সর্বোপরি ট্যাডিশনিস্টরা শিক্ষা দিয়েছে যে, কোরান এক চিরন্তন বাস্তবতা, যা তোরাহ বা লোগোসের মতো স্বয়ং ঈশ্বরের সময়ের সূচনার আগেই এর অস্তিত্ব ছিল তার মনে। তাদের কোরানের অসৃষ্ট’র তত্ত্ব বোঝায় যে কোরান আবৃত্তি করার সময় মুসলিমরা সরাসরি অদৃশ্য ঈশ্বরের বাণী শুনতে পায় । কোরান তাদের অন্তস্তলে ঈশ্বরের উপস্থিতি প্রকাশ করে। এর পবিত্র বাণী আবৃত্তি করার সময় তাদের মুখে তাঁর বক্তব্য ধ্বনিত হয়, আর যখন তারা পবিত্র গ্রন্থটি হাতে নেয়, যেন স্বয়ং ঈশ্বরকেই স্পর্শ করে। প্রথম যুগের ক্রিশ্চানরাও ব্যক্তি জেসাস সম্পর্কে একই কথা ভেবেছিল:
যাহা আদি হইতে ছিল,
যাহা আমরা শুনিয়াছি,
যাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছি,
যাহা নিরীক্ষণ করিয়াছি,
এবং স্বহস্তে স্পর্শ করিয়াছি,
জীবনের সেই বাক্যের বিষয়
লিখিতেছি।[৩৭]
জেসাস বা বাণীর প্রকৃত মর্যাদা বা অবস্থানের প্রশ্নটি ক্রিশ্চানদের যথেষ্ট যন্ত্রণা দিয়েছে। এবার মুসলিমদের মাঝে কোরানের প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হবে: আরবী টেক্সট ঠিক কোন অর্থে প্রকৃত ঈশ্বরের বাণী? কোরানের এই মর্যাদা বৃদ্ধিকে কোনও কোনও মুসলিম ব্লাসফেমাস মনে করেছে, যেমনটি জেসাসকে লোগোসের মানব রূপ কল্পনা করায় কোনও কোনও ক্রিশ্চান মর্মপীড়া বোধ করেছিল।
অবশ্য শেষ পর্যন্ত শিয়ারা এমন সব ধারণা গড়ে তোলে যেগুলো খৃস্টিয় অবতারবাদেরই আরও কাছাকাছি। হুসাইনের করুণ মৃত্যুর পর শিয়ারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, কেবল তার বাবা আলি ইবন আবি তালিবের বংশধররাই উম্মাহর নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য। এরা ইসলামেরই এক সুস্পষ্ট আলাদা গোত্রে পরিণত হয়। একাধারে চাচাত ভাই ও মেয়ে-জামাই হিসাবে মুহাম্মদের (স) সঙ্গে আলির রক্তের সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি। যেহেতু মুহাম্মদের (স) কোনও ছেলেই শেষ পর্যন্ত বাঁচেনি, আলি ছিলেন তাঁর নিকটতম পুরুষ আত্মীয়। কোরানে পয়গম্বরদের প্রায়ই বংশধরদের জন্যে প্রার্থনা করতে দেখা যায়। স্বর্গীয় আশীর্বাদের এই ধারণাকে প্রসারিত করে শিয়ারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, আলির পরিবারের মাধ্যমে কেবল মুহাম্মদের (স) পরিবারেরই ঈশ্বরের প্রকৃত জ্ঞান (ইলম) রয়েছে। কেবল তাঁরাই উম্মাহকে ঐশ্বরিক নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন। আলির কোনও বংশধর ক্ষমতাসীন হলে মুসলিমরা আবার ন্যায়বিচারের স্বর্ণযুগের আশা করতে পারবে ও ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী উম্মাহ পরিচালিত হবে।
ব্যক্তি আলির প্রতি ভক্তি বিস্ময়কর প্রাবল্য লাভ করায় কিছু চরমপন্থী শিয়াহ্ গ্রুপ আলি ও তার উত্তরসুরিদের স্বয়ং মুহাম্মদের (স) চেয়েও মর্যাদা সম্পন্ন অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং প্রায় ঐশ্বরিক মর্যাদা দান করবে। তারা প্রাচীন পার্সি মনোনীত দেবতার বংশের পরিবারের ঐতিহ্য অনুসরণ করছিল, যে পরিবার বংশ পরম্পরায় স্বর্গীয় মহিমা বিস্তার করে চলেছে। উমাঈয়া আমলের শেষ দিকে কিছু কিছু শিয়াহ্ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আলির বংশধরদের একটা বিশেষ ধারাতেই নির্ভরযোগ্য ইলম সীমাবদ্ধ। কেবল এই পরিবারেই মুসলিমরা ঈশ্বর মনোনীত উম্মাহর প্রকৃত ইমাম বা নেতার সন্ধান পাবে। তিনি ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, তাঁর পথ-নির্দেশনার কোনও বিকল্প নাই; সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব তার প্রতীক্ষায় থাকা; তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেওয়া। যেহেতু এইসব ইমামকে আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে দেখা হতো, তাই খলিফাঁদের চোখে তারা ছিলেন রাষ্ট্রের শত্রু: শিয়াহ্ ঐতিহ্য অনুসারে বেশ কয়েকজন ইমামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়; কেউ কেউ আত্মগোপনে যেতেও বাধ্য হন। কোনও ইমাম পরলোকগমণের সময় আত্মীয়দের মধ্য হতে একজনকে তার ইলমের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যেতেন। আস্তে আস্তে ইমামগণ ঈশ্বরের অবতার হিসাবে পূজ্য হতে শুরু করলেন: তাঁদের প্রত্যেকে পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের উপস্থিতির প্রমাণ’ (হুজ্জাহ) ছিলেন ও রহস্যময় কোনও উপায়ে মানুষের মাঝে ঈশ্বরকে ধারণ করেছিলেন। তাঁর বাণী, সিদ্ধান্ত ও নির্দেশাবলী আসলে ঈশ্বরেরই বাণী, সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ। ক্রিশ্চানরা যেমন জেসাসকে ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়ার পথ, সত্য এবং আলো হিসাবে দেখেছিল, শিয়ারাও তাদের ইমামদের ঈশ্বরের কাছে যাবার দ্বার (বাব) এবং প্রত্যেক প্রজন্মের জন্যে পথ (সাবিল) এবং দিক নির্দেশনা মনে করে সম্মান দেখায়।
শিয়াদের বিভিন্ন শাখা আলাদা আলাদাভাবে স্বর্গীয় উত্তরাধিকার সন্ধান করেছে। উদাহরণস্বরূপ, টুয়েলভার’ (দ্বাদশবাদী) শিয়ারা হুসাইনের মাধ্যমে আগত ৯৩৯ সালে সর্বশেষ ইমাম আত্মগোপনে গিয়ে মানব সমাজ হতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আলির পরবর্তী বার প্রজন্মকে মর্যাদা দিয়েছে, তাঁর কোনও বংশধর ছিল না বলে এই ধারার পরিসমাপ্তি ঘটে। সেভেনারস (সপ্তবাদী) হিসাবে পরিচিত ইসমায়েলিরা বিশ্বাস করত, এদের মাঝে সপ্তম জনই শেষ ইমাম ছিলেন। দ্বাদশবাদীদের মাঝে এক ধরনের মেসিয়ানিক ধারা দেখা দিয়েছিল, এরা বিশ্বাস করত যে দ্বাদশ বা গোপন ইমাম স্বর্ণযুগের সূচনা করতে আবার ফিরে আসবেন। নিঃসন্দেহে এসব ধারণা বিপজ্জনক ছিল। এগুলো কেবল রাজনৈতিকভাবে দ্রোহমূলকই ছিল না, এগুলোকে খুব সহজেই আনাড়ি, সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তো অধিকতর চরমপন্থী শিয়ারা কোরানের প্রতীকী ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে এক নিগূঢ় ধারা গড়ে তুলেছিল যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে দেখতে পাব । এদের ধর্মানুরাগ অধিকাংশ মুসলিমের পক্ষে দারুণ রকম দুর্বোধ্য ছিল, যারা এই অবতারবাদী ধারণাকে ক্লাসফেমাস মনে করেছে, ফলে শিয়াদের অস্তিত্ব অভিজাত শ্রেণী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝেই বেশি দেখা গেছে। ইরানি বিপ্লবের পর থেকে পশ্চিমে আমরা শিয়া মতবাদকে উৎপত্তিগতভাবে ইসলামের মৌলবাদী অংশ হিসাবে তুলে ধরতে প্ররোচিত হয়েছি, কিন্তু এধরনের সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। শিয়া মতবাদ এক অভিজাত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আসলে, যেসব মুসলিম কোরানের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগতভাবে যৌক্তিক যুক্তিতর্ক প্রয়োগ করতে চেয়েছে শিয়াদের সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে তাদের। মুতাযিলি নামে পরিচিত এই যুক্তিবাদীরা নিজস্ব আলাদা গ্রুপ গড়ে তুলেছিল; সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকারও ছিল তাদের: শিয়াদের মতো মুতাযিলিরাও রাজদরবারের বিলাসিতার বিরুদ্ধে ছিল এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঘনঘন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠত।
