দুর্ভাগ্যজনকভাবে, খৃস্টধর্মের মতো এই ধর্মটিও পুরুষদের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে, তারা এমনভাবে বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা করেছে যা মুসলিম নারীদের পক্ষে নেতিবাচক। কোরান মর্যাদার প্রতীক হিসাবে কেবল মুহাম্মদের (স) স্ত্রীগণের জন্যেই পর্দার পরামর্শ দিয়েছে, সবার জন্যে নয়। অবশ্য সভ্য জগতে ইসলাম স্থান করে নেওয়ার পর মুসলিমরা নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় অবনমিতকারী ওইকুমিনের রেওয়াজ গ্রহণ করে। তারা মহিলাদের অবগুণ্ঠণে আড়াল করার ও পার্সিয়া ও ক্রিশ্চান বাইযান্তিয়ামের হেরেমে আলাদা করে রাখার রীতি গ্রহণ করে। এসব জায়গায় এভাবে নারীদের অবস্থা প্রান্তিক হয়ে গিয়েছিল। আব্বাসিয় খেলাফতের (৭৫০-১২৫৮) সময় নাগাদ মুসলিম নারীদের অবস্থা ইহুদি ও ক্রিশ্চান সমাজে তাদের স্বগোত্রীয়দের মতোই করুণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজ মুসলিম নারীবাদীরা পুরুষদের কোরানের আদি চেতনায় ফিরে যাবার আবেদন জানাচ্ছে।
এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসের মতো ইসলামকেও নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে; এরই পরিণামে এর বিভিন্ন সেক্ট ও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এর প্রথমগুলো-সুন্নী ও শিয়াহ্নর মাঝে বিভক্তি-মুহাম্মদের (স) আকস্মিক মৃত্যুর পর নেতৃত্ব লাভের প্রতিযোগিতা থেকেই আঁচ করা গিয়েছিল। মুহাম্মদের (স) ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর সংখ্যাগরিষ্ঠ দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু কারও কারও মনে হয়েছে মুহাম্মদ (স) হয়তো চাচাত ভাই এবং মেয়েজামাই আলি ইবন আবি তালিবকেই উত্তরাধিকারী বা খলিফা হিসাবে দেখতে চাইতেন। আলি স্বয়ং আবু বকরের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে তাঁকেই প্রথম তিন খলিফা: আবু বকর, উমর ইবন আল-খাত্তাব এবং উসমান ইবন আফফানের নীতিমালায় অসন্তুষ্ট ভিন্ন মতাবলম্বীদের আনুগত্যের কেন্দ্র মনে হয়েছে। অবশেষে ৬৫৬ সালে আলি চতুর্থ খলিফা হন: শিয়ারা পরে তাঁকে উম্মাহর প্রথম ইমাম বা নেতা আখ্যায়িত করবে। নেতৃত্বের প্রশ্নে শিয়াহ্ ও সুন্নীদের বিভক্তি বিশ্বাসের চেয়ে বরং অধিকতর রাজনৈতিক ছিল; এর ফলে মুসলিম ধর্মে ঈশ্বর সম্পর্কিত এর ধারণাসহ রাজনীতির গুরুত্ব ঘোষিত হয়েছে। শিয়াহ-ই-আলি (আলির পক্ষাবলম্বী] সংখ্যালঘু রয়ে যায় ও প্রতিবাদসূচক এক ধর্মানুরাগের সৃষ্টি করে যা মুহাম্মদের (স) দৌহিত্র হুসাইন ইবন আলির করুণ পরিণতিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। হুসাইন উমাইয়া শাসন মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন (যিনি আলির মৃত্যুর পর খেলাফত দখল করেছিলেন) এবং উমাঈয়া খলিফা ইয়াযিদের ক্ষুদ্র একদল সমর্থকের হাতে ৬৮০ সালে আধুনিক ইরাকের কুফার কাছে কারবালা সমতলে নিহত হন। সকল মুসলিমই হুসাইনের হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করে শিহরিত হয়, কিন্তু তিনি শিয়াদেরই বিশেষ নেতায় পরিণত হয়েছেন, কখনও কখনও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে মৃত্যুতে বরণ করে নেওয়া যে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে, এ তারই উদাহরণ। মুসলিমরা আপন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা শুরু করে দিয়েছিল। প্রথম চারজন খলিফা কেবল বাইযান্তাইন ও পার্সিয়া সাম্রাজ্যের আরবদের মাঝে ইসলাম ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন, এ দুটো সাম্রাজ্যই তখন ছিল পতনোখ। কিন্তু উমাঈয়া খলিফাঁদের অধীনে সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা অব্দি অব্যাহত থাকে, যার পেছনে আরব সাম্রাজ্যবাদ যতখানি প্রেরণা হিসাবে ক্রিয়াশীল ছিল, ধর্ম ততটা ছিল না।
নতুন সাম্রাজ্যের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্যে কারও ওপর বল প্রয়োগ করা হয়নি; প্রকৃতপক্ষে, মুহাম্মদের (স) পরলোকগমনের পর প্রায় শত বছর সময় কালে ধর্মান্তরকরণকে উৎসাহিত করতে দেখা যায়নি, ৭০০ সালের দিকে আইন করে এর ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছিল: মুসলিমরা বিশ্বাস করত যে ইহুদিবাদ যেমন জ্যাকবের বংশধরদের জন্যে, ইসলামও তেমনি আরবদের ধর্ম । কিতাবি জাতি বা আহল আল-কিতাব হিসাবে ইহুদি ও ক্রিশ্চানরা জিস্মি বা সংরক্ষিত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ করেছিল। আব্বাসিয় খলিফারা ধর্মান্তরকরণ উৎসাহিত করতে শুরু করলে তাদের সাম্রাজ্যে বহু সেমিটিক ও আর্য নতুন ধর্ম গ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। খৃস্টধর্মে জেসাসের ব্যর্থতা এবং অসম্মানের মতো ইসলামের সাফল্যও গঠনমূলক ছিল। জাগতিক সাফল্যকে অবিশ্বাসকারী খৃস্টধর্মের মতো কোনও মুসলিমের ব্যক্তিগত ধর্মীয় জীবনে রাজনীতি বাহ্যিক কোনও ব্যাপার নয়। মুসলিমরা নিজেদের ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী একটা ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ গঠনে অঙ্গিকারাবদ্ধ মনে করে। উম্মাহর পবিত্র মূল্য রয়েছে, নির্যাতন ও অনাচার অবিচার থেকে মানবতাকে রক্ষার এই প্রয়াসকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভের এক নিদর্শন হিসাবে এর রাজনৈতিক স্বাস্থ্য একজন মুসলিমের আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে ক্রিশ্চানের জীবনে বিশেষ ধর্মতত্ত্বীয় মতামতের (ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, মেথডিস্ট, ব্যাপ্টিস্ট) মতো অবস্থান দখল করে থাকে । ক্রিশ্চানদের চোখে রাজনীতির প্রতি মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি অদ্ভুত ঠেকে থাকলে, তাদের একথা ভাবা উচিত, তাদের দুর্বোধ্য ধর্মতত্ত্বীয় বিতর্কও ইহুদি ও মুসলিমদের কাছে সমান অদ্ভুত মনে হয়।
