সুতরাং ইসলামের ইতিহাসের প্রাথমিক বছরগুলোয় ঈশ্বরের প্রকৃতি সম্পর্কে মুসলিমদের চিন্তা বা অনুমান প্রায়শঃই খেলাফতের অবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা সংক্রান্ত রাজনৈতিক উদ্বেগ হতে উদ্ভূত ছিল । খৃস্টধর্মে জেসাসের ব্যক্তিত্ব ও প্রকৃতি সম্পর্কিত বিতর্কের মতোই উম্মাহর নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি কে হবেন এবং তাঁর চরিত্র কেমন হওয়া উচিত, এ সম্পর্কিত জ্ঞানগর্ভ বিতর্ক ইসলামে একই রকম গঠনমূলক বলে প্রতিভাত হয়েছে। রাশিদুন (প্রথম চার ‘সঠিক পথে পরিচালিত’ খলিফা)-এর পর্যায় অতিক্রান্ত হওয়ার পর মুসলিমরা আবিষ্কার করে যে তারা মদীনার যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ক্ষুদ্র সমাজের বদলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে বাস করছে। এক সম্প্রসারমান সাম্রাজ্যের অধিকর্তা তারা; নেতারা যেন ইহজাগতিকতা ও প্রলোভনে তাড়িত হচ্ছেন। অভিজাত সমাজে দুর্নীতি ও বিলাসিতা ছড়িয়ে পড়েছিল; দরবারের আচার পয়গম্বর ও তাঁর সহচরদের কৃচ্ছ্বতাপূর্ণ জীবন যাপনের চেয়ে একেবারে ভিন্ন রূপ নিয়েছিল। অধিকতর ধার্মিক মুসলিমরা কোরানের সাম্যবাদের বক্তব্য নিয়ে শাসনযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে ইসলামকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে নেওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। এতে বিভিন্ন সমাধান আর সেক্টের উদ্ভব হয়।
সর্বাধিক জনপ্রিয় সমাধানটি আবিষ্কার করেছিলেন আইনবিদ ও ট্র্যাডিশনিস্টবৃন্দ যারা মৃহাম্মদ (স) ও রাশিদুনদের আদর্শে প্রত্যাবর্তনের প্রয়াস পেয়েছিলেন। এর ফলে তোরাহ্র বিধিমালার অনুরূপ শরীয়াহ্ আইনের উদ্ভব ঘটে। এই আইন কোরান ও পয়গম্বরের জীবন ও বাণীর ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। মুহাম্মদ (স) ও তাঁর প্রথম দিকের সহচরদের বাণী (হাদিস) এবং আচরণ (সুন্নাহ) সম্পর্কিত বিস্ময়কর সংখ্যাক কথ্য বিবরণী প্রচলিত ছিল, অষ্টম ও নবম শতকে বেশকজন সম্পাদক এগুলো সংগ্রহ করেন; এদের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল আল-বুখারি এবং মুসলিম ইবন আল হিজ্জাজ আল-কুশাই। যেহেতু মুহাম্মদ (স) পরিপূর্ণভাবে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ করেছেন বলে বিশ্বাস করা হয়, সুতরাং মুসলিমদের প্রতিদিনের জীবনে তার অনুসরণ করতে হবে। এভাবে কথায়, ভালোবাসায়, খাদ্য গ্রহণে, পরিচ্ছন্নতা ও উপাসনায় ঈশ্বরের প্রতি উন্মুক্ত মুহাম্মদের (স) জীবন অনুকরণ করার মধ্য দিয়ে ইসলামি পবিত্র আইন মুসলিমদের ঈশ্বরের নিকটবর্তী জীবন যাপনে সাহায্য করে থাকে। পয়গম্বরের আদর্শ অনুসরণ করে মুসলিমরা তাঁর মতো ঈশ্বরের নৈকট্য অর্জনের আশা করে। এভাবে একজন মুসলিম যখন সালাম আলাইকুম (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলে অপরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা সুন্নাহ অনুসরণ করে, যেমনটি মুহাম্মদ (স) স্বয়ং করতেন, যখন তারা জীবে দয়া প্রদর্শন করে, বা তাঁর মতো এতিম ও দরিদ্রদের প্রতি করুণা দেখায়, অন্যদের সঙ্গে আচরণে বিশ্বস্ত ও মহৎ হয়, তখন তাদের ঈশ্বরের স্মরণ হয়। বাহ্যিক আচার-আচরণকে শেষ কথা হিসাবে দেখা যাবে না, বরং তা কোরানে বর্ণিত ও স্বয়ং পয়গম্বরের দেখানো তাকওয়া বা ‘ঈশ্বর সচেতনতা অর্জনের উপায়, যাতে ঈশ্বরের সার্বক্ষণিক স্মরণ (জিকির) জড়িত। সুন্নাহ ও হাদিসের বৈধতা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে: কোনও কোনওটাকে অন্যগুলোর চেয়ে অধিকতর বিশ্বস্ত মনে করা হয়। কিন্তু শেষ বিচারে এইসব বিবরণের ঐতিহাসিক সত্যতার চেয়ে এগুলো যে কাজে এসেছে। সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ: শত শত বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের জীবনে এগুলো ঈশ্বরের পবিত্র বোধ জাগাতে সক্ষম হয়েছে।
পয়গম্বরের বাণী বা হাদিস প্রধানত দৈনন্দিন জীবনের বিষয়াবলীর সঙ্গে সম্পর্কিত, তবে অধিবাদ, সৃষ্টিতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বও রয়েছে। এসব বক্তব্যের বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বয়ং ঈশ্বর কর্তৃক সরাসরি মুহাম্মদের (স) কাছে উচ্চারিত বলে বিশ্বাস করা হয়। এসব হাদিস কুদসি (পবিত্র বিবরণ) বিশ্বাসীর মনে ঈশ্বরের অবস্থান ও উপস্থিতির ওপর জোর দেয়: উদাহরণ স্বরূপ, একটি সুবিখ্যাত হাদিস-এ কিছু পর্যায়ের উল্লেখ করা হয়েছে যা দিয়ে একজন মুসলিম ঐশ্বরিক উপস্থিতি অনুভব করতে পারে, যা বিশ্বাসীর মনে মূর্ত হয়েছে বলে মনে হয়। আপনাকে কোরান এবং শরিয়াহর নির্দেশাবলী পালনের মাধ্যমে শুরু করতে হবে, তারপর ধর্মানুরাগের স্বেচ্ছা কর্মকাণ্ডের দিকে অগ্রসর হবেন:
আমার নির্ধারিত দায়িত্ব কর্তব্য পালন করার মাধ্যমে আমার দাস আমার নিকটবর্তী হয়, যা আমার সর্বাধিক পছন্দনীয়। এবং আমার দাস অবশ্য পালনীয় কর্মকাণ্ডের দ্বারা আমার নিকটবর্তী হয়ে আমার ভালোবাসা অর্জন করে: আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, আমি তার কানে পরিণত হই যা দিয়ে সে শোনে, চোখে পরিণত হই, যা দিয়ে সে দেখে, হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং পায়ে পরিণত হই যা দিয়ে সে হাঁটে। [৩৬]
.
ইহুদিবাদ ও খৃস্টধর্মের মতো দুৰ্জেয় ঈশ্বর এই জগতে অনুভূত এক সর্বব্যাপী সত্তা। মুসলিমরা অপর দুটি অপেক্ষাকৃত পুরোনো ধর্মের মতো একই রকম পদ্ধতিতে ঐশ্বরিক উপস্থিতির অনুভূতি গড়ে তুলতে পারে।
মুহাম্মদের (স) জীবনধারা অনুসরণ করে যারা এই ধরনের ধর্মানুরাগ গড়ে তোলে তাদের বলা হয় আহল আল-হাদিস বা ট্র্যাডিশনিস্ট। প্রচণ্ড সাম্যতার নীতির কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এদের একটা আবেদন ছিল; উমাঈয়া ও আব্বাসিয়দের দরবারের বিলাসিতার বিরুদ্ধে ছিল তারা, কিন্তু শিয়াদের বিপ্লবাত্মক কৌশলের পক্ষাবলম্বন করেনি। খলিফার ব্যতিক্রমী আধ্যাত্মিক গুণাবলী প্রয়োজন থাকার কথা তারা বিশ্বাস করত নাঃ খলিফা কেবল একজন প্রশাসক। কিন্তু তারপরেও কোরান ও সুন্নাহর ঐশ্বরিক প্রকৃতির ওপর জোর দিয়ে প্রত্যেক মুসলিমকে অন্তস্থঃভাবে বিদ্রোহী ও চরম ক্ষমতার তীব্র বিরোধী ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের উপায় বাতলে দিয়েছিল তারা। মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করার জন্যে পুরোহিত গোষ্ঠীর কোনও প্রয়োজন স্বীকার করা হয়নি। প্রত্যেক মুসলিম তার নিয়তির জন্যে ঈশ্বরের কাছে দায়ী।
