অনুকূল পরিস্থিতিতে জীবনে একবার হজ্জ পালন প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য। স্বাভাবিকভাবেই তীর্থযাত্রীরা মুহাম্মদকে (স) স্মরণ করে, কিন্তু এর আচার-অনুষ্ঠানগুলো পয়গম্বরের চেয়ে বরং আব্রাহাম, হ্যাঁগার ও ইশমায়েলের কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যেই বোঝানো হয়েছে। বহিরাগতের চোখে এসব আচার অনুষ্ঠান অদ্ভুত ঠেকে-ভিনদেশী যেকোনও সামাজিক বা ধর্মীয় আচারের মতোই-কিন্তু এগুলো এক প্রবল ধর্মীয় অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে সক্ষম এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ইসলামি আধ্যাত্মিকতার সাম্প্রদায়িক ও ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্যাদি তুলে ধরে। বর্তমানে নির্দিষ্ট সময়ে মক্কায় সমবেত হাজার হাজার তীর্থযাত্রীর অনেকেই আরব নয়, কিন্তু তারা প্রাচীন আরবীয় অনুষ্ঠানগুলোকে আপন করে নিতে পেরেছে। জাতি বা শ্রেণীর সকল ব্যবধান আড়ালকারী ঐতিহ্যবাহী তীর্থযাত্রার পোশাকে যখন তারা কাবাহয় সমবেত হয়, তাদের মনে অনুভূতি জাগে যে তারা দৈনন্দিন জীবনের অহমিকাপূর্ণ ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেয়ে এমন এক গোষ্ঠীর সাথে মিশে গেছে যার লক্ষ্য এক, ভাবনা এক। উপাসনাগৃহের চারপাশে প্রদক্ষিণ শুরুর আগে সমবেত কণ্ঠে চিৎকার করে তারা বলতে থাকে, হে আল্লাহ তোমার সেবায় আমি হাজির।’ এই আনুষ্ঠানিকতার অবিচ্ছেদ্য অর্থ অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন ইরানি দার্শনিক আলি শরিয়তি:
প্রদক্ষিণ করতে করতে আপনি যখন কাবাহর নিকটবর্তী হন, আপনার মনে হবে একটা ক্ষীণ ধারা বিশাল এক নদীর সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। এক স্রোতের ধাক্কায় মাটির সঙ্গে সম্পর্ক হারান আপনি। সহসা বানের জলে ভাসতে থাকেন। কেন্দ্রের কাছে যাবার পর মানুষের ভিড় আপনার ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করে যে নতুন জীবন লাভ করেন আপনি। এখন আপনি জনতার অংশ; এখন একজন মানুষ, জীবিত ও চিরন্তন…কাবাহ এই পৃথিবীর সূর্য যার মুখ আপনাকে এর কক্ষপথে টেনে নিয়ে যায়। আপনি এই বৈশ্বিক ব্যবস্থার অংশে পরিণত হয়ে যান। আল্লাহর চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে গিয়ে অচিরেই নিজেকে বিস্মৃত হবেন আপনি…এমন একটা পদার্থে পরিণত হয়ে গেছেন আপনি যা ক্রমশঃ গলিত এবং অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এটা ভালোবাসার চরম এবং পরম চূড়া। [৩৪]
ইহুদি ও ক্রিশ্চানরা গোষ্ঠীগত আধ্যাত্মিকতার উপরও জোর দিয়েছে। হজ্জ প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিমকে উম্মাহর প্রেক্ষিতে ঈশ্বরকে কেন্দ্রে স্থাপন করে ব্যক্তিগত সংহতির একটা অভিজ্ঞতা দান করে। অধিকাংশ ধর্মের ক্ষেত্রেই শান্তি ও সমতা তীর্থযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; তীর্থযাত্রীরা একবার স্যাঙ্কচুয়্যারিতে পা রাখার পর সব ধরনের সহিংসতা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তীর্থযাত্রীরা একটা কীটও মারতে পারবে না, কর্কশ কণ্ঠে কথা বলবে না। এ কারণেই ১৯৮৭ সালের হজ্জ-এর সময় ইরানের তীর্থযাত্রীরা দাঙ্গা বাধানোর ফলে ৪০২ জন নিহত ও ৬৪৯ জন আহত হলে বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল।
৬৩২ সালের জুন মাসে স্বল্পকালীন অসুস্থতার পর অপ্রত্যাশিতভাবে পরলোকগমণ করেন মুহাম্মদ (স)। তাঁর পরলোকগমনের পর বেদুঈনদের কেউ কেউ উম্মাহর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের প্রয়াস পেয়েছিল, কিন্তু আরবের রাজনৈতিক ঐক্য ছিল অটুট। শেষ পর্যন্ত বিরূপ গোত্রগুলোও এক ঈশ্বরের ধর্ম গ্রহণ করে: মুহাম্মদের (স) বিস্ময়কর সাফল্য আরবদের দেখিয়েছে যে শত শত বছর ধরে তাদের উপকারে আসা পৌত্তলিকতাবাদ আধুনিক বিশ্বে বেকার। আল্লাহর ধর্ম সহমর্মিতার নীতির প্রচলন ঘটিয়েছিল যা ছিল অধিকতর উন্নত ধর্মের বৈশিষ্ট্য: ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি শক্তিশালী সাম্যবাদ ইসলামি আদর্শের বৈশিষ্ট্য হিসাবে অব্যাহত রয়ে যাবে ।
মুহাম্মদ (স) জীবদ্দশায় এখানে নারী-পুরুষের সাম্যও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল । বর্তমানে পাশ্চাত্যে কথায় কথায় ইসলামকে উৎপত্তিগতভাবে নারী বিদ্বেষী ধর্ম হিসাবে তুলে ধরা হয়, কিন্তু খৃস্টধর্মের মতো আল্লাহর ধর্মও আদিতে নারীদের পক্ষে ইতিবাচক ছিল। প্রাক-ইসলামি যুগ জাহিলিয়াহর সময় নারীদের প্রতি আরবদের মনোভাব অ্যাক্সিয়াল যুগ পূর্ববর্তী দৃষ্টিভঙ্গির মতো ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, বহুগামিতা ছিল সাধারণ ব্যাপার, স্ত্রীরা যার যার বাবার বাড়িতে অবস্থান করত। অভিজাত নারীরা বিশেষ ক্ষমতা ও মর্যাদা ভোগ করতেন-যেমন মুহাম্মদের (স) প্রথম স্ত্রী খাদিজা অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী ছিলেন কিন্তু সংখ্যাগুরু নারীদের অবস্থান ছিল দাসদের সমপর্যায়ের; তাদের কোনও রাজনৈতিক বা মানবাধিকার ছিল না; শিশুকন্যা হত্যা ছিল সাধারণ ব্যাপার। মুহাম্মদের (স) প্রথমদিকের দীক্ষিতদের মাঝে নারীরা ছিল, তাদের মুক্তির পরিকল্পনা ছিল তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরান কন্যাশিশু হত্যার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং মেয়ে সন্তান জন্ম নিলে শঙ্কিত হওয়ার কারণে আরবদের ভর্ৎসনা করেছে। কোরান নারীদের উত্তরাধিকার ও তালাকের বৈধ অধিকারও দিয়েছে: ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে পশ্চিমের নারীদের এর তুল্য কিছুই ছিল না । উম্মাহর কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে নারীদের উৎসাহিত করেছেন মুহাম্মদ (স); নারীরাও তাদের মতামত শোনা হবে এই আত্মবিশ্বাস হতে সরাসরি নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছে। উদাহরণ স্বরূপ, একবার মদীনার নারীরা মুহাম্মদের (স) কাছে অভিযোগ জানাল যে, পুরুষরা কোরান পাঠে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে, তারা পুরুষদের নাগাল পেতে মুহাম্মদের (স) সাহায্য চাইল। মুহাম্মদ (স) সাহায্য করলেন। ওদের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, নারীরাও যেখানে ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। সেখানে কোরান কেন কেবল পুরুষদের সম্বোধন করেছে। ফলে নারী-পুরুষ উভয়কে সম্বোধন করে এক প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছিল যাতে উভয় লিঙ্গের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সমতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে কোরান বারবার আলাদাভাবে নারীদের সম্বোধন করেছে, ইহুদি বা ক্রিশ্চান ধর্মগ্রন্থে যার নজীর বিরল।
