গ্রিকরা যেখানে ঈশ্বরের একক অপ্রকাশিত সত্তা বিশ্লেষণে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাঁর তিনটি hypotases-কে বিবেচনা করে ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হয়েছিল, যেখানে স্বয়ং অগাস্তিন এবং তার পরবর্তী সময়ের পশ্চিমা ক্রিশ্চানরা স্বর্গীয় একত্ব দিয়ে শুরু করে তারপর এর তিনটি প্রকাশ আলোচনায় অগ্রসর হয়েছেন। অগাস্তিনকে অন্যতম ফাদার অভ দ্য চার্চ হিসাবে গ্রিকরা শ্রদ্ধা করেছে, কিন্তু তাঁর ত্রিত্ববাদী ধর্মতত্ত্বের ব্যাপারে তারা সন্দিহান ছিল, এতে করে ঈশ্বরকে তাদের কাছে বড় বেশি যৌক্তিক ও মানবরূপী মনে হয়েছে। গ্রিকদের মতো অগাস্তিনের মতবাদ বিমূর্ত (metaphysical) ছিল না, বরং তা ছিল মনস্তাত্ত্বিক ও বড় বেশি ব্যক্তিক।
অগাস্তিনকে পশ্চিমা চেতনার জনক বলা যেতে পারে। সেইন্ট পল ছাড়া আর কোনও ধর্মবিদ পশ্চিমে তাঁর মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। প্রাচীনকালের শেষ পর্যায়ের অন্য যেকোনও চিন্তাবিদের চেয়ে তাকে অনেক অন্তরঙ্গভাবে চিনি আমরা, বিশেষ করে তাঁর রচিত ঈশ্বর আবিষ্কারের অসাধারণ এবং আবেগময় বিবরণ কনফেশনস-এর জন্য। জীবনের গোড়া থেকেই একটা ঈশ্বরবাদী ধর্মের সন্ধানে ছিলেন অগাস্তিন। ঈশ্বরকে তিনি মানবজাতির পক্ষে অত্যাবশ্যক হিসাবে দেখেছেন: আমাদের তিনি তার জন্যে সৃষ্টি করেছেন, কনফেশনস-এর শুরুতে ঈশ্বরকে বলেছেন তিনি, এবং তোমার মাঝে স্থান না পাওয়া পর্যন্ত অস্থির থাকবে আমাদের হৃদয়।২৮ কারথেজে বক্তৃতা শিক্ষা দেওয়ার সময় তিনি নসটিকবাদের মেসোপটেমিয় রূপ ম্যানিশেইজম-এর দীক্ষা নেন। কিন্তু এর সৃষ্টিতত্ত্ব তাঁকে সন্তুষ্ট করতে না পারায় পরে তা ত্যাগ করেন। অবতারের ধারণাকে তার কাছে আক্রমণাত্মক মনে হয়েছিল, ঈশ্বরের ধারণার অসম্মান; কিন্তু তিনি ইতালিতে থাকার সময় বিশপ অভ মিলান আব্রস তাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে খৃস্টধর্ম প্লেটো ও প্লাটিনাসের সঙ্গে বেমানান নয়। কিন্তু তারপরেও অগাস্তিন চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়ে দীক্ষা গ্রহণে অনীহ ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন খৃস্টধর্মের ক্ষেত্রে কুমারব্রত গ্রহণ বাধ্যতামূলক এবং এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে ঘৃণার চোখে দেখেছেন: “প্রভু, আমাকে পবিত্রতা দাও, প্রার্থনা করতেন তিনি, কিন্তু এখনই নয়।২৯।
তাঁর চূড়ান্ত পরিবর্তনের ব্যাপারটা ছিল Surm und Drang, অতীত জীবনের সঙ্গে সহিংস সম্পর্কচ্ছেদের পর কষ্টকর পুনর্জন-যা পাশ্চাত্যের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে। একদিন মিলানে তিনি তার বন্ধু অলিপিয়াসের সঙ্গে বাগানে বসে থাকার সময় সংগ্রাম চরম পর্যায়ে উন্নীত হয়ে এক গুপ্ত গভীরতা থেকে গভীর আত্ম-মূল্যায়ন আমার সকল কষ্টকে তুলে এনে ‘আমার হৃদয়ের সামনে হাজির করল’ (শ্লোক ১৮: ১৫)। এতে এক প্রবল ঝড় ও প্রবল অশ্রু বর্ষণ সৃষ্টি হলো। গোঙানির সঙ্গে সব অশ্রু ঝরাতে আমি অলিপিয়াসের পাশ থেকে উঠে পড়লাম (কান্নার জন্যে নিঃসঙ্গতা অনেক বেশি জরুরি মনে হয়েছে) …কোনওমতে একটা ডুমুর গাছের নিচে লুটিয়ে পড়লাম, অশ্রুকে আর বাধা দিরাম না। আমার দুচোখে নদী বইতে শুরু করল, তোমার পছন্দের উৎসর্গ (শ্লোক ৫০: ১৯) এবং যদিও এই ভাষায় নয়, কিন্তু এই অর্থে-আমি বারবার তোমাকে বলেছি, আর কতদিন, হে প্রভু, আর কতদিন এমন তীব্র রাগান্বিত থাকবে?’ (শ্লোক ৬: ৪)
পশ্চিমে ঈশ্বর আমাদের কাছে খুব সহজে ধরা দেননি। অগাস্তিনের বিশ্বাস পরিবর্তনকে মনস্তাত্বিক অ্যাবরিঅ্যাকশন মনে হয়, যার পর নবদীক্ষিতের মাঝে সব আবেগ হারিয়ে ঈশ্বরের বাহুতে ক্লান্ত হয়ে লুটিয়ে পরার অনুভূতি জাগে। মাটিতে লুটিয়ে কান্নার সময় অগাস্তিন অকস্মাৎ কাছের এক বাড়ি থেকে শিশুকণ্ঠে ‘তোলে, লেগে: হাতে নাও, পড়, হাতে নাও, পড়! বাক্যটির পুনরাবৃত্তি শুনতে পান। একে প্রত্যাদেশ ধরে নিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ান অগাস্তিন এবং বিস্মিত অবস্থায় দ্রুত অসুস্থ আলিপিয়াসের কাছে ছুটে গিয়ে তাঁর নিউ টেস্টামেন্টখানা তুলে নেন । রোমানদের উদ্দেশে রাখা সেইন্ট পলের বক্তব্যের পাতা মেলে ধরেন তিনিঃ দাঙ্গা এবং মদ্যপানের অনুষ্ঠানে নয়, যৌনতা ও নোংরামিতে নয়, যুদ্ধ-বিদ্রোহে নয়, বরং প্রভু জেসাস ক্রাইস্টকে গ্রহণ কর এবং দেহ আর এর লালসার জন্যে কোনও ব্যবস্থা রেখো না।’ এক দীর্ঘ সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটল: ‘আমার আর বেশি পড়ার প্রয়োজন বা ইচ্ছা হলো না, স্মৃতিচারণ করেছেন অগাস্তিন, এই বাক্যটির শেষ শব্দটি শেষ হওয়ামাত্রই যেন সকল উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তির এক আলো আমার সারা হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ল। সন্দেহের সকল ছায়া মিলিয়ে গেল।
অবশ্য ঈশ্বর আনন্দেরও উৎস হতে পারেন: কিন্তু এই ধর্মান্তরকরণের অল্পদিন পরেই অগাস্তিন মা মনিকার সঙ্গে তিবার নদীর তীরে অসতিয়ায় এক পরম আনন্দের অনুভূতি লাভ করেন। সপ্তম অধ্যায়ে এ বিষয়টি আরও বিস্তারিত আলোচনা করব আমরা। প্লেটোবাদী হিসাবে অগাস্তিন জানতেন ঈশ্বরকে অন্তরেই পাওয়া যায়। কনফেশনস-এর দশম পর্বে তিনি তাঁর ভাষায়, মেমোরিয়া বা স্মৃতির বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এটা মনে রাখার চেয়ে অনেক জটিল একটি প্রক্রিয়া, মনস্তাত্ত্বিকগণ যাকে বলছেন অবচেতন, তার অনেক কাছাকাছি। অগাস্তিনের কাছে স্মৃতি একসঙ্গে গোটা মন-চেতন ও অবচেতন-এর পরিচায়ক। এর জটিলতা ও বৈচিত্র্য তাঁকে বিস্ময়াভিভূত করেছিল। এটা ছিল এক ভীতি-জাগানো রহস্য, ইমেজ, আমাদের অতীত আর অসংখ্য প্রান্তর, খাদ ও গুহার অস্তিত্বে ভরা এক অপরিমেয় জগৎ। এই গিজগিজে অন্তর জগতেই ঈশ্বরের সন্ধানে অবতরণ করেছিলেন অগাস্তিন, যিনি আপাত স্ববিরোধীভাবে তার অন্তর-বাইরে দুভাবেই ছিলেন। বাহ্যিক জগতের ঈশ্বরের ভেতর এবং বাইরে দুজায়গাতেই ছিলেন। কেবল বাহ্যিক জগতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ খোঁজা অর্থহীন। মনের প্রকৃত জগতেই কেবল তার । সন্ধান মিলতে পারে:
