কালামের পরীক্ষা দেখায়, যদিও ঈশ্বরকে যৌক্তিকভাবে দুর্বোধ্য প্রমাণ করার জন্যে যৌক্তিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব, কিন্তু কোনও কোনও মুসলিম এতে অস্বস্তি বোধ করবে। পশ্চিমে খৃস্টধর্মে কালাম কখনও তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। মুতাফিলিদের সমর্থক আব্বাসিয় খলিফারা এদের মতবাদ বিশ্বাসীরা গ্রহণ না করায় চাপিয়ে দিতে পারেননি । মধ্যযুগের পুরো সময়টায়। ভবিষ্যতের চিন্তাবিদদের ওপর যুক্তিবাদের প্রভাব অব্যাহত থাকে, কিন্তু তা সংখ্যালঘুর প্রয়াস রয়ে যায়; অধিকাংশ মুসলিম গোটা বিষয়টিকে অবিশ্বাস করে বসে। খৃস্টধর্ম ও ইহুদিবাদের মতো সেমিটিক অভিজ্ঞতা থেকে ইসলাম আবির্ভূত হয়েছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের হেলেনিক কেন্দ্রসমূহের গ্রিক যুক্তিবাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। অন্য মুসলিমরা ইসলামের ঈশ্বরের আরও প্রবল হেলেনাইজেশনের প্রয়াস পেয়েছিল এবং তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মে এক নতুন দার্শনিক উপাদানের যোগ করেছে। ইহুদিবাদ, খৃস্টধর্ম এবং ইসলাম, এই তিনটি ধর্ম দর্শনের বৈধতা ও ঈশ্বরের রহস্যময়তার সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে আলাদা কিন্তু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ উপসংহারে পৌঁছুবে।
০৬. দার্শনিকদের ঈশ্বর
নবম শতকে আরবরা গ্রিক বিজ্ঞান ও দর্শনের সংস্পর্শে আসে এবং এর ফলস্বরূপ এক সাংস্কৃতিক জাগরণের সৃষ্টি হয় যাকে ইউরোপিয় ভাষায় রেনেসা ও আলোকনের মিলন হিসাবে দেখা যেতে পারে। অনুবাদকের একটা দল, যাদের অধিকাংশই ছিল নেস্টোরিয়ান ক্রিশ্চান, আরবী ভাষায় গ্রিক টেক্সট সুপ্রাপ্য করে তোলে, চমৎকার ছিল তাদের অনুবাদ। আরব মুসলিমরা এবার অ্যাস্ট্রনমি, আলকেমি, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্র নিয়ে গবেষণায় মনোযোগি হওয়ায় এমন সাফল্য অর্জন করে যে নবম ও দশম শতকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে এত বেশি সংখ্যক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অর্জিত হয় যা অতীতের কোনও সময় ঘটেনি। ফালাসাফাহ্ নামের এক আদর্শের প্রতি নিবেদিত এক নতুন ধরনের মুসলিমদের আবির্ভাব ঘটে। সাধারণত একে ‘দর্শন হিসাবে অনুবাদ করা হয়ে থাকে, কিন্তু এর আরও ব্যাপক ও ঋদ্ধ অর্থ রয়েছে: অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি ফিলোসফেসদের মতো ফায়লাসুফগণ মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণকারী আইন অনুযায়ী যৌক্তিকভাবে জীবনধারণ করতে চেয়েছে। প্রথম দিকে তারা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ওপর জোর দিলেও পরে অনিবার্যভাবে গ্রিক মেটাফিজিক্সের শরণাপন্ন হয় ও এর নীতিমালাকে ইসলামে প্রয়োগে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে গ্রিক দার্শনিকদের ঈশ্বর ও আল্লাহ্ একই। গ্রিক ক্রিশ্চানরাও হেলেনিজমের সঙ্গে নৈকট্য বোধ করেছিল, কিন্তু গ্রিকদের ঈশ্বরকে বাইবেলের অধিকতর স্ববিরোধী ঈশ্বর দিয়ে বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল: ফলে, আমরা দেখব, শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের পর্যালোচনায় যুক্তি তর্কের খুব একটা স্থান নেই বিশ্বাস করে তারা তাদের নিজস্ব দার্শনিক ঐতিহ্যে বিশ্বাস থেকে থেকে পিছু হাটে গিয়েছিল। অবশ্য ফায়ালাসুফরা বিপরীত উপসংহারের পৌঁছেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, যুক্তিবাদ ধর্মের সবচেয়ে অগ্রসর রূপের প্রতিনিধিত্ব করে-তারা ঐশীগ্রন্থের প্রকাশিত ঈশ্বরের চেয়ে উচ্চতর ঈশ্বর ধারণার বিকাশ ঘটিয়েছিল ।
বর্তমান সময়ে আমরা সাধারণভাবে বিজ্ঞান ও দর্শনকে ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখে থাকি, কিন্তু ফায়সুফরা সাধারণভাবেই ধার্মিক মানুষ ছিল, নিজেদের পয়গম্বরের অনুগত সন্তান মনে করত তারা। সৎ মুসলিম হিসাবে রাজনৈতিকভাবে তারা সজাগ ছিল, রাজ দরবারের বিলাসিতার বিরোধিতা করত ও যুক্তির নির্দেশ অনুযায়ী আপন সমাজকে সংস্কার করতে চেয়েছে। তাদের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল: তাদের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গবেষণা গ্রিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিল বলে তাদের বিশ্বাস ও অধিকতর যুক্তিবাদী, বস্তুবাদী, বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর একটা সংযোগ আবিষ্কার করার প্রয়োজন ছিল। ঈশ্বরকে পুরোপুরি পৃথক বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীতে অবনমন ও ধর্ম বিশ্বাসকে মানুষের অপরাপর বিষয়াদি হতে আলাদা করে দেখা সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর ব্যাপার। ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না ফায়সুফদের বরং তারা তাদের চোখে আদিম ও সংকীর্ণ উপাদানসমূহ হতে পরিশুদ্ধতা আনতে চেয়েছিল। ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে তাদের কোনও সংশয় ছিল না-প্রকৃতপক্ষে, ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্ব-প্রকাশিত মনে করত তারা কিন্তু আল্লাহ তাদের যুক্তিবাদী আদর্শের সঙ্গে মাননসই দেখাতে যুক্তি দিয়ে প্রমাণের গুরুত্ব অনুভব করেছিল।
অবশ্য সমস্যা ছিল। আমরা দেখেছি, গ্রিক দার্শনিকদের ঈশ্বর প্রত্যাদেশের ঈশ্বরের চেয়ে একেবারে ভিন্ন ছিলেন: অ্যারিস্টটল বা প্রাটিনাসের পরম উপাস্য কালহীন এবং নিরাসক্ত, যিনি জাগতিক বিষয়ের দিকে লক্ষ করেননি, ইতিহাসে নিজেকে প্রকাশ করেননি, বিশ্বজগতের সৃষ্টি করেননি এবং সময়ের শেষে বিচার করবেন না। প্রকৃতপক্ষে একেশ্বরবাদী ধর্মবিশ্বাসের এক প্রধান থিওফ্যানি ইতিহাসকে দর্শনের তুলনায় নিম্নস্তরের বলে অ্যারিস্টটল নাকচ করে দিয়েছিলেন। কেননা বিশ্বজগৎ অনন্তকাল ধরে ঈশ্বরের নিকট হতে উৎসারিত হচ্ছে; এর কোনও সূচনা, মধ্যস্থল বা শেষ নেই। ফায়সুফরা ইতিহাসের মায়ার ঊর্ধ্বে যেতে চেয়েছে, তারা এর বাইরে পরিবর্তনহীন আদর্শ স্বর্গীয় জগতের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। যুক্তির প্রতি জোর দেওয়া সত্ত্বেও ফালসাফাহ্র এক নিজস্ব বিশ্বাসের তাগিদ ছিল। বিশ্বজগতে যেখানে উদ্দেশ্যপূর্ণ শৃঙ্খলার চেয়ে বিশৃঙ্খলা আর যন্ত্রণাই বেশি উপস্থিত মনে হয়, যেখানে প্রকৃতই যুক্তির নীতিমালা কার্যকর ভাববার জন্যে সাহসের প্রয়োজন ছিল। চারপাশের সার্বক্ষণিক ধ্বংসাত্মক ও তালগোল পাকানো ঘটনাপ্রবাহের মাঝে তাদেরও এক পরম অর্থবোধকতার অনুভূতি গড়ে তুলতে হয়েছিল। ফালসাফাহয় একধরনের আভিজাত্য, বস্তুনিষ্ঠতার সন্ধান ও কালহীন দৃষ্টিভঙ্গি (Vision) ছিল। এক বিশ্বজনীন ধর্ম চেয়েছিল তারা, যা ঈশ্বরের কোনও বিশেষ প্রকাশ দিয়ে সীমাবদ্ধ নয় কিংবা নির্দিষ্ট স্থান বা কালে প্রোথিত নয়; তাদের বিশ্বাস ছিল যুগ যুগ ধরে সকল সাংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ও উন্নত মানের ব্যক্তিদের হাতে উন্নত হয়ে ওঠা আরও অগ্রসর ভাষায় কোরানের প্রত্যাদেশ অনুবাদ করাই তাদের দায়িত্ব। ঈশ্বরকে রহস্য হিসাবে না দেখে ফায়সুফরা বিশ্বাস করত যে তিনিই স্বয়ং যুক্তি।
