পরবর্তী কালের ইসমায়েলি চিন্তাবিদ হামিদ আল-দিন কিরমানি (মৃত্যু, ১০২১) তাঁর রাহাফ আল-আকল (বাম ফর ইন্টেলেক্ট)-এ এই অনুশীলন বা চর্চার অপরিসীম শান্তি ও সন্তোষ লাভের কথা বর্ণনা করেছেন। এটা বিরস, বুদ্ধির অনুশীলন বা পণ্ডিতি কোনও চাল ছিল না, বরং এখানে ইসমায়েলির জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় এক ধরনের তাৎপর্যের অনুভূতি নিয়ে যোগ হয়েছে। ইসমায়েলি লেখকগণ বার বার বাতিনকে আলোকপ্রাপ্তি বা পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে প্রকাশ করেছেন। ঈশ্বর সম্পর্কে তথ্য প্রদান তাওয়িলের কাজ ছিল না বরং যুক্তির চেয়ে গভীর কোনও স্তরে বিস্ময়ের অনুভূতি গড়ে তোলা এর কাজ যা বাতিনিকে আলোকিত করে তুলবে। এটা পালায়নবাদী কোনও বিষয়ও ছিল না। ইসমায়েলিরা ছিল রাজনৈতিক কর্মী। প্রকৃতপক্ষেই ষষ্ঠ ইমাম জাফর ইবন সাদিক বিশ্বাসকে কর্ম হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। পয়গম্বর ও ইমামদের মতো বিশ্বাসীকে জাগতিক জীবনেই ঈশ্বরের দর্শনকে কার্যকর করে তুলতে হবে।
শিয়াহ শতাব্দীতে বসরায় গড়ে ওঠা এক গুপ্ত গোষ্ঠী ইকওয়ান আল-সাফা বা ব্রেদরেন অভ পিউরিটি-ও এইসব আদর্শ গ্রহণ করেছিল । ব্রেদরেনরা সম্ভবত ইসমায়েলিদের দলছুট অংশ ছিল। ইসমায়েলিদের মতো এরাও নিজেদের বিজ্ঞান, বিশেষ করে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করেছিল। ইসমায়েলিদের মতোই ব্রেদরেনরাও বাতিন বা জীবনের গূঢ় অর্থের সন্ধান করেছিল। এদের এপিসলস্ (রাসায়েল) দার্শনিক বিজ্ঞানের বিশ্বকোষে পরিণত হয়েছিল। সুদূর স্পেন পর্যন্ত এর প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রেদরেনরা আবার বিজ্ঞান ও অতিন্দ্রীয়বাদের মিশ্রণ ঘটিয়েছিল। গণিতকে দর্শন ও মনস্তত্বের পূর্বশর্ত হিসাবে দেখা হয়েছে। বিভিন্ন সংখ্যা আত্মার সহজাত বিভিন্ন অবস্থা প্রকাশ করে; এগুলো ছিল মনোসংযোগের একটা পদ্ধতি যা শিক্ষাব্রতাঁকে মনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠতে সফল করে তুলত। সেইন্ট অগাস্তিন যেমন আত্মজ্ঞানকে ঈশ্বরের জ্ঞানের জন্যে অপরিহার্য হিসাবে দেখেছিলেন, ঠিক তেমনি নিজ সম্পর্কে এক গভীর উপলব্ধিও ইসলামি অতিন্দ্রীয়বাদের মূল বিষয়ে পরিণত হয়। সুন্নী অতিন্দ্রীয়বাদী অর্থাৎ সুফী, যাদের সঙ্গে ইসমায়েলিরা যথেষ্ট নৈকট্য বোধ করত, তাদের একটা নীতিবাক্য ছিল: “যে নিজেকে চিনতে পেরেছে সে তার প্রভুকে চিনতে পেরেছে। ব্রেদরেনদের ‘ফার্স্ট এপিল’-এ একথা উদ্ধৃত হয়েছে। আত্মার সংখ্যা নিয়ে ধ্যান করার সময় মনের গভীরে মানব সত্তার মূল আদি ওয়ানে ফিরে যেত তারা। ব্রেদরেনরা ফায়লাসুফদেরও বেশ কাছাকাছি ছিল। মুসলিম যুক্তিবাদীদের মতো তারাও সত্যের অখণ্ড রূপের উপর জোর দিয়েছে, সর্বত্রই যার অনুসন্ধান করতে হবে। একজন সত্যানুসন্ধানী অবশ্যই ‘বিজ্ঞান ত্যাগ করবে না, কোনও পুস্তককে নিন্দা করবে না, নির্দিষ্ট কোনও বিশ্বাসও আঁকড়ে থাকবে না। ঈশ্বর সম্পর্কে এক নিওপ্লেটোনিক ধারণা গড়ে তুলেছিল তারা, যাকে তারা প্রটিনাসের অনিবার্চনীয়। দুর্বোধ্য ‘দ্য ওয়ানের মতোই দেখেছে। ফায়লাসুফদের মতো তারা প্রচলিত কোরানিক মতবাদের ‘শূন্য হতে সৃষ্টি’র বদলে উৎসারণের প্লেটোনিক মতবাদেরই অনুসারি ছিল: জগৎ স্বর্গীয় কারণ’কে প্রকাশ করে আর মানুষ ঐশী জগতে অংশ নিতে পারে, আপন যৌক্তিক ক্ষমতাকে পরিশোধন করে ‘দ্য ওয়ানের কাছে ফিরে যেতে পারে ।
পশ্চিমে আভিসেনা নামে পরিচিত আবু আলি ইবন সিনা (৯৮০-১০৩৭) এর রচনাবলীতে ফালসাফাহ্ এর সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছেছিল। সেন্ট্রাল এশিয়ার বুখারার কাছে এক শিয়াহ কর্মকর্তার পরিবারে জন্ম গ্রহণকারী ইবন সিনা তার বাবার কাছে আগত ইসমায়েলিদের যুক্তি-তর্ক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এক বিস্ময়বালকে পরিণত হন তিনিঃ ষোল বছর বয়সে বিশিষ্ট চিকিৎসকদের পরামর্শক এবং আঠার বছর বয়সে গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও পদার্থ বিজ্ঞানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। অবশ্য অ্যারিস্টটল তাঁর কাছে কঠিন ঠেকেছে, কিন্তু আল-ফারাবির ইনটেনশনস অভ অ্যারিস্টটল’স মেটাফিজিক্স পাঠ করার পর আলোর দেখা পান। ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসক হিসাবে কাজ করছেন তিনি, গোটা ইসলামি সাম্রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃষ্ঠপোষকদের খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এক পর্যায়ে বর্তমান ইরান ও দক্ষিণ ইরাক অঞ্চলের শাসক শিয়াহু বায়িদ বংশের উজিরের দায়িত্ব পান তিনি। মেধাবী এবং প্রাজ্ঞ বুদ্ধিজীবী ইবন সিনা তথাকথিত পণ্ডিত ছিলেন না। তিনি ইন্দ্রিয়পরায়ণও ছিলেন এবং বলা হয়ে থাকে যে সুরা ও যৌনতার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির কারণে মাত্র আটান্ন বছর বয়সে অকাল মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
ইবন সিনা বুঝতে পেরেছিলেন, ইসলামি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে ফালসাফাহর অভিযোজনের প্রয়োজন রয়েছে। আব্বাসীয় খেলাফতের তখন পতনোন্মুখ অবস্থা। রিপাবলিকে প্লেটোর বর্ণিত আদর্শ দার্শনিক সমাজ গঠনের জন্যে খেলাফতভিত্তিক রাষ্ট্রকে আর উপযোগি ভাবা যাচ্ছিল না। স্বাভাবতই ইবন সিনা শিয়াহ্ আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক আশাআকাক্ষার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তবে ফালসাফাহ্র নিও প্লেটোনিজমের প্রতি বেশি আকর্ষণ ছিল তার। তিনি অতীতের ফায়লাসুফদের চেয়ে বেশি সাফল্যের সঙ্গে এর ইসলামিকরণে সফল হয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটিয়ে তোলার ফালসাফাহ্র দাবি প্রমাণ করতে হলে একে অবশ্যই সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের অধিকতর অর্থ প্রকাশ করতে হবে, যা-যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন-রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের এক প্রধান সত্য। ধর্মকে ফালসাফাহর নিম্নস্তরের ভাষ্য হিসাবে না দেখে ইবন সিনা মনে করেছেন মুহাম্মদের (স) মতো পয়গম্বর যেকোনও দার্শনিকের চেয়ে শ্রেয়তর, কারণ তিনি মানবীয় কারণের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না, বরং সরাসরি ও সহজাতভাবে ঈশ্বরের জ্ঞান লাভ করেছেন। এটা সুফীদের বর্ণিত অতিন্দ্রীয়বাদী অভিজ্ঞতা ও স্বয়ং প্রটিনাস উল্লিখিত প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ রূপের অনুরূপ। অবশ্য এর মানে এই ছিল না যে, বুদ্ধি দিয়ে ঈশ্বরের কিছুই বোঝা যাবে না। অ্যারিস্টটলের প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ইবন সিনা ঈশ্বরের অস্তিত্বের এক যৌক্তিক প্রতিপাদ্য বের করেছিলেন যা ইহুদিবাদ ও ইসলামের মধ্যযুগের শেষদিকের দার্শনিকদের আদর্শে পরিণত হয়েছিল। ফায়লাসুফ বা ইবন সিনার মাঝে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। তারা কখনও সাহায্যবিহীন মানবীয় যুক্তি দিয়ে পরম সত্তার অস্তিত্বের জ্ঞান লাভের সম্ভাব্যতায় সন্দেহ প্রকাশ করেননি। যুক্তি মানুষের মহোত্তম কাজ: এটা স্বর্গীয় কারণের অংশী এবং ধর্মীয় অনুসন্ধিৎসুতার ক্ষেত্রে স্পষ্টতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এর। এভাবে যাদের ঈশ্বরকে জানার বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা বা ক্ষমতা আছে ইবন সিনা তাদের জন্যে একে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসাবে দেখেছেন, কারণ যুক্তি ঈশ্বরের ধারণাকে পরিশুদ্ধ করতে পারে এবং তাঁকে কুসংস্কার ও মানব রূপ হতে মুক্ত করতে পারে। ইবন সিনা ও তাঁর উত্তসূরিরা যারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব দেখানোর যৌক্তিক প্রতিপাদ্যের দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন, তারা কিন্তু আমাদের মতো করে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে যুক্তি উত্তাপন করেননি। ঈশ্বরের প্রকৃতি সম্পর্কে যতটা সম্ভব জানার জন্যে যুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে চেয়েছেন তাঁরা।
