আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, সৌন্দর্য যুগপৎ কত পুরোনো আবার একেবারে নতুন, আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। আর দেখ, তুমি ছিলে অন্তরে, আমি ছিলাম বাইরের জগতে আর সেখানে খুঁজেছি তোমাকে, আর আমার অসুন্দর অবস্থায় তোমার সৃষ্ট সুন্দর সব জিনিসের মাঝে ঝাঁপ দিয়েছি। আমার সঙ্গে ছিলে তুমি, কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম না । সুন্দর সব জিনিস আমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, অথচ তোমার মাঝে তাদের অস্তিত্ব না থাকলে তাদের কোনও অস্তিত্বই থাকত না।[৩৩]
সুতরাং ঈশ্বর কোনও বস্তুগত সত্তা বা বাস্তবতা নন, বরং আত্মার জটিল গহ্বরের আধ্যাত্মিক সত্তা। অগাস্তিন কেবল প্লেটো আর প্লাটিনাসের সঙ্গে নয়, বরং নিরীশ্বরবাদী ধর্মের বৌদ্ধ, হিন্দু এবং শামানদের অভিজ্ঞতারও অংশী হয়েছেন। তারপরেও তাঁর উপাস্য কোনও নৈর্ব্যক্তিক ঈশ্বর ছিলেন না, বরং জুদো-ক্রিস্টান ঐতিহ্যের প্রবলভাবে ব্যক্তিক ঈশ্বর । ঈশ্বর মানুষের দুর্বলতার মাঝে স্থান করে নিয়েছেন এবং তার সন্ধানে গেছেন:
আমার বধির অবস্থাকে ছিন্ন করে সজোরে আহ্বান আর চিৎকার করলে তুমি। তুমি ছিলে তীব্র উজ্জ্বল, আমার অন্ধত্বকে দূর করে দিয়েছ। সুবাসিত ছিলে তুমি, আমি শ্বাস গ্রহণ করেছি আর এখন তোমার পেছনে ছুটছি। আমি তোমার স্বাদ গ্রহণ করেছি, অনুভব করেছি আর তোমার জন্যে আমার ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটেনি। আমাকে তুমি স্পর্শ করেছ আর আমি তোমার শান্তির খোঁজ পেতে অগ্নিতে আক্রান্ত হয়েছি।[৩৪]
গ্রিক ধর্মবিদরা সাধারণত তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা ধর্মতত্ত্বীয় রচনায় উল্লেখ করেননি, কিন্তু অগাস্তিনের ধর্মতত্ত্ব তার একান্ত ব্যক্তিগত কাহিনী থেকে জন্ম নিয়েছে।
মনের প্রতি অগাস্তিনের দুর্বলতা তাঁকে পঞ্চম শতকের প্রথম দিকে লিখিত ত্রিত্ববাদের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক প্রবন্ধগুচ্ছ দে ত্রিনিতে (De Trinitate) গড়ে তুলতে প্ররোচিত করেছে। ঈশ্বর যেহেতু নিজ প্রতিমূর্তিতে আমাদের সৃষ্টি করেছেন, সেহেতু আমাদের মনের গভীরে এক ট্রিনিটির অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারা উচিত। গ্রিকরা আদিভৌতিক রহস্যময়তা ও বাহ্যিক পার্থক্য উপভোগ করত। অগাস্তিন সেদিকে না গিয়ে আমাদের অধিকাংশের প্রত্যক্ষ করা সত্যের মূহুর্ত দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। আমরা যখন ‘ঈশ্বরই আলো’ বা ‘ঈশ্বরই সত্য জাতীয় কথা শুনি, তখন আমাদের আধ্যাত্মিক আগ্রহ বেড়ে ওঠা টের পাই এবং মনে করি যে ঈশ্বর আমাদের জীবনের একটা মূল্য ও অর্থ দিতে পারেন। কিন্তু ওই মুহূর্তের আলোকনের পর আমরা আবার আমাদের স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ফিরে আসি, যেখানে আমরা পরিচিত এবং পার্থিব বস্তুতে’[৩৫] মোহান্ধ হয়ে থাকি। আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন, আমাদের পক্ষে আর সেই অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষার মুহূর্তটির নাগাল পাওয়া সম্ভব হয় না। চিন্তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আমাদের কাজে আসবে নাঃ পরিবর্তে আমাদের তিনি সত্য ধরনের বাক্য দিয়ে ‘মন কী বোঝে’ সেটা বুঝতে হবে। কিন্তু যাকে চিনি না সেই সত্তাকে কি ভালোবাসা সম্ভব? অগাস্তিন দেখাতে চেয়েছেন, যেহেতু আমাদের প্রত্যেকের মনে প্লেটোর ইমেজের মতো ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব স্বরূপ এক ট্রিনিটির অস্তিত্ব আছে, তাই আমরা আমাদের আদি রূপের-আদি নকশা–যার ভিত্তিতে আমাদের আকার দেওয়া হয়েছে-আকাক্ষা করি।
মন নিজেকে ভালোবেসেছে, এ দিয়ে যদি শুরু করি, আমরা ট্রিনিটির দেখা পাই না, দেখা মেলে দ্বিত্বের: ভালোবাসা ও মন। কিন্তু মন নিজের সম্পর্কে সজাগ না থাকলে আমরা যাকে আত্মসচেতনতা বলি সেটা সহ-নিজেকে ভালোবাসতে পারবে না। দেকার্তের আভাসে অগাস্তিন যুক্তি দেখিয়েছেন যে, আমাদের নিজেদের সম্পর্কে জ্ঞান অন্য সমস্ত নিশ্চয়তার মূল ভিত্তি। এমনকি সন্দেহের অনুভূতিও আমাদের আত্মসচেতন করে তোলে।
সুতরাং, আত্মার মাঝে তিনটি গুণের বাস: স্মৃতি, উপলব্ধি ও ইচ্ছা; যেগুলো যথাক্রমে জ্ঞান, আত্ম-জ্ঞান ও ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বর্গীয় তিন ব্যক্তির মতো এই মানসিক কর্মকাণ্ডগুলো আবশ্যিকভাবে এক, কারণ এগুলো তিনটি আলাদা মন গঠন করে না, বরং প্রত্যেকে গোটা মনুকে পরিপূর্ণ করে রাখে ও বাকি দুটোকে আবৃত করে: ‘আমার মনে আছে যে, স্মৃতি, উপলব্ধি আর ইচ্ছা আছে আমার, আমি বুঝি যে আমি বুঝি, আমার ইচ্ছা আছে। ও আমি মনে করতে পারি। আমি আমার নিজস্ব ইচ্ছা, উপলব্ধি ও স্মৃতিশক্তিকে পরিচালিত করতে পারি।৩৮ কাপাদোসিয়দের বর্ণিত স্বর্গীয় ট্রিনিটির মতো তিনটি উপাদানের সবগুলোই, সুতরাং, একটি জীবন, একটি মন ও একটি সত্তা তৈরি করে।৩৯
তবে আমাদের মনের কর্মধারা বোঝাটা কেবল প্রথম পদক্ষেপ: আমরা আমাদের মনে যে ট্রিনিটির মুখোমুখি হই, সেটা স্বয়ং ঈশ্বর নন, বরং আমাদের স্রষ্টা ঈশ্বরের একটা চিহ্ন। আথানাসিয়াস ও গ্রেগরি অভ নাইসা উভয়ই মানুষের আত্মায় ঈশ্বরের পরিবর্তনকারী উপস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে আয়নায় প্রতিফলনের তুলনা টেনেছিলেন। একে সঠিকভাবে বোঝার জন্যে আমাদের অবশ্যই স্মরণ করতে হবে যে গ্রিকরা আয়নায় সৃষ্ট প্রতিবিম্বকে বাস্তব বলে বিশ্বাস করত, দর্শকের চোখ থেকে বিচ্ছুরিত আলো বস্তু হতে আসা আলোর সঙ্গে মিলে কাঁচের গায়ে আকৃতির সৃষ্টি করে। অগাস্তিনের বিশ্বাস ছিল, মনের ট্রিনিটিও একটা প্রতিফলন যাতে ঈশ্বরের উপস্থিতি রয়েছে, যা তার দিকে গমন করে। কিন্তু কীভাবে আমরা আয়নায় গভীরভাবে সৃষ্ট প্রতিফলিত ইমেজ পেরিয়ে স্বয়ং ঈশ্বরের কাছে যেতে পারি? কেবল মানবীয় প্রয়াসে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যকার বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব নয়। কেবল ঈশ্বর বাণীর রূপ ধরে আমাদের সঙ্গে মিলিত হতে এসেছিলেন বলেই আমরা আমাদের মাঝে ঈশ্বরের প্রতিরূপ পুনঃস্থাপিত করতে পারি, পাপের দরুণ যা ক্ষতিগ্রস্ত বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। নিজেদের আমরা স্বর্গীয় কর্মকাণ্ডের কাছে মেলে ধরি যা আমাদের তিন রকম শৃঙ্খলার সাহায্য বদলে দেবে, অগাস্তিন যাকে বলছেন বিশ্বাসের ট্রিনিটি: রেতিনিও (আমাদের মনে অবতারের সত্য ধারন), কনতেমপ্লাতিও (সেগুলোর কথা ভাবা) ও দাইলেকতি (সেগুলোর মাঝে আনন্দ লাভ করা)। এভাবে ক্রমশঃ আমাদের মনে ঈশ্বরের উপস্থিতির ধারাবাহিক বোধ জাগানোর ভেতর দিয়ে ট্রিনিটি প্রকাশিত হবে। এই জ্ঞান স্রেফ বুদ্ধিগত তথ্যের সংগ্রহ নয়, বরং এক সৃজনশীল অনুশীলন যা আমাদের সত্তার গভীরতর প্রদেশে এক স্বর্গীয় মাত্রার প্রকাশ ঘটিয়ে আমাদেরকে বদলে দেবে ।
