পশ্চিমা বিশ্বে সেটা ছিল অন্ধকার, ভয়ানক সময়। বিভিন্ন বর্বর গোত্র ইউরোপে অনুপ্রবেশ করে রোমান সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল; পশ্চিমে সভ্যতার পতন অনিবার্যভাবে সেখানে ক্রিশ্চান আধ্যাত্মিকতার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। অগাস্তিনের মহান শিক্ষক আমব্রস এমন এক ধর্মবিশ্বাসের প্রকাশ করেছিলেন যেটা ছিল অত্যাবশ্যকীয়ভাবে আত্মরক্ষামূলক: ইস্ত্ৰেগ্ৰেতাস বা সামগ্রিকতা ছিল এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ। চার্চকে এর মতবাদের অখণ্ডতা রক্ষা করতে হচ্ছিল এবং ভার্জিন মেরির নিষ্পাপ দেহের মতো বর্বরদের মিথ্যা মতবাদ হতে একে মুক্ত রাখতেই হবে (যাদের অনেকেই আরিয়ানিজমে দীক্ষা নিয়েছিল)। অগাস্তিনের পরবর্তী কালের রচনায় এক গভীর দুঃখবোধও রয়েছে। রোমের পতন তাঁর আদি পাপ-এর মতবাদকে প্রভাবিত করেছিল, পরবর্তীকালে যা পশ্চিমা বিশ্বদৃষ্টির রূপ পাবে। অগাস্তিন বিশ্বাস করতেন যে, স্রেফ আদমের পাপের কারণে ঈশ্বর মানুষকে অনন্ত নরক যন্ত্রণায় নিক্ষেপ করেছেন। এই সহজাত অপরাধ যৌন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁর সকল বংশধরদের মাঝে সংক্রমিত হয়েছে, যৌনক্রিয়া আবার, অগাস্তিন যাকে বলেছেন, ‘উদগ্র-লালসায় দুষিত। উদগ্র-লালসা হচ্ছে ঈশ্বরের পরিবর্তে তুচ্ছ প্রাণীর মাঝে আনন্দ সন্ধান; যৌনক্রিয়ার সময় যখন আমাদের যুক্তিবোধ কামনা ও আবেগে পুরোপুরি ভেসে যায়, যখন ঈশ্বর পুরোপুরি বিস্মৃত হন ও প্রাণীকূল নির্লজ্জভাবে পরস্পরকে নিয়ে আনন্দে মগ্ন হয়, তখন প্রবলভাবে এটা অনুভূত হয়। শিহরণের ডামাডোল ও বেসামাল কামনায় যুক্তির এই প্রতীক বা ইমেজের পতন ঘটে। অবৈধ কামনা অস্বস্তি করভাবে বর্বরদের হাতে পশ্চিমে আইন-শৃঙ্খলার যুক্তির উৎস রোমের পতনের মতো। অগাস্তিনের কঠোর মতবাদ এ দুইকে মিলিয়ে এক নিষ্করুণ ঈশ্বরের ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন:
পাপের ফলে (স্বর্গ হতে) বহিষ্কৃত আদম তার উত্তরসুরিকেও মৃত্যু ও নরকবাসের সাজায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়েছেন, যে উত্তরসূরিকে তিনি স্বয়ং পাপের দ্বারা একেবারে শেকড়ে বিনষ্ট করেছেন; সুতরাং (উদগ্র যৌন লালসার মাধ্যমে, যার দ্বারা অবাধ্যতার কারণে তার ওপর এক জুৎসই শাস্তি আরোপ করা হয়েছিল। তাঁর এবং তাঁর সঙ্গীনি হতে-যিনি তাঁর পাপের কারণ এবং শাস্তিভভাগোর সঙ্গীনি হতে-নতুন যে বংশধরই আসুক না কেন আদি পাপের ভার বহন করতে হবে তাঁকে যুগ যুগ ধরে, যার দ্বারা চূড়ান্ত ভাবে বিদ্রোহী দেবদূতদের সঙ্গে সীমাহীন শাস্তির মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত …এটা নিজেই অসংখ্য ভ্রান্তি ও দুঃখের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে থাকবে, সুতরাং, ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, মানুষের হতভাগ্য পিণ্ডটি নিথর পড়েছিল, গড়াগড়ি যাচ্ছিল অশুভের মাঝে; এক ভ্রান্তি থেকে আরেক ভ্রান্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল; যোগ দিয়েছে পাপাচারী একদল দেবদূতের সঙ্গে, সবচেয়ে জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত মাশুল গুনছে।
ইহুদি বা গ্রিক অর্থডক্স ক্রিশ্চানদের কেউই আদমের পতনকে এমন ভয়ানক দৃষ্টিতে দেখেনি; পরবর্তীকালে মুসলিমরাও আদি পাপের এমন কঠোর ধর্মতত্ত্ব গ্রহণ করেনি। পশ্চিমে অনন্য এই মতবাদ অতীতে তারতুলিয়ানের বর্ণিত ঈশ্বরের চেহারা আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে।
অগাস্তিন আমাদের এক কঠিন ঐতিহ্যের উত্তরসূরি করে গেছেন। যে ধর্মটি নারী ও পুরুষকে আপন মানব সত্তাকে বংশপরম্পরায় ত্রুটিপূর্ণ হিসাবে দেখার শিক্ষা দেয়, সেটা তাদেরকে আপন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। সাধারণভাবে যৌনতাকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা ও বিশেষ করে নারীদের অসম্মানে এই বিচ্ছিন্নতা অনেক বেশি স্পষ্ট। যদিও আদিতে খৃস্টধর্ম নারীদের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ছিল, কিন্তু অগাস্তিনের সময়েই এক ধরনের পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতায় আক্রান্ত হয়েছিল এটা। নারীদের প্রতি জেরোমির বিদ্বেষপূর্ণ চিঠিপত্রগুলোকে কখনও কখনও বিকৃতির পরিচায়ক বলে মনে হয়। তাতুলিয়ান নারীদের অশুভ প্রলোভন ও মানব জাতির জন্যে চিরকালীন বিপদ বলে অভিযুক্ত করেছিলেন:
তোমরা কী জান না যে, তোমরা প্রত্যেকেই একেকজন ইভ? বর্তমান যুগে তোমাদের লিঙ্গের ওপরই ঈশ্বরের সাজা বহাল আছে: অপরাধকে প্রয়োজনের তাগিদে থাকতে হবে। তোমরা শয়তানের দরজা; তোমরা সেই নিষিদ্ধ বৃক্ষের উন্মোচক; তোমরা স্বর্গীয় আইনের প্রথম লঙ্ঘনকারী; তোমরাই সেই শয়তান যাকে আক্রমণ করার সাহস পায়নি, তাকে প্রলুব্ধ করেছ। তোমরা ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি মানুষকে হেলাফেলায় ধ্বংস করেছ। তোমাদের সীমালঙ্ঘনের কারণে এমনকি ঈশ্বরের পুত্রকেও মরতে হয়েছিল ৪৪
সায় দিয়েছেন অগাস্তিন; ‘মা হোক বা স্ত্রী হোক, কী এসে যায়, এক বন্ধুকে লিখেছিলেন তিনি, তারপরও এরা প্রলুব্ধকারীই, প্রত্যেক নারীর ভেতর যার অস্তিত্বের ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।৪৫ আসলে ঈশ্বর যে নারী সৃষ্টি করেছেন, এটা নিয়েই বিভ্রান্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন অগাস্তিন, যদি আদমের একজন ভালো সঙ্গী ও কথা বলার মানুষের প্রয়োজন থেকেই থাকে, সেক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী সৃষ্টি না করে বন্ধু হিসাবে দুজন পুরুষের ব্যবস্থা করলেই অনেক ভালো হতো। সন্তান ধারণই নারীর একমাত্র কাজ, যার ফলে যৌন রোগের মতো আদি পাপ পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। যে ধর্মটি মানবজাতির অর্ধাংশকে বাঁকা চোখে দেখে আর অনিচ্ছাকৃত যেকোনও মন, হৃদয় ও দেহের নড়াচড়াকে মনে করে মারাত্মক উগ্র যৌন লালসা, সে ধর্মটি কেবল নারী ও পুরুষকে তাদের অবস্থানচ্যুতই করতে পারে। পশ্চিমা খৃস্টধর্ম কখনওই এই বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের বিন্যাসের প্রতিটি পর্যায়ে ভারসাম্যহীন প্রতিক্রিয়ায় এটা এখনও চোখে পড়ে। পুবের নারীরা যখন এই সময়ে ওইকুমিনের নারীদের বহনকারী হীনম্মন্যতার ভার বহন করছিল, তখন পশ্চিমে তাদের বোনেরা বহন করেছিল ঘৃণা ও পাপময় যৌনতার বাড়তি ছাপ; যে ঘৃণা আর আতঙ্ক তাদের সমাজ বিচ্ছিন্ন করার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।
