ঈশ্বরের ধারণা যেখানে দেহে পরিণত হয়েছে ও আমাদের মানবীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে ক্রিশ্চানদের দেহের প্রতি আরও মর্যাদাশীল হওয়া উচিত ছিল, উল্টো ব্যাপারটি ঘটা অদ্ভুত এক পরিহাস বটে। এই জটিল বিশ্বাস নিয়ে আরও বিতর্ক হয়েছিল। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে আপোলিনারিয়াস নেস্টোরিয়াস ও ইউতিচেস-এর মতো ‘ধর্মদ্রোহীগণ’ কঠিন সব প্রশ্নের উত্থাপন করেছেন। সৃষ্টের ঐশ্বরিকতা কীভাবে তার মানবরূপের সঙ্গে খাপ খেয়েছে? মেরি নিশ্চয়ই ঈশ্বরের মাতা নন, বরং মানুষ জেসাসের মাতা? ঈশ্বর অসহায় ক্রন্দনরত শিশু হন কীভাবে? বরং এটাই বলা কি বেশি সঙ্গত নয় যে তিনি মন্দিরের মতো খৃস্টের বিশেষ অন্তরঙ্গ ছিলেন? স্পষ্ট সামঞ্জস্যহীনতা সত্ত্বেও অর্থডক্সরা তাদের মতবাদ আঁকড়ে ছিল । বিশপ অভ আলেকজান্দ্রিয়া সিরিল আথানাসিয়াসের বিশ্বাস পুনরাবৃত্তি করেন: ঈশ্বর প্রকৃতই আমাদের পঙ্কিল জগতে এত গভীরভাবে নেমে এসেছিলেন যে তাঁকে এমনকি মৃত্যু ও অসহায়ত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে। ঈশ্বর সম্পূর্ণ যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে, কষ্টভোগ বা পরিবর্তনে অক্ষম, এরকম দৃঢ় একটা বিশ্বাসের সঙ্গে এই বিশ্বাস মেলানো কঠিন মনে হয়েছে। প্রধানত স্বর্গীয় আপাথিয়া দিয়ে বৈশিষ্ট্যায়িত গ্রিকদের দূরবর্তী ঈশ্বরকে জেসাস ক্রাইস্টের মাঝে দেহধারণকারী ঈশ্বর হতে একেবারেই আলাদা মনে হয়েছে। অর্থডক্সরা ভেবেছে কষ্ট ভোগকারী অসহায় ঈশ্বরের ধারণাকে প্রবল আক্রমণাত্মক হিসাবে আবিষ্কারকারী ‘ধর্মদ্রোহীরা এর রহস্য ও বিস্ময়ের ঐশীরূপ বিনষ্ট করতে চেয়েছেন। অবতারবাদের বৈপরীত্যকে হেলেনিক ঈশ্বরের প্রতিষেধক মনে হয়-যিনি আমাদের আত্মতুষ্টি দূর করার জন্যে কিছুই করেননি এবং যিনি পুরোপুরি যৌক্তিক ছিলেন।
৫২৯ সালে সম্রাট জাস্তিনিয়ান অ্যাথেন্সে বুদ্ধিবৃত্তিক পৌত্তলিকতাবাদের শেষ ঘাঁটি দর্শনের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ বন্ধ করে দেন: এর শেষ পণ্ডিত ছিলেন প্রটিনাসের বিশেষ অনুরাগী শিষ্য প্রক্লাস (৪১২-৪৮৫)। পৌত্তলিক দর্শন আড়ালে চলে যায় এবং নতুন খৃস্টধর্মের কাছে পরাস্ত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যাহোক, চার বছর পর চারখানা অতিন্দ্রীয়বাদী প্রবন্ধ রচনা প্রকাশিত হয় যেগুলোর রচয়িতা সেইন্ট পলের প্রথম আথেনিয় দীক্ষাপ্রাপ্ত ডেনিস দ্য আরোপাগাইত হিসাবে কথিত। আসলে এগুলো লিখেছিলেন পরিচয় গোপন করে যাওয়া জনৈক ষষ্ঠ শতকীয় গ্রিক ক্রিশ্চান। কিন্তু ছদ্মনামের একটা প্রতীকী ক্ষমতা ছিল, যা মূল লেখকের পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ: ছদ্ম ডেনিস নিওপ্লেটোনিজমের দর্শনকে ব্যাপ্টাইজ করতে সক্ষম এবং গ্রিকদের ঈশ্বরের সঙ্গে বাইবেলের সেমেটিক ঈশ্বরকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন।
ডেনিস কাপাদোসিয় পাদরিদেরও উত্তরাধিকারী ছিলেন। বাসিলের মতো তিনিও কেরিগমা ও ডগমার পার্থক্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। এক চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দুটো ধর্মতত্ত্বীয় ধারা রয়েছে এবং দুটোই অ্যাপসলদের কাছ থেকে প্রাপ্ত। কেরিগমা সম্বলিত গস্পেলসমূহ স্পষ্ট ও সহজবোধ্য এবং ডগমা সম্পর্কিত গস্পেলগুলো অস্পষ্ট ও অতিন্দ্রীয়। অবশ্য দুটোই পরস্পর হতে স্বাধীন, কিন্তু খৃস্টধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটা প্রতীকী ও শিষ্যত্বের কথা বলে, আর অপরটি ‘দার্শনিক ও প্রমাণের ক্ষমতা রাখে’-এবং সব কিছুর মাঝে অনির্বচনীয় বিজড়িত। কেরিগমা এর স্পষ্ট প্রকাশিত সত্য দিয়ে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগায়, কিন্তু ডগমার নীরব বা গুপ্ত ধারা এক রহস্য যা দীক্ষার দাবি করে: ‘এটা দীক্ষার মাধ্যমে আত্মাকে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত ও কার্যকর করে যা কিছু শিক্ষা দেয় না। অ্যারিস্টটলের মতোই একই ভাষায় জোর দিয়ে একথা বলেছেন ডেনিস। এক রকম ধর্মীয় সত্য আছে যা কখনও ভাষা, যুক্তি বা যুক্তিভিত্তিক আলোচনা দিয়ে স্পষ্টভাবে বোঝানো সম্ভব নয়। এর প্রকাশ ঘটে প্রতাঁকের সাহায্যে, সাহিত্যের ভাষা বা ভঙ্গির মাধ্যমে, কিংবা মতবাদ দ্বারা, যেগুলো পবিত্র আড়াল, যা অনির্বচনীয় অর্থকে দৃষ্টির আড়ালে রেখেছে কিন্তু যা আবার চরম রহস্যময় ঈশ্বরকে মানুষের প্রকৃতির সীমাবদ্ধতার সঙ্গে অভিযোজিত করে ও ধারণাগতভাবে না হলেও অন্তত কাল্পনিকভাবে বোধগম্য রূপে বাস্তবতাকে (Reality) প্রকাশ করে।
গুপ্ত বা নিগূঢ় অর্থ কেবল সুবিধাপ্রাপ্ত অভিজাতদের জন্যে নয় বরং সকল ক্রিশ্চানের জন্যে। ডেনিস কেবল সাধু সন্ন্যাসীদের উপযুক্ত কষ্টকর কোনও শৃঙ্খলার পক্ষে কথা বলেননি। সকল বিশ্বাসীর অনুসৃত শাস্ত্রাচার ঈশ্বরকে লাভ করার প্রধান উপায় । তার ধর্মতত্ত্বে এরই প্রাধান্য ছিল। এক শক্ত পর্দার আড়ালে এসব সত্য লুকায়িত থাকার উদ্দেশ্য নারী-পুরুষকে শুভ ইচ্ছা হতে বঞ্চিত করা নয়, বরং সকল ক্রিশ্চানকে অনুমান ও ধারণার বোধ থেকে ঊর্ধ্বে তুলে স্বয়ং ঈশ্বরের অব্যক্ত সত্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। যে বিষয় কাপাদোসিয়দের সকল ধর্মতত্ত্ব অ্যাপোফ্যাটিক হওয়া উচিত, এই দাবি করতে অনুপ্রাণিত করেছিল সেটাই ডেনিসের জন্যে অপ্রকাশযোগ্য ঈশ্বরের কাছে যাবার এক শক্তিশালী পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছিল।
