ঈশ্বর সম্পর্কে কোনও রকম যৌক্তিক আলোচনার সমর্থনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ইবন হানবাল। এভাবে মধ্যপন্থী মুতাযিলি আল-হুঁয়াঈয়ান আল কারাবিসি (মৃ. ৮৫৯) যখন আপোসফার প্রস্তাব রাখলেন যে, ঈশ্বরের বাণী হিসাবে কোরান অসৃষ্ট, কিন্তু যখন তা মানবীয় ভাষায় প্রকাশ করা হয় তখন তা সৃষ্টিতে পরিণত হয়, ইবন হানবাল এই মতবাদের তীব্র নিন্দা জানান। আল কারাবিসি তাঁর মতবাদ আবার বদলাতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি ঘোষণা দেন যে, কোরানের লিখিত ও উচ্চারিত আরবী যতক্ষণ ঈশ্বরের চিরকালীন বক্তব্যের ধারক ততক্ষণ অসৃষ্ট। কিন্তু ইবন হানবাল একেও অবৈধ ঘোষণা করেন, কেননা এরকম যুক্তিভিত্তিক উপায়ে কোরানের উৎস সম্পর্কে আঁচ-অনুমান করা অর্থহীন। অব্যক্ত ঈশ্বরকে জানতে যুক্তি লাগসই উপায় নয়। তিনি মুতাযিলিদের বিরুদ্ধে ঈশ্বরকে সব রকম রহস্যহীন করে ধর্মীয় মূল্যহীন এক বিমূর্ত ফরমুলায় পরিণত করার অভিযোগ আনেন । কোরান পৃথিবীতে ঈশ্বরের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করার সময় যখন বলে যে ঈশ্বর বলেন এবং দেখেন এবং ‘আরশে বসেন’, ইবন হানবাল জোরে দিয়ে বলেন যে, এসবকে আক্ষরিক অর্থেই ব্যাখ্যা করতে হবে, কিন্তু কীভাবে ‘জিজ্ঞেস করা যাবে না’ (বিলা কাঈফ)। তাঁকে বোধ করি চরমপন্থী আথানাসিয়াসের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যিনি অধিকতর যুক্তিবাদী ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অবতারবাদের চরম ব্যাখ্যার ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। ইবন হানবাল ঈশ্বরের অত্যাবশ্যক অনিবৰ্চনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, যা সব ধরণের যুক্তি ও ধারণাগত বিশ্লেষণের অতীত একটা বিষয়।
কিন্তু কোরান তারপরেও ক্রমাগত বুদ্ধিবৃত্তি ও উপলব্ধির গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে। ইবন হানবালের অবস্থান কিছুটা সরলমনা ছিল। বহু মুসলিমই একে বিকৃত ও অস্পষ্টতার দোষে আক্রান্ত মনে করেছে। আবু আল-হাসান ইবন ইসমাইল আল-আশারি (৮৭৮-৯১৪) এক আপোসরফার সন্ধান পেয়েছিলেন। মুতাযিল ছিলেন তিনি, কিন্তু পরে এক স্বপ্নে পয়গম্বর কর্তৃক হাদিস পাঠ করার তাগিদ পেয়ে ট্র্যাডিশবাদে যোগ দেন। আল-আশারি এর পর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে চলে গিয়ে অত্যুৎসাহী ট্র্যাডিশনিস্টে পরিণত হন। মুতাযিলিদের ইসলামের কলঙ্ক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন তিনি। আবার স্বপ্নে মুহাম্মাকে (স) দেখেন তিনিঃ এ পর্যায়ে পয়গম্বরকে অসস্তুষ্টই দেখাচ্ছিল, তিনি বলেছিলেন: “আমি তোমাকে যৌক্তিক বিবেচনা বিসর্জন দিতে বলিনি, বরং সত্য হাদিসকে সমর্থন দিতে বলেছি! এরপর থেকে আল-আশারি ইবন হানবালের অজ্ঞাবাদী চেতনাকে সমর্থন করার জন্যে মুতাযিলিদের যৌক্তিক কৌশলের প্রয়োগ ঘটাতে শুরু করেছিলেন । মুতাযিলিদের যেখানে অভিমত ছিল যে, ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ অযৌক্তিক হতেই পারে না, সেখানে আল-আশারি যুক্তি-তর্ক দিয়ে দেখান যে ঈশ্বর আমাদের উপলব্ধির অতীত । মুতাযিলিরা ঈশ্বরকে সামজ্ঞস্যপূর্ণ অথচ বিরস ধারণায় নামিয়ে আনার বিপদের মাঝে ছিল; আল-আশারি কোরানের পরিপূর্ণ ঈশ্বরের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চেয়েছেন, এর অসামঞ্জস্যতা সত্ত্বেও। প্রকৃতই, ডেনিস দ্য আরোপাগাইতের মতো তার বিশ্বাস ছিল প্যারাডক্স ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি বাড়াবে। আর পাঁচটা মানবীয় ধারণার মতো ঈশ্বর সংক্রান্ত ধারণাও আলোচিত বা বিশেষিত হতে পারে, ঈশ্বরকে এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিরোধী ছিলেন তিনি। জ্ঞান, ক্ষমতা, জীবন, ইত্যাদি স্বর্গীয় গুণাবলী বাস্তব, অনন্তকাল হতে এগুলো ঈশ্বরের অধিকারে ছিল। কিন্তু এসব ঈশ্বরের সত্তা হতে আলাদা, কারণ ঈশ্বর অত্যাবশ্যকীয়ভাবে একজন, অদ্বিতীয় এবং সহজ। তিনি স্বয়ং সারল্য বলে তাঁকে জটিল কোনও সত্তা হিসাবে বিচেনা করা চলবে না। আমরা তার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সংজ্ঞা দিয়ে বা তাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিশ্লেষণ করতে পারি না। আল-আশারি এই প্যারাডক্স দূর করার কোনও প্রয়াস পেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এভাবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, কোরান যখন বলে যে ঈশ্বর আরশে বসেন, আমাদেরকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে এটা সত্যি, যদিও এটা বসার খাঁটি চেতনা উপলব্ধি করার বোধের অতীত।
আল-আশারি আরোপিত অসচ্ছতা ও চরম যুক্তিবাদের মাঝামাঝি একটা পথ খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। কোনও কোনও অক্ষরবাদী দাবি করেছে যে, কোরানের বক্তব্য অনুযায়ী আশীর্বাদপ্রাপ্তরা যদি স্বর্গে ঈশ্বরকে দেখার সুযোগ পায়, সেক্ষেত্রে তার বাস্তব কাঠামো অবশ্যই আছে। হিশাম ইবন হাকিম এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে:
আল্লাহর দেহ আছে, স্পষ্ট, প্রশস্ত, উঁচু ও দীর্ঘ, সমান মাত্রার, আলোয় উজ্জ্বল, এর ত্রিমাত্রায় বিপুল আকারের, স্থানের অতীত অবস্থানে, খাঁটি ধাতুর দণ্ডের মতো, গোলাকার কোনও রত্নের মতো উজ্জ্বল, রঙ, স্বাদ, গন্ধ এবং স্পর্শসহ।[৩৯]
শিয়াদের কেউ কেউ এই মত গ্রহণ করেছে, কারণ তারা বিশ্বাস করে, ইমামরা ঈশ্বরের অবতার ছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, মুতাযিলিরা জোর দিয়ে বলেছে, কোরান যখন ঈশ্বরের হাতের কথা বলে, একে অবশ্যই তাঁর মহানুভবতা ও বদান্যতার রূপক হিসাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। আল-আশারি অক্ষরবাদীদের বিরোধিতা করে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, কোরান অনুযায়ী আমরা প্রতীকী ভাষায়ই কেবল ঈশ্বর সম্পর্কে কথা বলতে পারি। তবে তিনি ট্র্যাডিশনিস্টদের পাইকারী যুক্তি বিসর্জন দেওয়ারও বিরোধিতার করেছেন । তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, মুহাম্মদ (স) এসব সমস্যার মোকাবিলা করেননি, তা না হলে তিনি মুসলিমদের দিক নির্দেশনা দিয়ে যেতেন; এখন সকল মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে ঈশ্বরের প্রকৃত ধর্মীয় ধারণা বজায় রাখার জন্যে এ ধরনের ব্যাখ্যামূলক উপায়গুলোকে উপমা (কিয়াস) হিসাবে ব্যবহার করা।
