বর্তমানে এরকম যৌক্তিক বিশ্বজগতের ধারণায় বিশ্বাস আমাদের চোখে অপরিপক্ক ঠেকে, কারণ আমাদের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো বহু। আগেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের প্রমাণের অসারতা প্রকাশ করে দিয়েছে। নবম ও দশম শতাব্দীর কোনও ব্যক্তির কাছে এই দৃষ্টিভঙ্গি অসম্ভব ছিল, তবে ফালসাফাহর অভিজ্ঞতা আমাদের চলমান ধর্মীয় বিপত্তির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। আব্বাসীয় আমলে সংঘটিত বৈজ্ঞানিক বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের নতুন তথ্য সংগ্রহের চেয়েও অধিক কিছু করার প্রয়োজন হয়েছিল। আমাদের বর্তমান কালের মতো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এক নতুন ভিন্ন মানসিকতার বিকাশের দাবি করেছে, যা ফায়লাসুফদের বিশ্ব সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়। বিজ্ঞান প্রত্যেক ঘটনা বা বিষয়ের পেছনে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা রয়েছে বলে বিশ্বাস দাবি করে। এর ওপর এখানে এক ধরনের সাহস ও কল্পনাশক্তিরও প্রয়োজন, যেগুলো ধর্মীয় সৃজনশীলতার চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন নয়। পয়গম্বর বা অতিন্দ্রীয়বাদীদের মতো বিজ্ঞানীরাও নিজেদের অজ্ঞাত বাস্তবতার অন্ধকার এবং অনিশ্চিত বলয়ের মোকাবিলায় ঠেলে দেন। এতে করে অনিবার্যভাবে ফায়সুফদের ঈশ্বর সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত হয়েছিল এবং তারা সমসাময়িকদের বিশ্বাস পরিবর্তন, এমনকি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। একইভাবে আমাদের বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শন বহু লোকের ক্ষেত্রেই ধ্রুপদী ঈশ্বরবাদে বিশ্বাস অসম্ভব করে তুলেছে। পুরোনো ধর্মতত্ত্ব আঁকড়ে থাকাটা কেবল সাহসেরই ব্যর্থতা নয় বরং এতে সংহতিও বিনষ্ট হতে পারে। ফায়সালুফরা ইসলামি ধর্মবিশ্বাসের মূলধারার সঙ্গে তাঁদের নতুন দর্শনের সমন্বয়ের মাধ্যমে গ্রিক অনুপ্রাণিত বৈপ্লবিক ঈশ্বর ধারণার অবতারণা করেছে। কিন্তু তারপরেও তাদের যৌক্তিক উপাস্যের শেষ পরিণতি ধর্মীয় সত্যের ব্যাপারে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানায়।
ফায়সুফরা অতীতের যে কোনও একেশ্বরবাদীদের তুলনায় আরও গভীরভাবে গ্রিক দর্শন ও ধর্মের সমন্বয়ের প্রয়াস পেয়েছিল। মুতাযিলি এবং আশারিবাদীরা উভয়ই প্রত্যাদেশ ও স্বাভাবিক যুক্তির মাঝে একটা সেতুবন্ধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের বেলায় প্রত্যাদেশের ঈশ্বরের অবস্থান ছিল সবার আগে। ইতিহাসকে থিওফ্যানি হিসাবে দেখার প্রচলিত একেশ্বরবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল ‘কালাম’; তাদের দাবি ছিল: নিরেট ও বিশেষ কিছু ঘটনাবলীর গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এগুলোই আমাদের সীমিত নিশ্চয়তার যোগান দেয়। প্রকৃতপক্ষে, আশারিরা সাধারণ নিয়ম ও চিরকালীন নীতিমালার অস্তিত্বে সন্দিহান ছিল। যদিও এই। অ্যাটমিজমের ধর্মীয় ও কল্পণাপ্রবণতার মূল্য ছিল, কিন্তু তা বৈজ্ঞানিক চেতনার বিরোধী ছিল বলে ফায়লাসুফদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাদের ফালসাফাহ নিরেট ও বিশেষ ধরনের ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আশারিদের প্রত্যাখ্যাত সাধারণ নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছে। যৌক্তিক বিতর্কের মাধ্যমে তাদের ঈশ্বরকে আবিষ্কার করতে হবে, কোনও নির্ধারিত সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ কোনও নারী ও পুরুষের কাছে নির্দিষ্ট প্রত্যাদেশের মাধ্যমে নয়। এই বাস্তব সরল সত্যের অনুসন্ধান তাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় ও চরম সত্তাকে অনুভব করার পথ নির্দিষ্ট করে দেয়, ঈশ্বর সবার ক্ষেত্রে একই রকম নন, অনিবার্য সাংস্কৃতিক বর্ণ থাক বা না থাক, মৌলিক ধর্মীয় প্রশ্নের সন্তোষজনক সমাধান দিতে পারবেন নাঃ ‘জীবনের আসল বা শেষ অর্থ কী? গবেষণাগারে বিশ্বজনীন প্রয়োগ আছে এমন কিছুর বৈজ্ঞানিক সমাধান খোঁজার পাশাপাশি বিশ্বাসীরা ক্রমবর্ধমান হারে কেবল মুসলিমদের অধিকারভুক্ত কোনও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে পারে না। কিন্তু তারপরেও কোরানের গবেষণা হতে দেখা যায় যে স্বয়ং মুহাম্মদের (স) এক বিশ্বজনীন দর্শন ছিল, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন: সত্য পথে পরিচালিত সকল ধর্মই ঈশ্বর হতে আগত। ফায়লাসুফরা কোরানকে বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। বরং দুটোর মাঝে সম্পর্ক দেখাতে চেয়েছে: উভয়ই ব্যক্তি বিশেষের প্রয়োজন অনুযায়ী ঈশ্বরের কাছে পৌঁছার বৈধ পথ । বিজ্ঞান ও প্রত্যাদেশ, যুক্তিবাদ ও বিশ্বাসের মাঝে মৌলিক কোনও পার্থক্য দেখেনি তারা, বরং প্রফেটিক ফিলসফি নামে আখ্যায়িত প্রসঙ্গের অবতারণা করেছে। ইতিহাসের সূচনালগ্ন হতে ঈশ্বরের একই সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াসে নিয়োজিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ধর্মের মূলে অবস্থানরত প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে চেয়েছিল তারা।
গ্রিক বিজ্ঞান এবং মেটাফিজিক্সের সংস্পর্শে আসার সুবাদে ফালসাফাহ অনুপ্রাণিত হয়ে উঠলেও তা হেলেনিজমের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল ছিল না। গ্রিকরা তাদের মধ্যপ্রাচ্যীয় উপনিবেশগুলোয় একটা বিশেষ মানসম্পন্ন শিক্ষাক্রম অনুসরণ করতে চাইত, যাতে হেলেনিস্টিক দর্শনে আলাদা জোর দেওয়া হলেও আশা করা হতো যে, প্রত্যেক ছাত্র এক বিশেষ অনুক্রমে একগুচ্ছ নির্দিষ্ট বিষয় পাঠ করবে। ফলে এক ধরনের সমতা ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছিল। ফায়লাসুফরা অবশ্য এই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেনি, বরং যখন যেভাবে পেয়েছে বিষয়বস্তু পড়ে নিয়েছে। এর ফলে অনিবার্যভাবে এক নতুন দৃষ্টিকোণের দুয়ার খুলে গেছে। নিজস্ব ইসলামি ও আরবীয় দর্শনের পাশাপাশি পার্সিয়া, ভারতীয় ও নসটিক প্রভাবেও তাদের চিন্তা-চেতনা আলোড়িত হয়েছে।
