ইহুদিদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়াটা সম্ভবত মুহাম্মদের (স) জীবনে সবচেয়ে বড় হতাশাব্যাঞ্জক ঘটনা ছিল; এতে তার ধর্মীয় অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনও কোনও ইহুদি আবার বন্ধুসুলভ ছিল, তারা মুসলিমদের সঙ্গে সম্মানসূচক পদে যোগ দিয়েছিল। বাইবেল নিয়ে মুহাম্মদের (স) আলাপ-আলোচনা করে অন্য ইহুদিদের সমালোচনার জবাব বাতলে দিত তারা; ঐশীগ্রন্থ সম্পর্কে এই জ্ঞান মুহাম্মদকে (স) আপন দর্শন উন্নত করার ক্ষেত্রেও সাহায্য করেছে। প্রথমবারের মতো মুহাম্মদ (স) পয়গম্বরদের সঠিক পর্যায়ক্রম জানতে পারেন, এতদিন পর্যন্ত তাঁর এ সংক্রান্ত ধারণা ছিল অস্পষ্ট। তিনি এবার বুঝতে পারেন যে, মোজেস বা জেসাসের আগেই আব্রাহামের আগমন ঘটা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এর আগে পর্যন্ত মুহাম্মদ (স) সম্ভবত ধরে নিয়েছিলেন যে ইহুদি ও ক্রিশ্চানরা একই ধর্মের অনুসারী, কিন্তু এবার তিনি জানলেন, ওদের পরস্পরের ভেতর মারাত্মক মতদ্বৈততা রয়েছে। আরবদের মতো বহিরাগতদের চোখে দুটো অবস্থার মাঝে তেমন একটা পার্থক্য ধরা পড়েনি; তোরাহ্ ও গস্পেলের অনুসারীরা র্যাবাইগণ কর্তৃক পরিবর্ধিত কথ্য আইন (Oral Law) ও ট্রিনিটির ব্লাসফেমাস মতবাদের মতো ভ্রান্ত বিষয়াদি আব্রাহামের খাঁটি ধর্ম বা হানিফায়াহয় যোগ করেছে ধরে নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। মুহাম্মদ (স) আরও জানতে পারেন, ইহুদিদের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থে তাদের অবিশ্বাসী জাতি আখ্যায়িত করা হয়েছে যারা স্বর্ণ বাছুরের উপাসনা করার জন্যে পৌত্তলিকতায় ফিরে গিয়েছিল। ইহুদিদের বিরুদ্ধে কোরানের যুক্তিগুলো খুবই উন্নত, এতে বোঝা যায় ইহুদিদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় মুসলিমরা নিজেদের কতটা হুমকির মুখে ভেবেছিল, যদিও কোরান তখনও জোরের সঙ্গে বলেছে যে পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশের সকল জাতি’[৩২] ভ্রান্তিতে পড়েনি এবং সব ধর্মই আসলে এক।
মদীনার বন্ধুসুলভ ইহুদিদের কাছে মুহাম্মদ (স) আব্রাহামের জ্যেষ্ঠ পুত্র ইশমায়েলের কাহিনীও জানতে পারেন। বাইবেলের বর্ণনানুসারে উপপত্নী হ্যাঁগারের গর্ভে জন্ম নেওয়া আব্রাহামের এক ছেলে ছিল, কিন্তু সারাহর গর্ভে ইসাক জন্ম নেওয়ার পর তিনি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন এবং হ্যাঁগার ও ইশমাইলকে ত্যাগ করার দাবি তোলেন। আব্রাহামকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে ঈশ্বর তখন তাঁকে ইশমায়েল এক মহান জাতির পিতা বলে গণ্য হবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। আরবীয় ইহুদিরা স্থানীয় কিংবদন্তীও এর সঙ্গে জুড়ে দিয়ে বলেছিল যে, আব্রাহাম মক্কা উপত্যকায় হ্যাঁগার ও ইশমায়েলকে ফেলে যান, এখানে ঈশ্বর স্বয়ং তাদের দায়িত্ব নেন। শিশু ইশমায়েল তৃষ্ণায় ছটফট করার সময় তিনি পবিত্র যমযম কূপ উন্মোচিত করে দেন। পরে আব্রাহাম ইশমায়েলকে দেখতে আসেন; তারপর পিতা-পুত্র মিলে একমাত্র ঈশ্বরের প্রথম মন্দির কাবাহ নির্মাণ করেন। আরবজাতির পিতায় পরিণত হন ইশমায়েল, সুতরাং ইহুদিদের মতো তারাও আব্রাহামের বংশধর। এ কাহিনী নিঃসন্দেহে মধুর শুনিয়েছিল মুহাম্মদের (স) কানে: আরবদের নিজস্ব ঐশীগ্রন্থ উপহার দিচ্ছেন তিনি, এবার আদিপুরুষদের ধর্মানুরাগে তিনি তাদের ধর্মবিশ্বাসকে স্থাপন করতে পারবেন। ৬২৪ সালের জানুয়ারি মাসে যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে মদীনার ইহুদিদের বৈরিতা স্থায়ী, স্বাধীনতার ঘোষণা দিল আল্লাহর নতুন ধর্ম। জেরুজালেমের বদলে মক্কার দিকে মুখ করে প্রার্থনা করার জন্যে মুসলিমদের নির্দেশ দিলেন মুহাম্মদ (স)। প্রার্থনার দিক (কিবলা) পরিবর্তনকে মুহাম্মদের (স) সর্বশ্রেষ্ঠ সৃজনশীল ক্রিয়া হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পুরোনো দুটো প্রত্যাদেশের ওপর অনির্ভরশীল মক্কার দিকে ফিরে প্রার্থনা করার মধ্য দিয়ে মুসলিমরা আভাসে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনও প্রতিষ্ঠিত ধর্মের অংশ নয়, বরং কেবল ঈশ্বরের কাছেই আত্মসমর্পণ করেছে। এক ঈশ্বরের ধর্মকে বিবদমান বিভিন্ন পক্ষে অশোভনভাবে বিভক্তকারী কোনও ক্ষুদ্র গোত্রে যোগ দিচ্ছে না তারা। তার বদলে আব্রাহামের আদি ধর্মে ফিরে যাচ্ছে, যিনি প্রথম মুসলিম ছিলেন এবং তাঁর পবিত্র গৃহ নির্মাণ করেছিলেন:
তাহারা বলে ‘ইয়াহুদি বা খৃস্টান হও, ঠিক পথ পাইবে।’ বল, বরং একনিষ্ঠ হইয়া আমা ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করিব এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তোমরা বল, আমরা আল্লাহতে ইমান রাখি এবং যাহা আমাদের প্রতি ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাহার বংশধরগণের প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা তাহাদের প্রতিপালকে নিকট হইতে মুসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে দেওয়া হইয়াছে। আমরা তাহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁহারই নিকট আত্মসমর্পণকারী। [৩৩]
স্বয়ং ঈশ্বরের চেয়ে সত্যের তুচ্ছ মানবীয় ব্যাখ্যা বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে পৌত্তলিকতা।
মুসলিমরা মুহাম্মদের (স) জন্ম তারিখ বা প্রথম প্রত্যাদেশের দিন থেকে তাদের বছর গণনা করে না-এসবে আসলে নতুনত্ব কিছু ছিল না-বরং হিজরার বছর থেকে (মদীনায় অভিবাসন) কাল গণনা করে থাকে, যখন মুসলিমরা ইসলামকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত করে ইতিহাসে ঐশী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাতে শুরু করেছিল। আমরা দেখেছি, কোরান শিক্ষা দেয় সকল ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির দায়িত্ব হচ্ছে ন্যায়বিচার ও সমতা ভিত্তিক একটা সমাজের জন্যে কাজ করা । প্রকৃতই মুসলিমরা তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব খুব গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। গোড়াতে রাজনৈতিক নেতা হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেননি মুহাম্মদ (স), কিন্তু অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহ আরবদের জন্যে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ঠেলে দিয়েছিল তাঁকে। হিজরা এবং ৬৩২ সালে পরলোকগমনের মধ্যবর্তী দশ বছর সময় কালে মুহাম্মদ (স) এবং প্রথম দিকের মুসলিমরা মদীনার প্রতিপক্ষ ও মক্কার কুরাইশদের বিরুদ্ধে টিকে থাকার তীব্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, এদের সবাই উম্মাহকে নিশ্চিহ্ন করতে প্রস্তুত ছিল। পশ্চিমে মুহাম্মদকে (স) প্রায়শঃই যুদ্ধবাজ ব্যক্তি হিসাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে, যিনি অস্ত্রের জোরে অনিচ্ছুক বিশ্বের উপর ইসলাম চাপিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাণের দায়ে লড়েছেন মুহাম্মদ (স) এবং কোরানে ন্যায়-যুদ্ধের ধর্মতত্ত্ব সৃষ্টি করছিলেন যার সঙ্গে অধিকাংশ ক্রিশ্চান একমত পোষণ করবে; তিনি কখনওই কাউকে তার ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে কোরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ধর্মের ব্যাপারে কোনও জবরদস্তি’ চলবে না। কোরানে যুদ্ধকে নিন্দনীয় বলা হয়েছে, আত্মরক্ষার যুদ্ধই কেবল ন্যায়-যুদ্ধ । কখনও কখনও উন্নত মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থে যুদ্ধ প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যেমন ক্রিশ্চানরা হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রয়োজন বলে বিশ্বাস করেছিল। মুহাম্মদের (স) রাজনৈতিক যোগ্যতা ছিল খুবই উঁচু মানের। মুহাম্মদের জীবনের শেষ প্রান্তে অধিকাংশ আরবীয় গোত্র উম্মাহয় যোগ দিয়েছিল, যদিও মুহাম্মদ (স) ভালো করেই জানতেন যে তাদের ইসলাম হয় নামমাত্র বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহ্যিক । ৬৩০ সালে মক্কা নগরীর দুয়ার মুহাম্মদের (স) জন্যে উন্মুক্ত হয়, বিনা রক্তপাতে তিনি নগরীর দখল লাভ করেন। ৬৩২ সালে পরলোকগমনের অল্পদিন আগে তিনি বিদায় হজ্জ সম্পাদন করেছিলেন, যার মাধ্যমে প্রাচীন আরবীয় পৌত্তলিক অনুষ্ঠান হজ্জের ইসলামিকরণ করে আরবদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় তীর্থ যাত্রাকে তার ধর্মের পঞ্চম স্তম্ভে পরিণত করেন।
