রাজনৈতিক প্রশ্ন মানুষের জীবন ধারায় ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে এক ধর্মতত্ত্বীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। উমাঈয়াদের সমর্থকরা প্রায় কপটতার সঙ্গে দাবি করেছিল যে, তাদের অনৈসলামিক আচরণের জন্যে তারা দায়ী নয়, কেননা ঈশ্বরই এভাবে তাদের নিয়তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ঈশ্বরের পরম শক্তি ও সর্বজ্ঞতার ব্যাপারে কোরানে জোরাল ধারণা রয়েছে; পূর্বনির্ধারিত এই নিয়তির সমর্থনে বহু টেক্সট খাড়া করা যেতে পারে। কিন্তু কোরান আবার সমানভাবে মানুষের দায়িত্ব সম্পর্কেও জোর দেয়: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনও জাতির অবস্থার পরিবর্তন ঘটান না যতক্ষণ না সে-জাতি নিজেদের অন্তরে পরিবর্তন ঘটায়। পরিণতিতে শাসকগোষ্ঠীর সমালোচকরা স্বাধীন ইচ্ছা ও নৈতিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। মুতাযিলিরা মধ্যপন্থা গ্রহণ। (ইতাহু-আলাদা থাকা) করে চরম অবস্থান হতে নিজেদের সরিয়ে নেয় । মানুষের নৈতিক চরিত্র রক্ষার জন্যেই স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল তারা । যেসব মুসলিম ঈশ্বরকে ন্যায়-অন্যায়ের মানবীয় ধারণার ঊর্ধ্বে বলে বিশ্বাস করে, তারা তার ন্যায়বিচারের বিরোধিতা করেছে। যে ঈশ্বর কেবল ঈশ্বর হবার কারণে সকল সুনীতির লঙ্ঘন করে পার পেয়ে যান, তিনি আসলে দানব; স্বৈরাচারী খলিফার চেয়ে ভালো কিছু নন। শিয়াহুদের মতো মুতাযিলিরা ঘোষণা করেছিল যে, ন্যায়-বিচার ঈশ্বরের মূলসত্তা। তিনি কারও প্রতি অন্যায় করতে পারেন না; যুক্তি বিরোধী কোনও কিছুর নির্দেশ দিতেও পারেন না।
এখানেই ট্র্যাডিশনিস্টদের সঙ্গে তাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। ট্র্যাডিশনিস্টরা যুক্তি উপস্থাপন করে যে, মানুষকে আপন ভাগ্যের স্রষ্টা এবং নিয়ন্তা বানিয়ে তারা ঈশ্বরের সর্বময় ক্ষমতার অসম্মান করছে। তারা অভিযোগ তোলে, মুতাযিলিরা ঈশ্বরকে খুব বেশি যৌক্তিক ও বেশি রকম মানুষের মতো করে ফেলেছে। ঈশ্বরের অত্যাবশ্যকীয় দুর্বোধ্যতার ওপর জোর দেওয়ার জন্যেই পূর্বনির্ধারিত নিয়তির মতবাদ গ্রহণ করেছিল তারা: আমরা তাঁকে বোঝার দাবি করলে তিনি আর ঈশ্বর থাকবেন না, মানুষের তুচ্ছ কল্পনায় পরিণত হবেন। ঈশ্বর ভলো খারাপের মানবীয় ধ্যান-ধারণার ঊর্ধ্বে; তাকে আমাদের মান ও প্রত্যাশায় বন্দি করা যাবে নাঃ ঈশ্বরের নির্ধারিত বলেই কোনও কাজ ভালো বা খারাপ, স্বয়ং ঈশ্বরকে বাধ্য করার মতো এসব মানবীয় মূল্যবোধের দুয়ে মাত্রা আছে বলে নয়। মুতাযিলিদের পক্ষে একথা বলা ভুল ছিল যে পুরোপুরি মানবীয় আদর্শ ন্যায়-বিচারের ধারণা ঈশ্বরের মূল সত্তা। পূর্ব নির্ধারিত নিয়তি ও স্বাধীন ইচ্ছার সমস্যা, যা ক্রিশ্চানদেরও ভুগিয়েছে, ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণার একটা কেন্দ্রীয় সমস্যার দিকে অঙুলি নির্দেশ করে। ব্রহ্মার মতো একজন নৈর্ব্যক্তিক ঈশ্বর ‘ভালো’ বা ‘খারাপে’র ঊর্ধ্বে অবস্থান করছেন, এটা অনায়াসে বলা যায়, যেগুলোকে দুয়ে ঈশ্বরের মুখোশ হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু যে ঈশ্বর কোনও রহস্যময় উপায়ে একজন ব্যক্তি, যিনি মানুষের ইতিহাসে অংশ নেন, নিজেকে সমালোচনার পাত্রে পরিণত করেন তিনি। এই ‘ঈশ্বরকে জীবনের-চেয়ে-বৃহৎ স্বৈরাচারী বা বিচারক বানানো অত্যন্ত সহজ ও তাঁকে দিয়ে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করানো যায়। ঈশ্বরকে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী রিপাবলিকান বা সমাজতন্ত্রী, কিংবা বর্ণবাদী বা বিপ্লবী রূপ দিতে পারি। এই বিপদ অনেককে ব্যক্তিক ঈশ্বরকে ধর্মবিরোধী ধারণা হিসাবে দেখতে প্ররোচিত করেছে, কারণ এটা আমাদেরকে আমাদের সংস্কারে প্রোথিত করে ও আমাদের মানবীয় ধারণাকে পরম পর্যায়ে উন্নীত করে।
এই বিপদ এড়াতেই ট্র্যাডিশনিস্টরা ইহুদি ও ক্রিশ্চানদের ব্যবহৃত কালোত্তীর্ণ ঈশ্বরের সত্তা ও তাঁর কর্মকাণ্ডের মাঝে পার্থক্যের অবতারণা করেছে। তারা দাবি করে যে, যেসব গুণাবলী দুয়ে ঈশ্বরকে পার্থিব জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে সক্ষম করে তোলে-যেমন, ক্ষমতা, জ্ঞান, ইচ্ছা, শ্রবণ, দর্শন, বক্তব্য-কোরানে যেসব গুণ আল্লাহর বলে উল্লেখ আছে–যেগুলো অসৃষ্ট কোরানের মতোই অনন্ত কাল ধরে ঈশ্বরের সঙ্গে অবস্থান করছে। এগুলো সব সময় আমাদের বোধগম্যতার অতীত রয়ে যাবে, যা ঈশ্বরের জ্ঞানাতীত সত্তার চেয়ে ভিন্ন। ঠিক ইহুদিরা যেমন ঈশ্বরের প্রজ্ঞা বা তোরাহ্ কালের সূচনার আগে থেকেই ঈশ্বরের সঙ্গে ছিল বলে কল্পনা করেছে, এবার মুসলিমরাও একইভাবে ঈশ্বরের ব্যক্তিত্ব সংক্রান্ত ধারণা গড়ে তুলতে শুরু করছিল এবং বোঝাতে চেয়েছে যে তাঁকে মানব মনে পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। খলিফা আল মামুন (৮১৩-৮৩২) যদি মুতাযিলিদের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের ধারণাকেই মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় মতবাদ ঘোষণার প্রয়াস না পেতেন, এই দুর্বোধ্য যুক্তি হয়তো বা মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোককেই প্রভাবিত করতে পারত। কিন্তু খলিফা মুতাযিলিদের বিশ্বাসকে চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ট্রাডিশনিস্টদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন শুরু করলে সাধারণ মুসলিম জনগণ এই অনৈসলামিক আচরণে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। আহমাদ ইবন হানবাল (৭৮০-৮৫৫) নামে এক নেতৃস্থানীয় ট্র্যাডিশনিস্ট আল-মামুনের ইনকুইজিশন থেকে অল্পের জন্যে রেহাই পেয়ে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর ধর্মপরায়ণতা ও ক্যারিশমা-নিপীড়কদের জন্যে প্রার্থনা করেছেন তিনি-খেলাফতকে চ্যালেঞ্জ করে ও অসৃষ্ট কোরান সংক্রান্ত তাঁর বিশ্বাস মুতাযিলিদের যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা হয়ে দাঁড়ায় ।
