গ্রিকদের মতো আল-ফারাবি দ্য ওয়ান হতে দশটি পর্যায়ক্রমিক উৎসারণ বা বুদ্ধিমত্তায়’ সত্তার ধারা অগ্রসর হতে দেখেছেন, যার প্রতিটি টলেমিয় বলয় সমূহের একেকটি অংশ সৃষ্টি করেছে: বাইরের আকাশসমূহ, স্থির তারকামণ্ডলীর বলয়; শনি, বৃহস্পতি, মঙ্গল, সূর্য, শুক্র, বুধ ও চাঁদের বলয়। আমরা একবার আমাদের পার্থিব জগতে প্রবেশ করলে জড় পদার্থ হতে শুরু হয়ে গাছ-পালা ও জীবজন্তুর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে মানুষে শেষ হওয়া বিপরীত দিক হতে বিকশিত সত্তার একটা ধারাক্রম (Hierarchy) সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি; যার আত্মা ও বুদ্ধিমত্তা স্বর্গীয় কারণের (Reason) অংশ, কিন্তু যার দেহ আসে মাটি হতে। প্লেটো এবং প্লাটিনাস বর্ণিত পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়ায় মানুষ তার পার্থিব বাধা ছিন্ন করে স্বাভাবিক গন্তব্য ঈশ্বরের কাছে ফিরে যেতে পারে।
সত্তা সম্পর্কে কোরানের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পার্থক্য ছিল, কিন্তু আল-ফারাবি দর্শনকে সত্য উপলব্ধি করার শ্রেয়তর উপায় হিসাবে দেখেছেন; মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টি করার জন্যে পয়গম্বরগণ যা কাব্যিক এবং রূপকার্থে প্রকাশ করেছিলেন। ফালসাফাহ সবার উপযোগি ছিল না। দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি এক ধরনের নিগূঢ় উপাদান ইসলামে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল। ফালসাফাহ্ ছিল এ ধরনের একটি নিগূঢ় অনুশীলন। সুফীবাদ ও শিয়াবাদও পবিত্র আইন ও কোরানকে কাঠোরভাবে অনুসরণকারী উলেমাদের চেয়ে ভিন্নভাবে ইসলামকে ব্যাখ্যা করেছে। আবার, সাধারণ মানুষকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিন্তু তারা নিজস্ব মতবাদের গোপনীয়তা বজায় রাখেনি, বরং ফায়লাসুফ, সুফী এবং শিয়াদের সবাই বুঝতে পেরেছিল যে, ইসলাম সম্পর্কিত তাদের অধিকতর দুঃসাহসী ও উদ্ভাবনী ভাষ্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারত। ফালসাফাহর মতবাদ, সুফীবাদ কিংবা শিয়াদের ইমামতত্ত্বের আক্ষরিক বা সরলীকৃত ব্যাখ্যা সত্য আবিষ্কারের প্রতীকী, যৌক্তিক কিংবা কল্পনানির্ভর পদ্ধতি বোঝার যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণহীন ব্যক্তিকে ধাঁধায় ফেলে দিতে পারে। এই গোপন দলগুলোর মন-প্রাণের বিশেষ অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষাব্রতাঁকে যত্নের সঙ্গে এসব জটিল ধারণা গ্রহণ করার উপযোগি করে ভোলা হতো। আমরা দেখেছি, ডগমা ও কেরিগমার পার্থক্যকরণে গ্রিক ক্রিশ্চানরা একই রকম ধারণা গড়ে তুলেছিল। পশ্চিমে গুপ্ত বা নিগূঢ় ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি, সবার বোধগম্য বলে বিবেচিত ধর্মের কেরিগম্যাটিক ব্যাখ্যাই অনুসৃত হয়েছে।’ তথাকথিত ভিন্ন মতাবলম্বীদের আত্মগোপনে যেতে না দিয়ে পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা স্রেফ তাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে আর নন-করফরমিস্টদের নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস পেয়েছে। ইসলামি রাজ্যে নিগূঢ় চিন্তাবিদগণ সাধারণত নিজেদের বিছানাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
আল-ফারাবির উৎসারণ-মতবাদ ফায়লাসুফদের কাছে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আমরা দেখব, অতিন্দ্রীয়বাদীগণও শূন্য হতে সৃষ্টির মতবাদের তুলনায় উৎসারণের ধারণাকে বেশি সহানুভূতিশীল বলে আবিষ্কার করেছে। দর্শন ও যুক্তিকে ধর্মের প্রতিপক্ষ বিবেচনা করার বদলে মুসলিম সুফী ও ইহুদি কাব্বালিস্টরা প্রায়শঃই ফায়সুফদের দর্শনকে তাদের অধিকতর কল্পনা নির্ভর ধর্মের প্রতি অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে দেখেছে। শিয়া মতবাদে এ বিষয়টি বিশেষভাবে স্পষ্ট। ইসলামে তারা সংখ্যালঘু রয়ে গেলেও দশম শতাব্দী শিয়াহ শতাব্দী হিসাবে পরিচিত, কেননা গোটা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক পদসমূহে শিয়ারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। এইসব শিয়াহ্ উদ্যোগের সফলতা ছিল বাগদাদের সুন্নী খেলাফতের বিপরীতে ৯০৯ সালে তিউনিসে শিয়াহ খেলাফতের প্রতিষ্ঠা। এটা ছিল ফাতিমিয় বা সেভেনারস’ নামে পরিচিত ইসমায়েলি সম্প্রদায়ের অর্জন, এরা বার জন ইমামের কর্তৃত মেনে নেওয়া অধিক সংখ্যাক টুয়েলভার’ শিয়াদের চেয়ে আলাদা। ৭৬৫ সালে সাধুপ্রতীম ষষ্ঠ ইমাম জাফর ইবন সাদিকের মৃত্যুর পর ইসমায়েলিরা টুয়েলভারদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে। জাফর তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে ছেলে ইসমাইলকে মনোনীত করেছিলেন, কিন্তু ইসমাইলের অকাল মৃত্যু ঘটলে টুয়েলভাররা তাঁর ভাই মুসার নেতৃত্ব মেনে নেয়। কিন্তু ইসমায়েলিরা ইসমাইলের অনুগত রয়ে যায় এবং বিশ্বাস করে যে নেতৃত্বের ধারা শেষ হয়ে গেছে। তাদের উত্তর আফ্রিকার খেলাফত প্রবল ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে: ৯৭৩ সালে আধুনিক কায়রোর অবস্থান আল কাহিরাহয় রাজধানী স্থানান্তর করে এখানে তারা বিখ্যাত আল-আযহার মসজিদ নির্মাণ করে।
তবে ইমামদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দীপনা ছিল না। আমরা যেমন দেখেছি, শিয়ারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে রহস্যময় কোনও উপায়ে ইমামগণ পৃথিবীতে ঈশ্বরের সত্তা ধারণ করেন। কোরানের প্রতীকী পাঠের ওপর নির্ভরশীল নিজস্ব নিগূঢ় ধার্মিকতা গড়ে তুলেছিল তারা। মনে করা হয়েছে যে, মুহাম্মদ (স) তার চাচাত ভাই ও জামাতা আলি ইবন আবি তালিবকে গুপ্তজ্ঞান দিয়েছিলেন এবং এই ইলম তার সরাসরি বংশধর মনোনীত ইমামদের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে এসেছে। প্রত্যেক ইমাম ‘মুহাম্মদের আলো’র ধারক (আল-নূর আল-মুহাম্মদ-পয়গম্বরসূচক চেতনা-যা মুহাম্মদকে (স) নিখুঁতভাবে ঈশ্বরে আত্মসমর্পনে সক্ষম করে তুলেছিল। পয়গম্বর বা ইমামদের কেউই স্বর্গীয় ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা এমনভাবে খোদমুখী ছিলেন যে বলা যায়, ঈশ্বর তাদের মাঝে সাধারণ মরণশীলদের মাঝে যেভাবে অবস্থান করেন তারা চেয়ে আরও পরিপূর্ণভাবে অবস্থান করেছেন। নেস্টরিয়ানরা জেসাস সম্পর্কে একই রকম ধারণা পোষণ করত। নেস্টরিয়ানদের মতো শিয়ারাও তাদের ইমামদের আলোকিত স্বর্গীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ ঈশ্বরের মন্দির’ বা ‘কোষাগার’ হিসাবে দেখেছে। এই ইলম কেবল গোপন তথ্য নয় বরং পরিবর্তন ও অন্তর শুদ্ধকরণের উপায় । দা’ঈর (আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শক) পথ নির্দেশ অনুসরণ করে অনুসারী স্বপ্নের মতো স্পষ্ট দিব্যদর্শনে শৈথিল্য ও অনুভূতিহীন অবস্থা হতে বেরিয়ে আসবে। এটা তাকে এমনভাবে বদলে দিত যে, কোরানের নিগূঢ় ব্যাখ্যা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করত সে। দশম শতাব্দীর ইসমায়েলি দার্শনিক নাসিরি আল-খুসর এর এই কবিতায় আমরা দেখতে পাই সচেতন হয়ে ওঠার ক্রিয়াই মূল অভিজ্ঞতা-এই কবিতায় তিনি তার জীবনকে বদলে দেওয়া ইমাম দর্শনের বর্ণনা দিছেন:
