আল-আশারি ক্রমাগত আপোসমূলক অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এভাবে তিনি যুক্তি খাড়া করেছেন যে, কোরান ঈশ্বরের চিরন্তন ও অসৃষ্ট বাণী, কিন্তু কালি, কাগজ, আরবী ভাষা, যা দিয়ে পবিত্র বিষয়বস্তু ধারণ করা হয়েছে তা সৃষ্ট। তিনি মুতাযিলিদের স্বাধীন ইচ্ছার মতবাদের সমালোচনা করেছেন, কারণ একমাত্র ঈশ্বরই মানুষের কাজের স্রষ্টা হতে পাবেন; কিন্তু মুক্তি অর্জনে মানুষের কোনও ভূমিকা নেই, ট্র্যাডিশনিস্টদের এই দৃষ্টিভঙ্গিরও বিরোধিতা করেছেন তিনি। তার সমাধান কিছুটা জটিলই ছিল: ঈশ্বর কর্মের স্রষ্টা কিন্তু মানুষকে সেগুলোর সুফল বা কুফল অর্জনের অনুমতি দেন। অবশ্য ইবন হানবালের বিপরীতে আল-আশারি প্রশ্ন তুলতে প্রস্তুত ছিলেন, প্রস্তুত ছিলেন এইসব আধ্যাত্মিক সমস্যা খতিয়ে দেখার জন্যে। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি উপসংহারে পৌঁছান যে, যে রহস্যময় ও অনিবৰ্চনীয় সত্তাকে আমরা ঈশ্বর বলে ডাকি, তাঁকে গোছানো, যুক্তিভিত্তিক কোনও পদ্ধতিতে আবদ্ধ করার চেষ্টা চালানো ঠিক নয়। আল-আশারি মুসলিম ট্র্যাডিশন কালামের (আক্ষরিক অর্থে বাণী’ বা ‘আলোচনা) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সাধারণত ধর্মতত্ত্ব হিসাবে যার অনুবাদ করা হয়ে থাকে। দশম ও একাদশ শতাব্দীতে তাঁর অনুসারীরা কালামের কার্যপদ্ধতির পরিমার্জনা করে তাঁর মতবাদকে উন্নত করে। প্রথম দিকের আশারিরা ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বের আলোচনার জন্যে একটা আধ্যাত্মিক কর্মকাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিল। আশারি মতবাদ বা ধারার সর্ব প্রথম ধর্মতাত্ত্বিক ছিলেন আবু বকর আল-বাকিলানি (মৃ. ১০১৩)। আল-তাওহীদ (একত্ব) শিরোনামের প্রবন্ধে মুতাযিলিদের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেছেন যে, যুক্তি প্রয়োগ করে মানুষ ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারে: প্রকৃতপক্ষে কোরানই দেখিয়েছে যে আব্রাহাম কেমন করে পদ্ধতিগতভাবে প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে করতে চিরন্তন স্রষ্টাকে আবিষ্কার করেছিলেন । কিন্তু আল-বাকিলানি প্রত্যাদেশের সাহায্য ছাড়া আমাদের ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য টানার সাধ্যে আছে বলে মানেননি, কারণ এগুলো স্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং ঈশ্বর কর্তৃক নির্দিষ্ট। আল্লাহ্ ভালো-মন্দের মানবীয় ধারণায় আবদ্ধ নন।
আল-বাকিলানি মুসলিমদের ধর্ম বিশ্বাসের একটা আধ্যাত্মিক যুক্তি আবিষ্কারের লক্ষ্যে অ্যাটোমিজম’ বা ‘অকেশনালিজম’ নামে পরিচিত তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন: আল্লাহ ছাড়া আর কোনও প্রভু, সত্তা বা নিশ্চয়তা নেই। তিনি দাবি করেছিলেন, বিশ্বের প্রতিটি জিনিস ঈশ্বরের সরাসরি মনোযোগের ওপর নির্ভরশীল। গোটা মহাবিশ্বকে অসংখ্য অ্যাটোমে পরিণত করা হয়েছে: স্থান এবং কাল ধারাবাহিক নয়, আর কোনও কিছুরই নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। আথানাসিয়াসের মতোই আল-বাকিলানি সুবিশাল মহাবিশ্বকে চরমভাবে শূন্যে পরিণত করেছিলেন। কেবল ঈশ্বরই বাস্তব; কেবল তিনিই আমাদের অস্তিত্বহীনতা হতে উদ্ধার করতে পারেন। তিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালন করেন; প্রতি মুহূর্তে আপন সৃষ্টির অস্তিত্ব বজায় রাখেন। সৃষ্টির টিকে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করার মতো কোনও প্রকৃতিক আইন নেই। যদিও অপরাপর মুসলিমরা বেশ সাফল্যের সঙ্গে বিজ্ঞানের চর্চায় আত্মনিয়োগ করছিল, কিন্তু আশারিবাদ মৌলিক দিক থেকে প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিরোধী রয়ে যায়, তবে তারপরেও এর ধর্মীয় প্রাসঙ্গিকতা ছিল। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঈশ্বরের উপস্থিতি ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস সাধারণ যুক্তির ওপর নির্ভর করে না বোঝানোর এক আধ্যাত্মিক (metaphsical) প্রয়াস ছিল এটা বাস্তব সত্যের বিবরণের পরিবর্তে শৃঙ্খলা হিসাবে কাজে লাগানো হলে এটা মুসলিমদের কোরানে উল্লিখিত ঈশ্বর সচেতনতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। বিপরীত দিকে, বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য বাদ দেওয়ার মাঝে এবং আবশ্যিকভাবে দুর্ভেদ্য এক ধর্মীয় মনোভাবকে আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করার মাঝেই এর দুর্বলতা নিহিত। এর ফলে একজন মুসলিম যেভাবে ঈশ্বরকে দেখে আর অন্যান্য বস্তুকে যেভাবে বিবেচনা করে, এ দুয়ের মাঝে পার্থক্যের সৃষ্টি হতে পারে। মুতাযিলি ও আশারিবাদী, উভয় দলই ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে সাধারণ যৌক্তিক চিন্তা ভাবনার সঙ্গে ঈশ্বরের ধর্মীয় অনুভূতিকে যুক্ত করতে চেয়েছিল। এটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। মুসলিমরা বোঝার চেষ্টা করছিল যে, আমরা যেভাবে অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করি সেভাবে ঈশ্বরকে নিয়ে আলাপ করা সম্ভব কিনা। আমরা দেখেছি, গ্রিকরা নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নীরবতাই তাদের মতে ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে জুৎসই ধরণ। শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ মুসলিমও একই উপসংহারে পৌঁছাবে।
মুহাম্মদ (স) এবং তাঁর সহচরবৃন্দ আল-বাকিলানির তুলনায় ঢের আদিম সমাজের সদস্য ছিলেন। ইসলামি সাম্রাজ্য সভ্য দুনিয়ায় বিস্তৃত হয়েছে, ফলে মুসলিমরা ঈশ্বর ও জগতকে দেখার বৃদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে আরও উন্নত পদ্ধতির সংস্পর্শে এসেছে। সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে প্রাচীন হিব্রু দর্শনের পূর্ণাপন করেছেন মুহাম্মদ (স) এবং পরবর্তী প্রজন্ম সমূহকেও ক্রিশ্চান চার্চের মোকাবিলা করা কিছু সমস্যা অতিক্রম করতে হয়েছে। কেউ কেউ এমনকি ক্রাইস্টের ওপর দেবত্ব আরোপের খৃস্টিয় মতবাদের বিরুদ্ধে কোরানের অবস্থান সত্ত্বেও অবতারবাদী ধর্মতত্ত্বের শরণাপন্ন হয়েছে। ইসলামি প্রয়াস দেখায় যে, দুজ্ঞেয় অথচ ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা একই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে চায়, একই রকম সমাধানের দিকে ধাবিত করে।
