শেষ পর্যন্ত আথানাসিয়াস মার্সেলাস ও তার অনুসারীদের বোঝাতে সমর্থ হন যে, তাদের পরস্পরের সঙ্গে যোগ দেওয়া উচিত, কারণ আরিয়ানদের চেয়ে তাঁদের মতের মিল অনেক বেশি। যারা বলেন যে, লোগোস পিতার মতো একই প্রকৃতির ছিল এবং যারা বিশ্বাস করেন যে তিনি প্রকৃতিগত দিক থেকে ঈশ্বরের মতো, তারা আসলে ভ্রাতৃপ্রতীম’, আমরা যা বলি, তারাও সেকথাই বোঝান, আমরা কেবল পরিভাষা নিয়ে বিতর্ক করছি। আরিয়াসের বিরোধিতায় অগ্রাধিকার দিতে হবে, যিনি ঘোষণা করেছেন যে পুত্র ঈশ্বর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও মৌলিকভাবে ভিন্ন প্রকৃতির। বহিরাগত কারও চোখে এসব ধর্মতত্ত্বীয় যুক্তিতর্ককে অনিবার্যভাবে সময়ের অপচয় মনে হবে: কারও পক্ষেই কোনও কিছু স্পষ্টভাবে প্রমাণ করার উপায় ছিল না, ও বিরোধ কেবলই ভাঙনেরই কারণ হয়েছে। অবশ্য অংশগ্রহণকারীদের জন্যে এটা কোনও শুষ্ক বিতর্ক ছিল না, বরং ক্রিশ্চান উপলব্ধির প্রকৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটা ব্যাপার ছিল। আরিয়াস, আথানাসিয়াস এবং মার্সেলাস, এঁদের প্রত্যেকেই উপলব্ধি করেছেন যে জেসাসের সঙ্গে একটা নতুন কিছু পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল । তাঁরা ধারণাগত প্রতাঁকের সাহায্যে এই উপলব্ধিকে নিজেদের এবং অন্যদের কাছে ব্যাখ্যা করার জন্যে প্রকাশ-উপযোগি করে তোলার প্রয়াসে লিপ্ত ছিলেন। ভাষা কেবল প্রতীকায়িত হতে পারে, কারণ যে সত্তাসমূহের দিকে তারা নির্দেশ করেছেন তা ছিল অনির্বচনীয়। অবশ্য দুর্ভাগ্যক্রমে খৃস্টধর্মে এক গোঁড়া অসহিষ্ণুতার অনুপ্রবেশ ঘটছিল, শেষ পর্যন্ত যা সঠিক’ বা অর্থডক্স প্রতীক মেনে নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক করে তুলবে। খৃস্টধর্মের নজীরবিহীন মতবাদ বিষয়ক এই বিকার অনায়াসে মানবীয় প্রতীক ও স্বর্গীয় সত্তার ভেতর ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বিধার জন্ম দিতে পারত। খৃস্টধর্ম আগাগোড়াই একটি স্ববিরোধী ধর্মবিশ্বাস (Paradoxical faith): প্রথম দিকের ক্রিশ্চানদের জোরাল ধর্মীয় অনুভূতি একজন ক্রুশবিদ্ধ মেসায়াহর বেলেঙ্কারীর আদর্শগত আপত্তি বা মতবিরোধ অতিক্রম করেছিল। এবার নাইসিয়াতে একেশ্বরবাদের সঙ্গে স্পষ্ট সামঞ্জস্যহীনতা সত্ত্বেও চার্চ ইনকারনেশন বা অবতারবাদের বৈপরীত্যকে গ্রহণ করে নিয়েছিল।
বিখ্যাত মরুচারী সাধক আথানাসিয়াস তাঁর জীবনীগ্রন্থ লাইফ অভ অ্যান্টনি তে দেখানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন যে, তাঁর নতুন মতবাদ কীভাবে খৃস্টীয় আধ্যাত্মিকতাকে প্রভাবিত করেছে। মনাস্টিসিজম-এর প্রবক্তা হিসাবে পরিচিত অ্যান্টনি মিশরিয় মরুভূমিতে কঠোর কৃচ্ছতার জীবন যাপন করতেন। তা সত্ত্বেও অজ্ঞাত পরিচয় লেখক কর্তৃক সংকলিত প্রাচীন মরু-সাধক বা মঙ্কদের নীতিকথার গ্রন্থ দ্য সেয়িংস অভ দ্য ফাদারস-এ তিনি অত্যন্ত মানবিক এবং সহজে বিচলিত ব্যক্তি হিসাবে অঙ্কিত হয়েছেন যিনি একঘেয়েমিতে ক্লান্ত, মানুষের সমস্যাদি নিয়ে বিচলিত ও উদ্বিগ্ন এবং সংজ্ঞা ও সরাসরি উপদেশ বা পরামর্শ দেন। কিন্তু জীবনীগ্রন্থে আথ্যানাসিয়াস একেবারে ভিন্ন আলোয় নিজেকে উপস্থাপন করেন। উদাহরণ স্বরূপ, তিনি আরিয়ান মতবাদের প্রবল বিরোধীতে রূপান্তরিত হয়েছেন: ইতিমধ্যেই তিনি আসন্ন দেবত্বের আস্বাদ গ্রহণ করেছেন, কেননা এক চমকপ্রদ মাত্রায় তিনি স্বর্গীয় অ্যাপাথিয়ার অংশীদার। উদাহরণ স্বরূপ, তিনি বিশ বছর অশুভ আত্মার সঙ্গে যুদ্ধ চালানোর পর যখন সমাধি থেকে উঠে আসেন, আথানাসিয়াস বলছেন, যে অ্যান্টনির দেহে বয়সের কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। প্রকৃত ক্রিশ্চান ছিলেন তিনি, যার অচঞ্চল এবং নিস্পৃহ বৈশিষ্ট্য তাঁকে আর সবার চেয়ে ভিন্নতা দান করেছে: তার আত্মা ছিল অবিচল, তাই তাঁর বাহ্যিক অভিব্যক্তিও ছিল শান্ত।১৩ নিখুঁতভাবে ক্রাইস্টকে অনুকরণ করেছিলেন তিনিঃ ঠিক লোেগোস যেভাবে দেহ ধারণা করে পাপী পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, অ্যান্টনিও একইভাবে শয়তানের আস্তানায় অবতরণ করেছিলেন । আথানাসিয়াস কখনও ধ্যানের কথা বলেননি, যা কিনা ক্লিমেন্ট বা অরিগেনের মতো ক্রিশ্চান প্লেটোনিস্টদের মতবাদ অনুযায়ী দেবতৃপ্রাপ্তি ও মুক্তির উপায় ছিল। তুচ্ছ মরণশীল মানুষের পক্ষে এভাবে তাদের নিজস্ব স্বাভাবিক শক্তির বলে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে পৌঁছানো সম্ভব বলে বিবেচিত হচ্ছিল না আর। তার বদলে ক্রিশ্চানদের অবশ্যই দেহধারী বাণীর পাপাচারপূর্ণ বস্তুজগতে অবতীর্ণ হওয়াকে অনুকরণ করতে হবে।
কিন্তু তখনও দ্বিধান্বিত ছিল ক্রিশ্চানরা: ঈশ্বর যদি একজনই হয়ে থাকেন, তাহলে লোগোস কীভাবে স্বর্গীয় হতে পারেন? অবশেষে পূর্ব তুরস্কের কাপাদোসিয়ার তিনজন অসাধারণ ধর্মবিদ এমন একটা সমাধানের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এলেন যা ইস্টার্ন অর্থডক্স চার্চকে সন্তুষ্ট করে। এঁরা হলেন বিশপ অভ সিসারিয়া বাসিল (৩২৯-৭৯), তাঁর ছোট ভাই বিশপ অভ নাইসা গ্রেগরি (৩৩৫-৯৫) এবং বন্ধু গ্রেগরি অভ নাথিযান্যাস (৩২৯-৯১)। কাপাদোসিয়ানস হিসাবে আখ্যায়িত এই ব্যক্তিগণ গভীরভাবে আধ্যাত্মিক পুরুষ ছিলেন । অনুমান ও দর্শনে এখন আনন্দ লাভ করলেও তাদের বিশ্বাস ছিল ধর্মীয় অভিজ্ঞতাই ঈশ্বর সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি। গ্রিক দর্শনে প্রশিক্ষিত এঁরা তিনজনেই সত্যের বাস্তব বিষয়াদি এবং এর অধিকতর দুর্বোধ্য দিকগুলোর পার্থক্যের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। আদি গ্রিক যুক্তিবাদীরা এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন: প্লেটো দর্শনের (যা যুক্তি দ্বারা উপস্থাপিত বলে প্রমাণযোগ্য ছিল) সঙ্গে পৌরাণিকভাবে প্রাপ্ত একই মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনের ধরাছোঁয়ার বাইরের শিক্ষার পার্থক্য টেনেছেন। আমরা দেখেছি অ্যারিস্টটলও মানুষ শেখার (Mathein) জন্যে রহস্য ধর্মে আশ্রয় গ্রহণ করে না, বরং একটা কিছুর অভিজ্ঞতা (Pathein) লাভ করতে চায় বলে একই রকম পার্থক্য রেখা টেনেছিলেন। বাসিলও ডগমা ও কেরিগমা-র পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ক্রিশ্চান অর্থে একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। ধর্মের ক্ষেত্রে উভয় ধরণের ক্রিশ্চান শিক্ষাই আবশ্যক। কেরিগমা হচ্ছে ঐশীগ্রন্থ নির্ভর চার্চের গণশিক্ষা; কিন্তু ডগমা বাইবেলিয় সত্যের গভীরতর অর্থ প্রকাশ করে যা কেবল ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ও প্রতীকী রূপেই উপলব্ধি করা সম্ভব। গস্পেল সমূহের সরাসরি বাণীর আড়ালে বা পাশাপাশি পয়গম্বরদের কাছ থেকে ‘রহস্যময়ভাবে’ এক গোপন ও নিগূঢ় ঐহিত্য বিবরণ হস্তান্তরিত হয়েছে: এটা ‘ব্যক্তিগত এবং গোপন শিক্ষা ছিল’,
