প্রকৃতপক্ষে, ডেনিস ‘ঈশ্বর’ শব্দটি ব্যবহার করারই পক্ষপাতি ছিলেন–এর কারণ সম্ভবত শব্দটি অপর্যাপ্ত ও মানুষ-সদৃশ্য একটা সুর পেয়ে গিয়েছিল। তিনি প্রক্লাসের থিউলজি কথাটি পছন্দ করতেন প্রধানত যা শাস্ত্রীয় ছিল: পৌত্তলিক জগতে থিউলজি ছিল উৎসর্গ ও স্বর্গীয়করণের মাধ্যমে স্বর্গীয় মানা আহরণের উপায় । ঈশ্বর-আলোচনায় ডেনিস এর প্রয়োগ করেছেন, যা সঠিকভাবে উপলব্ধি করা গেলে প্রকাশিত প্রতাঁকে বিজড়িত স্বর্গীয় energeiai ও উন্মুক্ত করতে পারে। তিনি কাপাদোসিয়দের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন যে ঈশ্বরের জন্যে সকল ধারণা ও ভাষাই অপর্যাপ্ত এবং একে অবশ্যই আমাদের জ্ঞানের অতীত এক সত্তার সঠিক বিবরণ হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না। এমনকি খোদ ‘ঈশ্বর’ শব্দটিও ত্রুটিপূর্ণ, কেননা ঈশ্বর ‘ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে,’ ‘সত্তার অতীত এক রহস্য। ক্রিশ্চানদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে ঈশ্বর, নিম্নস্তরের সত্তাসমূহের সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত আরেকটি সত্তা নন। মানুষ বা অন্যান্য জিনিস ঈশ্বরের বিপরীতে এক আলাদা সত্তা বা বিকল্প সত্তা হিসাবে দাঁড়ায় না, যা জানার কোনও বিষয় হতে পারে। অস্তিত্ব আছে এমন জিনিসগুলোর একটি নন ঈশ্বর; তিনি আমাদের অভিজ্ঞতাজাত যেকোনও কিছুর চেয়ে আলাদা। আসলে ঈশ্বরকে বরং কিছু না’ ডাকাই অধিক সঠিক: এমনকি তিনি আমাদের ট্রিনিটি কোনওটাই নন। তিনি যেমন সকল সত্তার ঊর্ধ্বে তেমনি সকল নামেরও ঊর্ধ্বে। তারপরেও আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে একীভূত হওয়ার একটা পদ্ধতি হিসাবে আমাদের অক্ষমতাকে তার কথা বলার জন্যে ব্যবহার করতে পারি, যা আমাদের প্রকৃতির ‘দেবাত্বোরোপণ’ (theosis) ছাড়া আর কিছু নয়। ঈশ্বর ‘পিতা,’ ‘পুত্র’ ও ‘আত্মার মতো তার কোনও কোনও নাম ঐশীগ্রন্থে আমাদের সামনে প্রকাশ করেছেন, কিন্তু এগুলোর উদ্দেশ্য তাঁর সম্পর্কে তথ্য জানানো নয়, বরং নারী ও পুরুষকে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে তাদের তার স্বর্গীয় প্রকৃতির অংশ গ্রহণে সক্ষম করে তোলা।
দ্য ডিভাইন নেমস্ শিরোনামের প্রবন্ধের প্রত্যেক অধ্যায়ে ঈশ্বর প্রকাশিত একটি কেরিগমা সম্পর্কিত সত্য দিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন ডেনিস: তাঁর মহত্ব (goodness), প্রজ্ঞা, পিতৃত্ব, ইত্যাদি। এরপর তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে যদিও ঈশ্বর এসব উপাধি দিয়ে তাঁর একটা কিছুর প্রকাশ ঘটিয়েছেন, কিন্তু তিনি যা প্রকাশ করেছেন সেটা স্বয়ং তিনি নন। আমরা সত্যিই ঈশ্বরকে বুঝতে চাইলে আমাদেরকে অবশ্যই এসব গুণাবলী ও নাম অস্বীকার করতে এগিয়ে যেতে হবে। এভাবে আমাদের অবশ্যই বলতে হবে তিনি ঈশ্বর আবার ‘ঈশ্বর-নন, ‘ভালো’ বলেই আবার যোগ করতে হবে তিনি ‘ভালো-নন বিপরীত এই ধাক্কা, জানা ও অজানা উভয়কেই ধারণকারী একটি প্রক্রিয়া আমাদের পার্থিব ধারণাসমূহের উর্ধ্বে তুলে নেবে, আমরা স্বয়ং আপ্রকাশঅযোগ্য সত্তার কাছে পৌঁছে যাব। এভাবে আমরা একথা বলে শুরু করব যে:
তাঁর সম্পর্কে উপলব্ধি, যুক্তি, জ্ঞান, স্পর্শ, ধারণা, কল্পনা, নাম ও আরও বহু জিনিস রয়েছে। কিন্তু তাঁকে বোঝা যায় না, তাঁর সম্পর্কে কিছু বলা যায় না, তাঁকে নামও দেওয়া যায় না। তিনি বস্তুসমূহের একটি নন।
সুতরাং ঐশীগ্রন্থ পাঠ ঈশ্বর সম্পর্কে সত্য অবগত হবার কোনও প্রক্রিয়া নয় বরং কেরিগমাকে ডগমায় রূপান্তরিত এক বৈপরীত্যপূর্ণ অনুশীলন হওয়া উচিত। এই পদ্ধতি একটি থিউরজি, স্বর্গীয় ক্ষমতা ধারণ যা আমাদের স্বয়ং ঈশ্বরের কাছে আরোহণে সক্ষম করে তোলে এবং, পুঁটিনাস সব সময় যেমন শিক্ষা দিয়ে গেছেন, আমরা স্বর্গীয় হয়ে উঠি । এটা আমাদের চিন্তা বন্ধ করার একটি পদ্ধতি। আমাদেরকে ঈশ্বর সম্পর্কিত সকল ধারণা ত্যাগ করে যেতে হবে। আমরা আমাদের মনের ক্রিয়া থামাতে বলি। এমনকি ঈশ্বরের গুণাবলীর অস্বীকৃতিও পেছনে ফেলে যেতে হবে। তাহলে এবং কেবল তাহলেই আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে পরমানন্দাদায়ক ঐক্য অর্জন করতে পারব।
পরমানন্দের কথা বলতে গিয়ে মনের বিচিত্র অবস্থা কিংবা অস্পষ্ট যোগ অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত সচেতনতার বিকল্প ধরনের কথা বোঝাননি ডেনিস। এটা প্রার্থনা ও থিয়োরিয়ার বিপরীতধর্মী পদ্ধতিতে প্রত্যেক ক্রিশ্চানের আয়ত্ত করার মতো একটা ব্যাপার। এটা আমাদের কথা বন্ধ করবে এবং আমাদের নীরব স্থানে পৌঁছে দেবে। আমরা যখন বুদ্ধির অতীত সেই অন্ধকারে ঝাঁপ দেব, আমরা কেবল ভাষার অভাব দ্বারাই আক্রান্ত হব না, বরং আবিষ্কার করব যে আমরা বাকহারা ও জ্ঞানহীন হয়ে পড়েছি।৫৫ গ্রেগরি অভ নাইসার মতো তিনিও মোজেসের সিনাই পর্বতে আরোহণের কাহিনীকে উপদেশমূলক হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। মোজেস পাহাড়ে ওঠার পর স্বয়ং ঈশ্বরকে দেখতে পাননি, কেবল ঈশ্বর যেখানে ছিলেন সেখানেই উপস্থিত হয়েছিলেন। এক ঘন মেঘের অস্পষ্টতায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন তিনি, কিছুই দেখতে পাননিঃ এভাবে আমরা যেসব দেখতে বা বুঝতে পারি সেগুলো প্রতীকমাত্র (ডেনিস Paradigm শব্দটি ব্যবহার করেছেন) যা সকল চিন্তার অতীত এক সত্তার উপস্থিতি প্রকাশ করে। মোজেস অজ্ঞতার অন্ধকারে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং এর ফলে এমন কিছুর সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছেন যা সকল উপলব্ধিকে ছাড়িয়ে যায়: আমরাও একই রকম আনন্দ লাভ করতে পারব যা। আমাদেরকে আমাদের সত্তার বাইরে নিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে এক করে দেবে।
