে খেলাফত এর তুঙ্গ সময় অতিক্রম করে এসেছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আর নির্যাতনের আধুনিক উপায় আরিষ্কারের আগে একক সরকারের পক্ষে এমন বিশাল সাম্রাজ্য অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। স্পেনের (যেখানে একজন পলাতক উমাইয়াহ্ ৭৫৬-তে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন) মত সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলো বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছিল। অর্থনীতির পড়তি দশা চলছিল। সাম্রাজ্যকে দুই পুত্রের মাঝে ভাগ করে এই সমস্যা সমাধানের প্রয়াস পেয়েছিলেন হারূন আল-রশিদ, কিন্তু তাতে কেবল তাঁর মৃত্যুর পর দু’ভাইয়ের মাঝে গৃহযুদ্ধই (৮০৯-১৩) পাওয়া গেছে। এটা ছিল রাজদরবারের সেক্যুলার চেতনার লক্ষণ, অতীতের ফিৎনাহ্ যুদ্ধের বিপরীতে এই সংঘাতে কোনও আদর্শিক বা ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ছিল না, এটা ছিল স্রেফ ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাত। আল-মামুন যখন বিজয়ী হিসাবে আবির্ভূত হয়ে শাসন শুরু করেন (৮১৩-৩৩), তখন এটা স্পষ্ট ছিল যে সাম্রাজ্যের দু’টি প্রধান ক্ষমতা বলয় রয়েছে। একটা রাজদরবারের অভিজাত গোষ্ঠী, অন্যটি শরিয়াহ্-ভিত্তিক সাম্যবাদী এবং “সংবিধানবাদী” গোষ্ঠী।
নিজের নাজুক শাসন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন আল-মামুন। গৃহযুদ্ধ, কুফাহ্ এবং বসরা শিয়া বিদ্রোহ (৮১৪-১৫), এবং খুরাসানে খারেজি বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে সূচিত হয়েছিল তাঁর রাজত্ব। এইসব বিক্ষুদ্ধ গ্রুপকে বশ মানানোর প্রয়াস পেয়েছেন তিনি যাতে ধর্মীয় টানাপোড়েন হ্রাস পায়। কিন্তু তাঁর অনুসৃত নীতি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। নিজে বুদ্ধিজীবী হওয়ায় স্বভাবতই মুতাযিলাদের প্রতি আকৃষ্ট বোধ করেছেন এবং তাদের আবার আনুকূল্যে ফিরিয়ে এনেছেন। এটাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ঐশী আইন প্রত্যেক মুসলিমের সরাসরি বোধগম্য বলে দাবীদার আহল আল-হাদিসের জনপ্রিয় আন্দোলন একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। যাহোক, আবার ক্ষমতার কাছাকাছি আসায় মুতাযিলারা এতদিন ধরে তাদের ওপর নিপীড়ন পরিচালনাকারী আহল আল-হাদিসের ওপর চড়াও হয়। এক “ইনকুইজিশন” (মিনাহ্) শুরু হয়েছিল যার ফলে নেতৃস্থানীয় ‘হাদিসপন্থী’রা, যেমন উল্লেখযোগ্য, জনপ্রিয় আহমাদ ইবন হানবাল (মৃত্যু: ৮৩৩) কারারুদ্ধ হন। ইবন হানবাল পরিণত হন গণমানুষের নেতায়। মুতাযিলাদের পৃষ্ঠপোষকতা দান আল-মামুনের জন্য কোনও ফায়দা বয়ে আনেনি; বরং সাধারণ জনগণকে আরও দূরে ঠেলে দিয়েছিল। এক পর্যায়ে, শিয়াদের অষ্টম ইমাম আলী আল-রিদাকে নিজের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে শিয়াদের কাছে টানার প্রয়াস পান খলিফাহ্, কিন্তু মুতাযিলাদের মত শিয়ারাও স্রেফ আরেকটা সংখ্যালঘু আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিজীবী অভিজাত গোষ্ঠী ছিল বলে সাধারণ নাগরিকদের সমর্থন আদায় করতে পারেনি। কয়েক মাস পরে সুবিধাজনকভাবেই পরলোকগমন করেন আল রিদা –সম্ভবত: বাঁকা পথে।
