সুতরাং আহল আল-হাদিস’রা ছিল রক্ষণশীল; এক আদর্শে রূপান্তরিত অতীতের প্রেমে নিমগ্ন ছিল তারা; সকল রাশিদুনকে শ্রদ্ধা করত তারা এবং এমনকি পয়গম্বরের অন্যতম সহচর মুয়াবিয়াহকেও। মুতাযিলাদের বিপরীতে- যাদের প্রায়ই স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী হতে দেখা গেছে- তারা জোর দিয়ে বলেছে “সৎ কাজে নির্দেশ ও মন্দ কাজে বাধা দেয়া”র দায়িত্ব কেবল নগণ্য সংখ্যকের: নিম্ন পর্যায়ের লোকদের অবশ্যই খলিফাঁকে মানতে হবে, তাঁর ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন। হারুন আল-রশিদের কাছে এ বক্তব্য আকর্ষণীয় ঠেকেছিল। আরও ধর্মীয় আন্দোলনের শুভেচ্ছা লাভের দরকার ছিল তাঁর, আহল আল-হাদিসের প্রতি- বিপ্লবাত্মক প্রবণতার অনুমোদন দেন তিনি। মুতাযিলারা বাগদাদের সুনজরে থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে এবং হাদিসের জনগণ তাদের সামাজিকভাবে একঘরে করার ব্যাপারে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। কখনও কখনও তাদের অনুরোধে সরকার এমনকি নেতৃস্থানীয় মুতাযিলাদের কারাগারেও নিক্ষেপ করে।
ধর্মীয় আন্দোলনের শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিল আব্বাসীয়রা, ফলে রাজবংশ প্রতিষ্ঠায় সফল হওয়ার পর তারা নিজেদের শাসনকে ইসলামী বৈধতা দেয়ার প্রয়াস পায়। সেকারণেই তারা জনগণের জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ফিকহ্ র বিকাশ উৎসাহিত করেছে। সাম্রাজ্যে এক ধরনের বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ জনগণের জীবনধারা প্রকৃতই শরিয়াহ্ নামে আখ্যায়িত ইসলামী আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল, কিন্তু রাজদরবার বা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে মুসলিম নীতিমালা প্রয়োজ্য হয়নি। তারা আব্বাসীয় শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্যে প্রাক- ইসলামী স্বৈরাচারী নিয়মকানুনের প্রতিই বেশী অনুরক্ত ছিল।
উমাঈয়াদের অধীনে প্রত্যেক শহরে আলাদা নিজস্ব ফিক্হ গড়ে ওঠে, কিন্তু আব্বাসীয়রা আরও সংহত আইনগত ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে জুরিস্টদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। কুরানের আমলের তুলনায় মুসলিম জীবনযাত্রা আমূল বদলে গিয়েছিল। ইসলাম ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত করা হচ্ছিল বলে জিম্মিরা সংখ্যালঘু দলে পরিণত হচ্ছিল। মুসলিমরা আর গ্যারিসন শহরে অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হতে বিচ্ছিন্ন ছোট অভিজাত গ্রুপ ছিল না। তারাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুসলিমদের কেউ কেউ সম্প্রতি ধর্ম বিশ্বাস গ্রহণ করেছিল, তখনও তারা তাদের পুরনো বিশ্বাস আর আচার অনুষ্ঠানে আঁকড়ে রেখেছিল। জনগণের জন্য ইসলামী জীবন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে অধিকতর সংহত এবং স্বীকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। উলেমাদের (ধর্মীয় পণ্ডিত: একবচনে: আলিম) একটা আলাদা শ্ৰেণী আবির্ভূত হতে শুরু করেছিল তখন। বিচারকগণ (কাজি) আরও কঠোর প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। আল-মাহদি এবং হারুন আল-রশিদ দু’জনই ফিক্’র পৃষ্ঠপোষক হওয়ার মাধ্যমে আইন গবেষণায় উৎসাহ জুগিয়েছেন। দু’জন অসাধারণ পণ্ডিত চিরন্তন অবদান রেখে গেছেন। মদীনায় মালিক ইবন আনাস (মৃত্যু: ৭৯৫) একটি সংকলন গ্রন্থিত করেন যার নাম আল-মুতাওয়াত্তাব (দ্য বীটেন পাথ: The Beaten Path)। এটা ছিল মদীনার প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় অনুশীলনের বিস্তারিত বিবরণ যা পয়গম্বরের সমাজের মূল বা আদি সুন্নাহ্ ধরে রেখেছে বলে মালিকের বিশ্বাস ছিল। মালিকের অনুসারীরা তাঁর ধর্মতত্ত্ব সমূহকে মালিকি মতবাদ (মাযহাব) হিসাবে পূর্ণাঙ্গ করে তুলেছিল যা মদীনা, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকায় বিস্তার লাভ করে।
কিন্তু অন্যরা একথা মানতে চায়নি যে, বর্তমান কালের মদীনা আদি ইসলামের পথে সত্যিই নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। মুহাম্মদ ইদ্রিস ইবন আল-শাফী (মৃত্যু: ৮২০), গাযায় দারিদ্র্যের মধ্যে যাঁর জন্ম এবং যিনি মদীনায় মালিকের সঙ্গেই পড়াশোনা করেছিলেন, যুক্তি তুলে ধরেন যে মাত্র একটি ইসলামী শহরের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়, এর মর্যাদা যত উন্নতই হোক না কেন। তাঁর পরিবর্তে সকল জুরিসপ্রুডেন্সের ভিত্তি হওয়া উচিত পয়গম্বর সম্পর্কিত আহাদিস, যাঁকে কেবল কুরানের প্রচারক হিসাবে নয় বরং অনুপ্রাণিত ব্যাখ্যাকারী হিসাবে দেখা উচিত। ঐশীগ্রন্থের নির্দেশ ও আইন-কানুন মুহাম্মদের(স:) বাণী এবং কর্মধারার আলোকে উপলব্ধি করা যেতে পারে। কিন্তু, শাফী জোর দিয়ে বললেন যে, প্রত্যেকটা হাদিসকে অবশ্যই নির্ভরযোগ্যভাবে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের একটি পরম্পরা (ইসনাদ) দ্বারা স্বয়ং পয়গম্বর অবধি সমর্থিত হতে হবে। ইসনাদকে অবশ্যই কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। যদি পরম্পরায় বিচ্যুতি ঘটে বা কোনও “সংযোগকারী”কে যদি অবিশ্বস্ত মুসলিম হতে দেখা যায়, তাহলে হাদিসটিকে অবশ্যই বাদ দিতে হবে। আল-শাফী আহল আল-হাদিস এবং ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপকারী আবু হানিফার মত জুরিস্টদের মাঝে মধ্যস্থতার প্রয়াস পেয়েছিলেন; শাফী একটা মাত্রা পর্যন্ত ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, একে পয়গম্বরের রীতি (customs) আর সমসাময়িক আচার অনুষ্ঠানের কঠোর মিলের (কিয়াস) মধ্যে সীমিত থাকতে হবে। আল-শাফী শিক্ষা দিয়েছেন পবিত্র আইনের (উসুল আল-ফিক্হ) চারটি “মূল” রয়েছে: কুরান, পয়গম্বরের সুন্নাহ, কিয়াস (analogy) এবং ইজমাহ, সমাজের “ঐকমত্য” (consensus)। ঈশ্বর সমগ্র উম্মাহকে ভ্রান্তিতে আক্রান্ত হতে দিতে পারেন না, সুতরাং কোনও আচার যদি সকল মুসলিম কর্তৃক গৃহীত হয়, তাকে অবশ্যই সঠিক হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে, যদি এর সমর্থনে কুরানের কোনও সূত্র বা হাদিস নাও পাওয়া যায়। আল-শাফীর পদ্ধতি- সঠিকতার আধুনিক মানদণ্ড অনুযায়ী পয়গম্বরের সুন্নাহ্ কঠিন এতিহাসিক বাস্তবতা নিশ্চিত করার উপযুক্ত ছিল না- কিন্তু এতে করে গভীর এবং সন্তোষজনক ধর্মীয় অনুভূতি দানকারী একটা জীবনধারা নির্মাণের অবলম্বন পেয়েছিল মুসলিমরা।
