ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে মিলিত হতে পর্বতশীর্ষে নেমে আসেন বলেই কেবল এটা সম্ভব। এখানেই নিওপ্লেটোনিজম থেকে সরে এসেছেন ডেনিস। নিওপ্লেটোনিজমে ঈশ্বরকে স্থির ও দূরবর্তী মনে করা হয়েছে, যিনি মানবীয় প্রয়াসে কোনও সাড়া দেন না। গ্রিক দার্শনিকগণের ঈশ্বর যেসব অতিন্দ্রীয়বাদী হঠাৎ করে তাঁর সঙ্গে আনন্দময় মিলনে সক্ষম হতো তাদের ব্যাপারে অসচেতন ছিলেন, অথচ বাইবেলের ঈশ্বর মানুষের কাছে আসেন। ঈশ্বরও এক ‘পরমানন্দ লাভ করেন যা তাঁকে নিজেকে ছাড়িয়ে সৃষ্ট সত্তার নাজুক জগতে নিয়ে আসে:
এবং আমাদেরকে সাহস করে অবশ্যই নিশ্চিত করে বলতে হবে (কেননা এটাই সত্যি) যে, বিশ্বজগতের স্রষ্টা স্বয়ং বিশ্বের প্রতি তাঁর চমৎকার ও সুন্দর আকাঙ্ক্ষা হতে…তার সদয় কার্যক্রমের মাধ্যমে আপনার মাঝে হতে বেরিয়ে আসেন সত্তা আছে এমন সব জিনিসের দিকে…এবং এভাবে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর অলৌকিক আসন থেকে নেমে আসেন এক আনন্দময় ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সত্তার অন্তরে বাস করার জন্যে, এক আনন্দময় ক্ষমতায় যা সকল সত্তার উর্ধ্বে এবং যার মাধ্যমে তিনি আবার নিজের মাঝেই রয়ে যান।
.
এক স্বয়ংক্রিয়া প্রক্রিয়ার বদলে উৎসারণ ভালোবাসা প্রকাশের এক আবেগময় ও স্বতঃস্ফূর্ততায় পরিণত হয়েছিল। ডেনিসের অস্বীকৃতি ও স্ববিরোধিতার কৌশলটি আমরা করি এমন কিছু নয়, এটা এমন কিছু যা আমাদের মাঝে ঘটে।
প্রটিনাসের বেলায় ‘পরমানন্দের ব্যাপারটি ছিল খুবই আকস্মিক ব্যাপার জীবনে মাত্র দু-তিনবার এ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তিনি। ডেনিস পরমানন্দকে প্রত্যেক ক্রিশ্চানের সার্বক্ষণিক অবস্থা হিসাবে দেখেছেন। এটাই ঐশীগ্রন্থ বা শাস্ত্রের গুপ্ত বা নিগুঢ় বাণী, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভঙ্গিমায় যার প্রকাশ। এভাবে পুরোহিত যখন প্রার্থনা সভার শুরুতে বেদী ছেড়ে প্রত্যাবর্তনের আগে জমায়েতের ভেতর দিয়ে পানি ছিটিয়ে সাঙ্কচুয়্যারির দিকে এগোন, সেটা কেবল পরিশুদ্ধকরণের একটা আচার থাকে না-যদিও তা একটা আচারও বটে-স্বর্গীয় আনন্দের অনুকরণ করে এটা, যার মাধ্যমে ঈশ্বর তাঁর নির্জনতা ত্যাগ করে সৃষ্ট জীবনের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেন। ডেনিসের ধর্মতত্ত্বকে বোঝার সবেচেয়ে সেরা উপায় সম্ভবত এই যে, ঈশ্বর সম্পর্কে আমরা যতটা নিশ্চয়তা দিতে পারি এবং আমাদের বলার সত্যের সবটুকুই যে প্রতীকী এটা উপলব্ধি করার মাঝে আধ্যাত্মিক নাচ হিসাবে একে বিবেচনা করা। ইহুদিবাদের মতো ডেনিসের ঈশ্বরের দুটো বৈশিষ্ট্য রয়েছে: একটা আমাদের দিকে ফেরানো এবং জগতে নিজেকে প্রকাশ করে; অপরটি ঈশ্বরের দূরবর্তী দিক, যা সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য থেকে যায়। তিনি তাঁর চিরকালীন রহস্যের মাঝে নিজের মধ্যেই রয়ে যান, আবার একই সময় সৃষ্টিতে সম্পূর্ণ মিশে থাকেন। জগতের অতিরিক্ত আরেকটি সত্তা নন তিনি। গ্রিক ধর্মতত্ত্বে ডেনিসের পদ্ধতিটি আদর্শে পরিণত হয়। অবশ্য পশ্চিমের ধর্মবিদরা আলোচনা ও ব্যাখ্যা অব্যাহত রাখবেন। কেউ কেউ কল্পনা করেছে যে যখন তারা ‘ঈশ্বর’ শব্দটি উচ্চারণ করে তখন স্বর্গীয় সত্তাটি মনের ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। কেউ কেউ আবার তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ঈশ্বরের প্রয়োগ করবে-বলবে ঈশ্বর এটা চেয়েছেন, ওটা নিষেধ করেছেন এবং সেটা পরিকল্পনা করেছেন-এক অর্থে যা বিপজ্জনক রকম পৌত্তলিকতাবাদী । কিন্তু গ্রিক অর্থডক্সের ঈশ্বর রহস্যময়ই রয়ে যাবেন ও ট্রিনিটি প্রাচ্যের ক্রিশ্চানদের কাছে তাদের মতবাদ সমূহের বৈশিষ্ট্যেও কথা মনে করিয়ে যাবে । শেষ পর্যন্ত গ্রিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, প্রকৃত ধর্মতত্ত্বকে অবশ্যই ডেনিসের দুটো যোগ্যতা পূরণ করতে হবে: একে একাধারে নীরব এবং স্ববিরোধী (Paradoxical) হতে হবে।
গ্রিক ও লাতিনরাও সৃষ্টের ঐশ্বরিকতা সম্পর্কিত তাৎপর্যপূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছিল। অবতারবাদের গ্রিক ধারণাটিকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন বাইন্তাইন ধর্মতত্ত্বের জনক হিসাবে পরিচিত ম্যাক্সিমাস দ্য কনফেসর (৫৮০-৬৬২)। এর সঙ্গে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বরং বৌদ্ধ আদর্শের অনেক বেশি মিল। ম্যাক্সিমাস বিশ্বাস করতেন যে কেবল ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হলেই মানুষ পূর্ণতা পেতে পারে, ঠিক যেমন বৌদ্ধদের বিশ্বাস ছিল, আলোকপ্রাপ্তিই মানুষের আসল গন্তব্য। এভাবে ঈশ্বর ঐচ্ছিক, মানুষের অবস্থার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া বাহ্যিক অচেনা সত্তা বা বিষয় নন। নারী-পুরুষের অলৌকিকের যোগ্যতা রয়েছে, তা অর্জিত হলেই সে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে। আদমের পাপের মোচন ঘটাতে লোগোস মানবমূর্তি ধরেননি; প্রকৃতপক্ষে আদম পাপ না করলেও অবতারের ব্যাপারটা ঘটত। লোগোসের অনুরূপে নারী-পুরুষের সৃষ্টি করা হয়েছিল, একমাত্র এই মিলটি নিখুঁত হলেই তারা পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে। তার পাহাড়ে জেসাসের মহিমান্বিত মানবরূপ আমাদের কাঙ্খিত মানবীয় অবস্থা দেখিয়েছে। বাণীকে দেহ দান করা হয়েছে যাতে করে গোটা মানবজাতি মানবরূপী ঈশ্বরের কৃপায় ঈশ্বরে পরিণত হতে পারে সম্পূর্ণ দেহ এবং আত্মায়, প্রকৃতি ও পূর্ণ ঈশ্বরে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে, আত্মা এবং দেহে এবং কৃপায়।[৫৭] আলোকন ও বুদ্ধত্বের ক্ষেত্রে যেমন অতিপ্রাকৃত সত্তার হস্ত ক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত হয়নি, বরং মানুষের জন্যে স্বাভাবিক ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, এখানেও দেবতায় পরিণত খৃস্ট আমাদের দেখিয়েছেন। যে ঈশ্বরের কৃপায় আমরা কোন স্তরে উঠতে পারি। ক্রিশ্চানরা বরং সেভাবেই মানব-ঈশ্বর জেসাসকে শ্রদ্ধা জানাতে পারে যেভাবে বৌদ্ধরা আলোকপ্রাপ্ত গৌতমের মূর্তিকে শ্রদ্ধা দেখায়: তিনিই (বুদ্ধ) ছিলেন মহিমান্বিত এবং সম্পূর্ণ মানুষের প্রথম উদাহরণ।
