অগ্নিকুণ্ড থেকে প্রবাহিত কোনও সাগরের কথা কী শুনেছ তুমি?
কোনও শেয়ালকে কী দেখেছ সিংহে পরিণত হতে?
একটা নুড়ি পাথরকে রত্নে পরিণত করতে পারে সূর্য, এমনকি প্রকৃতির
হাত যাকে বদলাতে পারে না ।
আমিই সেই মূল্যবান রত্ন, আমার সূর্য তিনি, যাঁর রশ্মিতে এই নিকষ
অন্ধকার জগৎ আলোয় পরিপূর্ণ।
ভক্তির কারণে এই কবিতায় আমি তার ইমামের নাম উচ্চারণ করতে
পারছি না, কিন্তু কেবল এটুকু বলতে পারি, প্লেটো স্বয়ং তার দাসে
পরিণত হতেন। তিনিই গুরু, আত্মার পরিত্রাতা, ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট,
প্রজ্ঞার প্রতিমূর্তি, জ্ঞান ও সত্যের ধারা।
হে জ্ঞানের প্রতিভু, গুণের রূপ,
প্রজ্ঞার আত্ম, মানুষের অভীষ্ট,
হে গর্বের গর্ব, তোমার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম আমি, মলিন
ও জীর্ণ পশমের পোশাক পরে,
এবং চুম্বন দিয়েছি তোমার হাতে যেন বা তা
পয়গম্বরের মাজার বা কাবাহর কৃষ্ণ পাথর।
গ্রিক অর্থডক্স ক্রিশ্চানদের কাছে তাবর পর্বতের ক্রাইস্ট যেমন মানুষের ঐশীরূপের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, বুদ্ধ যেমন গোটা মানবজাতির পক্ষে ধারণ যোগ্য আলোক ধারণ করেছিলেন, ঠিক সেভাবে ঈশ্বরের পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতার মধ্য দিয়ে ইমামদের মানবীয় প্রকৃতি বা রূপ বদলে গেছে।
ফায়লাসুফরা ধর্মের বাহ্যিক ও যৌক্তিক উপাদানসমূহের দিকে অতিমাত্রায় মনোযোগী হয়ে উঠে এর আধ্যাত্মিক সত্যকে উপেক্ষা করছিল বলে শঙ্কিত বোধ করেছে শিয়ারা। যেমন মুক্ত চিন্তাবিদ আর-রাযির বিরোধিতা করেছে তারা। কিন্তু নিজস্ব দর্শন ও বিজ্ঞান গড়ে তুলেছিল তারা, কিন্তু সেগুলো শেষ কথা ছিল না বরং কোরানের অন্তর্নিহিত অর্থ (বাতিন) উপলব্ধিতে সক্ষম করে তোলার আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসাবে বিবেচিত ছিল। বিজ্ঞান ও গণিতের বিমূর্ত বিষয়াদি দিয়ে ধ্যান ইন্দ্রিয়জ কল্পনা হতে তাদের পরিশুদ্ধ করেছিল ও দৈনন্দিন জীবনের সচেতনতা থেকে, সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিয়েছিল। আমরা যেভাবে বাহ্যিক সত্যের সঠিক ও আক্ষরিক উপলব্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করি তা না করে ইসমায়েলিরা তাদের কল্পনাশক্তিকে বাড়ানোর প্রয়াস পেয়েছে। তারা প্রাচীন ইরানের সরোস্ট্রিয়ান মিথের শরণাপন্ন হয়ে সেগুলোকে কিছু নিও-প্লেটোনিক ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে মুক্তি লাভের ইতিহাসের এক নতুন ধারণা গড়ে তুলেছিল। এখানে স্মরণ করে যেতে পারে যে, অধিকাংশ প্রথাগত সমাজে মানুষ বিশ্বাস করত এই মতের পৃথিবীতে সংঘটিত ঘটনাবলী স্বর্গীয় বলয়ের ঘটনাপ্রবাহের পুনরাবৃত্তি: প্লেটোর আকৃতি বা চিরন্তন আদর্শ জগতের মতবাদে দার্শনিক পরিভাষায় এই চিরকালীন বিশ্বাসই প্রকাশ করেছে। উদাহরণ স্বরূপ, প্রাক-ইসলামি ইরানে বাস্তবতা দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী ছিল: এভাবে দৃশ্যমান (গেতিক) আকাশের পাশাপাশি এক স্বর্গীয় (মেনক) আকাশের অস্তিত্ব ছিল যা সাধারণ বোধশক্তি দিয়ে দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আরও বিমূর্ত ও আধ্যাত্মিক সত্তা বা বাস্তবতার ক্ষেত্রে একথা আরও সত্যি: এখানে গেতিকে আমাদের প্রত্যেক প্রার্থনা বা সকাজের, আবার স্বর্গীয় বলয়ে অনুরূপ সৃষ্টি হয় এবং একে সত্য রূপ ও চিরন্তন তাৎপর্য দান করে।
এইসব স্বর্গীয় আদি রূপ বা আদর্শ আমাদের কল্পনার ঘটনাবলী ও আকার যেমন প্রায়ই আমাদের পার্থিব অস্তিত্বের চেয়ে আরও বেশি বাস্তব এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঠেকে ঠিক সেভাবে অনুভূত হতো। বিপরীতে হতাশাব্যাঞ্জক বহু ঘটনাবলী থাকা সত্ত্বেও একে আমাদের জীবন ও আমাদের অনুভবের পৃথিবীর যে একটা অর্থ ও গুরুত্ব আছে সেই বিশ্বাস প্রকাশের প্রয়াস হিসাবে দেখা যেতে পারে। দশম শতাব্দীতে ইসমায়েলিরা এই মিথলজি পুনরুজ্জীবিত করে, ইসলামে দীক্ষা নেওয়ার সময় পার্সিয় মুসলিমরা যা ত্যাগ করেছিল, কিন্তু যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ রয়ে গিয়েছিল। একে তারা কল্পনাপ্রসূতভাবে উৎসারণের প্লেটোনিক মতবাদের সঙ্গে সংশ্লেষ করে। আল ফারাবি ঈশ্বর ও বস্তুজগতের মাঝে দশটি উৎসারণ কল্পনা করেছিলেন যা টলেমিয় বলয়সমূহের তত্ত্বাবধান করে। শিয়ারা এবার পয়গম্বর ও ইমামদের এই স্বর্গীয় প্রকল্পের ‘আত্মা’য় পরিবর্তন করল। প্রথম স্বর্গের সর্বোচ্চ ‘পয়গম্বরত্বে’র বলয়ে ছিলেন মুহাম্মদ (স); দ্বিতীয় স্বর্গে ছিলেন আলি পরবর্তী বলয়গুলোর প্রত্যেকটায় ক্রমানুসারে প্রভুত্ব করেছেন সাত জন ইমাম। এতে করে শেষে, বস্তজগতের নিকটতম বলয়ে ছিলেন মুহাম্মদের (স) মেয়ে, আলির স্ত্রী ফাতিমাহ-যার সুবাদে এই পবিত্র ধারা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং তিনি ইসলামের জননী ও স্বর্গীয় প্রজ্ঞা সোফিয়ার সমপর্যায়ের। দেবরূপ ইমামদের এই কল্পনা শিয়াহু ইতিহাসের ইসমায়েলি ব্যাখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। এটা কেবল বাহ্যিক জাগতিক ঘটনাবলীর পর্যায়ক্রম ছিল না-যার অনেকগুলোই করুণ। এইসব বর্ণাঢ্য মানুষদের জীবন আদর্শ জগতের (মেনোক) ঘটনা প্রবাহের অনুরূপ।
একে অলীক ধারণা বলে চট করে উপহাস করা উচিৎ হবে না। আমাদের। বর্তমান পশ্চিমে আমরা বস্তুগত সঠিকতকতার দিকে মনোযোগের জন্যে গর্ব বোধ করি, কিন্তু ধর্মের ‘গুপ্ত (বাতিন) মাত্রার অনুসন্ধানকারী ইসমায়েলি বাতিনিরা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন লক্ষ্যে নিয়োজিত ছিল। কবি বা শিল্পীদের মতো প্রতীকী পদ্ধতি ব্যবহার করেছে তারা, যার সঙ্গে যুক্তির মিল ছিল সামান্যই, তবে তারা মনে করত এতেই যৌক্তিক ধারণায় প্রকাশিত বা। অনুভবে উপলব্ধ বাস্তবতার চেয়ে আরও গভীর বাস্তবতা প্রকাশ পায়। সে অনুযায়ী কোরান পাঠের একটা পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল তারা, যাকে তারা বলত তাওয়িল-আক্ষরিক অর্থে, ‘পেছনে নিয়ে যাওয়া’ (Carrying back)। এভাবে আদি মূল কোরানের কাছে ফিরে যেতে পারবে বলে ভেবেছিল তারা, যা মুহাম্মদ (স) গেতিকে আবৃত্তি করার সময়ই মেননকে উচ্চারিত হয়েছিল। ইরানি শিয়াহ্বাদের ইতিহাসবিদ প্রয়াত হেনরি করবিন তাওয়িলের অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গীতের ছন্দের তুলনা করেছেন। ইসমায়েলি যেন এক ধরনের শব্দ শুনতে পেত-কোরানের কোনও পঙক্তি বা কোনও হাদিস-একই সময়ে বিভিন্ন মাত্রায়; আরবী শব্দের মতোই এর স্বর্গীয় প্রতিপক্ষের উচ্চারণ শোনার জন্যে নিজেকে গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছে সে। এই প্রয়াস তার জটিল কোলাহলময় মনকে স্থির করে তুলত ও প্রতিটি শব্দকে ঘিরে থাকা নৈঃশব্দ্যের প্রতি সচেতন করে তুলত, ঠিক কোনও একজন হিন্দু যেমন পবিত্র উচ্চারণ ওঁম কে ঘিরে থাকা অনন্ত নীরবতায় কান পেতে থাকে। নৈঃশব্দ্যে কান পেতে থাকার সময় ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য ও ধারণার সঙ্গে পূর্ণ সত্তার মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠে। এক নেতৃস্থানীয় ইসমায়েলি চিন্তাবিদ আবু ইয়াকুব আল-সিজিস্তানি (মৃত্যু, ৯৭১) ব্যাখ্যা করেছেন, এই অনুশীলন ঈশ্বরকে যেভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন সেভাবে উপলব্ধি করতে মুসলিমদের সাহায্য করে। মুসলিমরা প্রায়শঃই ঈশ্বর সম্পর্কে কথা বলার সময় মানবীয় পরিভাষা ব্যবহার করে তাকে অতিমানব ধরনের কিছু বানায়, অন্যদিকে অন্যরা সকল ধর্মীয় অর্থ বাদ দিয়ে ঈশ্বরকে কেবল ধারণার পর্যায়ে নামিয়ে আনে। এর বদলে আল সিজিস্তানি দ্বিগুণ নেতির ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। আমাদের উচিত নেতিবাচক অর্থে ঈশ্বর সম্পর্কে কথা শুরু করা; যেমন: তিনি ‘সত্তা’ না বলে ‘সত্তা নন’, ‘প্রাজ্ঞ’ না বলে অজ্ঞ নন,’ বলা যেতে পারে, ইত্যাদি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রাণহীন ও বিমূর্ত নেতিকে আবার বাতিল করতে হবে আমাদের। আমরা যেভাবে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেভাবে বলতে হবে ঈশ্বর ‘অজ্ঞ না। নন’ বা তিনি কিছু-না নন।’ মানবীয় কথা বলার ঢঙের সঙ্গে তিনি মেলেন । এই ভাষাগত অনুশীলনের চর্চার মাধ্যমে একজন বাতিনি ঈশ্বরের রহস্য বোঝানোর প্রয়াস পাওয়ার সময় ভাষার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠবে।
