এভাবে কোরানে যৌক্তিক পদ্ধতি প্রয়োগকারী প্রথম মুসলিম ইয়াকুব ইবন ইসহাক আল-কিন্দি (মৃত্যু. ৭০) ঘনিষ্ঠভাবে মুতাযিলিদের কাছাকাছি ছিলেন; বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অ্যারিস্টটলের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন তিনি। বসরায় শিক্ষাগ্রহণ করলেও বাগদাদের স্থায়ী হয়েছিলেন তিনি। এখানে খলিফা আল-মামুনের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন। গণিত, বিজ্ঞান ও দর্শনে তার অবদান ও প্রভাব অপরিসীম। কিন্তু তার মূল আগ্রহ ছিল ধর্ম। মুতাযিলি পটভূমির কারণে দর্শনকে তিনি প্রত্যাদেশের অনুগামী ছাড়া ভিন্ন কিছু ভাবতে পারেননিঃ পয়গম্বরদের অনুপ্রাণিত জ্ঞান সবসময়ই দার্শনিকদের তুচ্ছ মানবীয় দর্শনকে অতিক্রম করে গেছে। পরবর্তীকালে অধিকাংশ ফয়ালাসুফ এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করবে না। আল-কিন্দি অবশ্য অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের সত্য আবিষ্কারেও উদগ্রীব ছিলেন। সত্য একটাই, শত শত বছর ধরে এটা যেমন সাংস্কৃতিক বা ভাষাগত আচরণই গ্রহণ করে থাকুক না কেন, দর্শনিকের দায়িত্ব হচ্ছে একে খুঁজে বের করা।
সত্য স্বীকার করে নেওয়ার এবং তা যে কোনও উৎস হতেই আসুক, হোক কেন অতীত প্রজন্মের এবং বিদেশী জাতির, গ্রহণ করতে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত নয় । যিনি সত্যের সন্ধানে নিয়োজিত তার জন্যে সত্যের চেয়ে অধিক মূল্যবান অন্য কিছু নেই; সত্য কখনও তাকে ছোট বা অসম্মান করে না, বরং যিনি এর দিকে হাত বাড়ান, সত্য তাঁকে মহিমান্বিত ও সম্মানিত করে।
এখানে আল-কিন্দি কোরানের অনুসারী। কিন্তু নিজেকে পয়গম্বরদের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রিক দার্শনিকদেরও শরণাপন্ন হয়েছিলেন বলে আরও অগ্রসর হয়েছেন তিনি। একজন প্রধান চালক (Prime Mover)-এর অস্তিত্ব প্রসঙ্গে অ্যারিস্টটলের যুক্তি ব্যবহার করেছেন তিনি, যুক্তি দেখিয়েছেন যে, যৌক্তিক বিশ্বে সবকিছুর পেছনেই কারণ রয়েছে। সুতরাং পুরো প্রক্রিয়া শুরু করার জন্যে একজন অটল চালক নিশ্চয়ই থাকবেন। এই প্রথম নীতিই (First Principle)-ই অপরিবর্তনীয়, নিখুঁত ও অবিনশ্বর সত্তা স্বয়ং। কিন্তু এই উপসংহারে পৌঁছার পর আল-কিন্দি কোরানের শূন্য হতে সৃষ্টির মতবাদ অনুসরণ করে অ্যারিস্টটলকে ছেড়ে গেছেন। একে শূন্য হতে (ex nihilo) কোনও কিছু করা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। এটাই, যুক্তি দেন আল-কিন্দি, ঈশ্বরের বিশেষ অধিকার। তিনিই একমাত্র সত্তা যার পক্ষে এভাবে কাজ করা সম্ভব এবং তিনিই আমাদের চারপাশের জগতে আমরা যেসব কর্মকাণ্ড লক্ষ করি তার প্রকৃত কারণ।
ফালসাফাহ্র আগমন ছিল শূন্য হতে সৃষ্টির মতবাদ প্রত্যাখ্যানের জন্যে; সুতরাং আল-কিন্দিকে প্রকৃত ফায়সুফ হিসাবে বর্ণনা করা যায় না। কিন্তু তিনি ছিলেন পদ্ধতিগত মেটাফিজিক্সের সঙ্গে ধর্মীয় সত্যের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ইসলামি প্রয়াসের অগ্রপুরষ। তাঁর উত্তরসুরিগণ ছিলেন আরও উগ্র। এভাবে আবু বকর মুহাম্মদ ইবন যাকারিয়া আর-রাযি (মৃত্যু. ৯৩০) যাকে মুসলিম ইতিহাসের মহা ননকনফরমিস্ট হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়, অ্যারিস্টটলের মেটাফিজিক্স নাকচ করে নসটিকদের মতো সৃষ্টিকে স্রষ্টার কর্মকাণ্ড হিসাবে দেখেছেন: সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ঈশ্বরের হতে বস্তু উৎসারিত হতে পারে না। তিনি প্রাইম মুভার সম্পর্কিত অ্যারিস্টটলিয় সমাধানও প্রত্যাখ্যান করেন, প্রত্যাদেশ ও পয়গম্বরত্বের কোরানিক মতবাদসমূহও প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেবল যুক্তি ও দর্শনই আমাদের রক্ষা করতে পারে। সুতরাং আর-রাযি প্রকৃত পক্ষে একেশ্বরবাদী ছিলেন নাঃ সম্ভবত তিনিই প্রথম মুক্ত চিন্তাবিদ যিনি ঈশ্বরের ধারণাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বেমামান জানতে পেরেছিলেন। দক্ষ চিকিৎসক এবং দয়ালু ও দানশীল মানুষ ছিলেন তিনি, ইরানে নিজ এলাকা রাঈতে হাসপাতাল প্রধান হিসাবে বহু বছর কাজ করেছেন। অধিকাংশ ফায়সালুফই তাদের যুক্তিবাদকে এতটা চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়নি। সাধারণ মুসলিম বিশ্বাসীদের সঙ্গে বিতর্কে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, প্রকৃত ফায়সুফ প্রতিষ্ঠিত কোনও ধর্মের ওপর নির্ভর করতে পারে না, তার নিজেকেই চিন্তা করে সমাধান করতে হয়, কেননা একমাত্র যুক্তিই আমাদের সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। প্রকাশিত মতবাদসমূহের ওপর নির্ভরতা অর্থহীন, কারণ বিভিন্ন ধর্ম একমত হতে পারে না। কোনটা সঠিক, কে বলতে পারবে? কিন্তু তার প্রতিপক্ষ-কে ভ্রান্তিমূলকভাবে আর-রাযি বলেই ডাকা হয়-এক গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি উত্থাপন করেছিলেন। সাধারণ মানুষের কী হবে? জানতে চান তিনি। তাদের বেশিরভাগ দার্শনিক চিন্তাভাবনায় অক্ষম, তবে কি তাদের আশা নেই, ভুল আর বিভ্রান্তিতেই রয়ে যাবে তারা? ইসলামে ফালসাফাহর সংখ্যালঘু গোত্র রয়ে যাবার অন্যতম কারণ এর আভিজাত্যবাদ। এ মতবাদ নির্দিষ্ট বুদ্ধিমত্তার অধিকারীদের ভেতরই আবেদন জাগাতে পেরেছিল এবং তা মুসলিম সমাজের বৈশিষ্ট্য পরিণত হতে শুরু করা সাম্যবাদের চেতনা বিরুদ্ধে ছিল।
তুরস্কের ফায়সুফ আবু-নসর আল-ফারাবি (মৃত্যু. ৯৮০) দার্শনিক যুক্তিবাদে অক্ষম অশিক্ষিত জনগণের সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁকে প্রকৃত ফালসাফাহ্র প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে দেখা যেতে পারে। তিনি এই মুসলিম আদর্শের আকর্ষণীয় বিশ্বজনীনতা তুলে ধরেছিলেন। আল-ফারাবিকে আমরা রেনেস পুরুষ বলতে পারি; কেবল চিকিৎসক নন, সঙ্গীত শিল্পী ও অতিন্দ্রীয়বাদীও ছিলেন তিনি। তার অপিনিয়নস অভ দ্য ইনহ্যাবিট্যান্টস অভ আ ভারচুয়াস সিটিতে মুসলিম আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয়াদিও তুলে ধরেছিলেন তিনি। রিপাবলিক-এ প্লেটো যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, সাধারণ মানুষের ওপর প্রয়োগের যোগ্যতা রাখেন এমন একজন দার্শনিকের যৌক্তিক নীতিমালার অধীনে কোনও সৎসমাজ পরিচালিত হতে হবে। আল-ফারাবি মত প্রকাশ করেছেন, প্লেটো যেমন ব্যক্তির কথা কল্পনা করেছিলেন মুহাম্মদ (স) ঠিক তেমন একজন শাসক ছিলেন। তিনি মানুষের বোধগম্য এক কল্পনানির্ভর (Imaginitive) রূপের ধরণে কালোতীর্ণ সত্য প্রকাশ করেছেন, সুতরাং প্লেটোর আদর্শ সমাজ গঠনের জন্যে ইসলামই উপযুক্ত। সম্ভবত ইসলামের শিয়াহ্ ধরণ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল, কারণ এর প্রাজ্ঞ ইমামের কাল্ট। সক্রিয় সুফী হলেও আল-ফারাবি প্রত্যাদেশকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসাবে দেখেছেন। প্রচলিত প্রত্যাদেশের মতবাদ যেমন বোঝায়, মানুষের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা হতে সুদূরবর্তী গ্রিক দার্শনিকদের ঈশ্বর মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও জাগতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। অবশ্য, তার মানে এই ছিল না যে আল-ফারাবির মূল ভাবনা হতে ঈশ্বর দূরবর্তী ছিলেন। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ঈশ্বরের অবস্থান, ঈশ্বর সম্পর্কিত আলোচনা দিয়েই তাঁর রচনা মূর্ত হয়েছে। অবশ্য এই ঈশ্বর অ্যারিস্টটল ও পুটিনাসের ঈশ্বর: সকল সত্তার শুরু তিনি। ডেনিস দ্য আরোপাগাইতের অতিন্দ্রীয় দর্শনের উপর নির্ভর করে বেড়ে ওঠা কোনও গ্রিক ক্রিশ্চান ঈশ্বরকে কেবল ভিন্ন এক সত্তা হিসাবে তুলে ধরে এমন তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু আল-ফারাবি অ্যারিস্টটলের কাছাকাছি রয়ে গেছেন। ঈশ্বর ‘সহসা সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বিশ্বাস করতেন না তিনি। সেক্ষেত্রে অনন্ত ও অটল ঈশ্বরের অশোভন পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়ে পড়ত।
