আমি যখনই একজনের কথা ভাবি, সঙ্গে সঙ্গে তিনজনের মহিমায় আলোকিত হয়ে উঠি; আমি তিনজনকে আলাদা করে নেওয়ামাত্র আবার ফিরে যাই একজনে। যখন কোনও একজনের কথা ভাবি, আমি পরিপূর্ণভাবে তার কথা ভাবি; আমার চোখ পরিপূর্ণ, আমার ভাবনার বৃহৎ অংশ আমাকে ছেড়ে যায়। [২৪]
গ্রিক ও রাশিয়ান অর্থডক্স ক্রিশ্চানরা ট্রিনিটির ধ্যানকে অনুপ্রেরণাদায়ী ধর্মীয় অভিজ্ঞতা হিসাবে আবিষ্কার করে গেছে। অবশ্য বহু পশ্চিমা ক্রিশ্চানের কাছে ট্রিনিটি স্রেফ হতবুদ্ধিকর । এর কারণ হতে পারে, ওরা হয়তো কাপাদোসিয়দের অ্যাখ্যায়িত Kerygmatic গুণাবলী বিবেচনা করেছে, অথচ গ্রিকদের বেলায় এটা ছিল ডগম্যাটিক সত্য যা কেবল অন্তর দিয়ে এবং ধর্মীয় অভিজ্ঞতার
ফলাফল হিসাবে আয়ত্ত করা যায়। অবশ্য যৌক্তিকভাবে এর কোনও অর্থই হয় না। প্রথমদিকে এক সারমনে গ্রেগির অভ নাযিয়ানস ব্যাখ্যা করেছিলেন যে ট্রিনিটির ডগমার দুর্বোধ্যতাই আমাদের ঈশ্বরের পরম রহস্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়; আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে তাঁকে বোঝার আশা করা ঠিক নয়। এটা আমাদের ঈশ্বর সম্পর্কে সহজ সাধারণ বক্তব্য রাখা থেকে বিরত রাখে, যিনি নিজেকে প্রকাশ করার সময় এক অলৌকিক উপায়েই কেবল নিজের প্রকৃতি দেখাতে পারেন। ট্রিনিটি কীভাবে কাজ করে সেটা বুঝতে পারার পথ খুঁজে পাবার সাধ্য আছে বলে ভাবতেও আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন বাসিল, সোজা কথায়: উদাহরণ স্বরূপ, গডহেডের তিনটি hypostases কীভাবে এক এবং একই সঙ্গে সমরূপ ও আলাদা এই ধাঁধার জবাব খোঁজার প্রয়াস পাওয়া অনুচিত। এটা ভাষা, ধারণা ও বিশ্লেষণের মানবীয় ক্ষমতার অতীত।[২৬]
এভাবে ট্রিনিটিকে অবশ্যই আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করা যাবে না; এটা বিমূর্ত কোনও ‘তত্ত্ব নয়, বরং থিয়োবিয়া বা ধ্যানের ফল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পশ্চিমের ক্রিশ্চানরা যখন এই ডগমার কারণে বিব্রত বোধ করে পরিত্যাগ করার প্রয়াস পেয়েছিল, তখন তারা ঈশ্বরকে যুক্তির যুগের (Age of Reason) সঙ্গে যৌক্তিক ও বোধগম্য করতে চেয়েছিল। এটা, যেমন আমরা দেখব, আমাদের ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর তথাকথিত ঈশ্বরের প্রয়াণের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া অন্যতম উপাদান। কাপাদোসিয়রা যেসব কারণে এই কল্পনা-নির্ভর উদাহরণের অবতারণা করেছিলেন তার অন্যতম ছিল ঈশ্বর যেন আরিয়াসদের মতো ধর্মদ্রোহীদের বোধের গ্রিক দর্শনের যৌক্তিক ঈশ্বরের পরিণত না হতে পারেন। আরিয়াসের ধর্মতত্ত্ব একটু বেশি স্পষ্ট ও যৌক্তিক ছিল। ট্রিনিটি ক্রিশ্চানদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে সত্তাকে আমরা ‘ঈশ্বর’ বলি মানব বুদ্ধিতে তার নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। নাইসিয়ায় প্রকাশিত অবতারবাদ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তাতে সরল বহুঈশ্বরবাদীতার সূত্রপাত হতে পারত। মানুষ স্বয়ং ঈশ্বরকে অতি বেশি মানবীয় ভাবতে শুরু করে বসতে পারে: “তিনি ঠিক আমাদের মতো ভাবছেন, কাজ করছেন, পরিকল্পনা করছেন, এমন ভাবনাও শুরু হতে পারত। এরপর ঈশ্বরের ওপর সব ধরণের পূর্বধারণাপ্রসূত মতামত চাপিয়ে দিয়ে সেগুলোকে পরম রূপ দেওয়াটা খুব দূরের ব্যাপার নয়। এই প্রবণতা সংশোধনের প্রয়াস ট্রিনিটি। একে ঈশ্বর সম্পর্কিত সত্য বিবরণ হিসাবে না দেখে বরং কোনও কবিতা বা ধর্মতত্ত্বীয় নাচ হিসাবে দেখা যেতে পারে, তুচ্ছ মরণশীল মানুষ, ঈশ্বর সম্পর্কে যা বিশ্বাস করে আর গ্রহণ করেছে তার মাঝামাঝি কিছু এবং এক নীরব উপলব্ধি যে এমন যেকোনও বক্তব্য বা কেরিগমা কেবল সাময়িক হতে পারে।
“থিয়োরি’ শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রিক ও পশ্চিমাদের পার্থক্য নির্দেশমূলক। প্রাচ্যের খৃস্টধর্মে থিয়োবিয়া সবসময় চিন্তা বোঝায়। পশ্চিমে তা যৌক্তিকভাবে প্রদর্শিত যুক্তিভিত্তিক প্রকল্প বুঝিয়ে থাকে। ঈশ্বর সম্পর্কে কোনও ‘থিয়োরি’ গড়ে তোলা বোঝায় যে তাঁকে চিন্তার মানবীয় ব্যবস্থা বা পদ্ধতিতে ধারণ করা যেতে পারে। নাইসিয়ায় মাত্র তিনজন লাতিন ধর্মবিদ ছিলেন। অধিকাংশ পশ্চিমা ক্রিশ্চান আলোচনার এই মাত্রায় যোগ্য ছিলেন না, তারা কোনও কোনও গ্রিক পরিভাষা বুঝতে না পারায় ট্রিনিটি মতবাদের বেলায় অসুখী বোধ করেছেন। সম্ভবত এটা ভিন্ন বাগধারায় সম্পূর্ণ অনুবাদযোগ্য ছিল না। প্রত্যেক সংস্কৃতিকে ঈশ্বর সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা সৃষ্টি করতে হয় । ট্রিনিটির গ্রিক ব্যাখ্যা পশ্চিমাদের কাছে অচেনা মনে হয়ে থাকলে তাদের নিজস্ব ভাষ্য নিয়ে এগিয়ে আসার প্রয়োজন ছিল।
যে লাতিন ধর্মতাত্ত্বিক লাতিন চার্চের জন্যে ট্রিনিটিকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তাঁর নাম অগাস্তিন। গভীর প্লেটোবাদী ছিলেন তিনি, ছিলেন প্রটিনাসের অনুগত, ফলে পশ্চিমের অনেক সহকর্মীর চেয়ে এই মতবাদের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল তাঁর। তাঁর ব্যাখ্যানুযায়ী, ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপারটা প্রায়শঃই পরিভাষাগত কারণে হয়েছে:
অনির্বচনীয় বিষয়াদি প্রকাশের ক্ষেত্রে যেসব আমরা কোনওভাবে হয়তো প্রকাশ করতে পারি আমাদের অবস্থান থেকে তা কোনও ভাবেই পূর্ণভাবে কিছু প্রকাশ করে না, আমাদের গ্রিক বন্ধুগণ একজন সত্তা এবং তিনটি বস্তুর কথা বলেছেন, কিন্তু লাতিনরা বলেছেন একজন সত্তা বা বস্তু এবং তিন ব্যক্তিত্বের কথা।[২৭]
