দেখেন সকল সৃষ্ট প্রকৃতিকে এর নিজস্ব ধারায় ছেড়ে দেওয়া হলে তা বিপদাপন্ন এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়বে। এটা রোধ এবং বিশ্বজগতকে অস্তিত্ব হীনতায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষার্থে তিনি আপন চিরন্তন লোগোস হতে সকল জিনিস সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।
ঈশ্বরের লোগোসের মাধ্যমে তাঁর নিকটবর্তী হয়েই কেবল মানুষ বিলুপ্তি বিনাশ এড়াতে পারে, কারণ একমাত্র ঈশ্বরই হচ্ছেন নিখুঁত সত্তা। লোগোস স্বয়ং দুর্বল সৃষ্টি হলে তার পক্ষে মানবজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতো না। আমাদেরকে জীবনদানের জন্যে লোগোসকে দেহ দান করা হয়েছিল। তিনি মৃত্যু ও পাপের নশ্বর পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন আমাদেরকে ঈশ্বরের নির্লিপ্ততা ও অমরত্বের ভাগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু লোগোস স্বয়ং নাজুক সৃষ্টি হলে এটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত, যিনি নিজেই আবার শূন্যতায় হারিয়ে যেতে পারতেন। বিশ্বের যিনি স্রষ্টা একমাত্র তার পক্ষেই একে রক্ষা করা সম্ভব এবং তার মানে, দেহধারী লোগোসরূপী ক্রাইস্ট অবশ্যই পিতার মতো একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। আথানাসিয়াস যেমন বলেছেন, আমরা যাতে স্বর্গীয় হয়ে উঠতে পারি সেজন্যেই বাণী মানুষের রূপ নিয়েছিলেন।
২০শে মে, ৩২৫ তারিখে বিশপগণ যখন সংকট দূর করার লক্ষ্যে নাইনিয়াতে সমবেত হয়েছিলেন, খুব অল্প সংখ্যকই ক্রাইস্ট সম্পর্কে আথানাসিয়াসের দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার ছিলেন। বেশির ভাগই আথানাসিয়াস এবং আরিয়াসের মতামতের মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও আথানাসিয়াস আগত প্রতিনিধিদের ওপর নিজস্ব ধর্মতত্ত্ব চাপিয়ে দিতে সক্ষম হন এবং সম্রাটের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কেবল আরিয়াস ও তার দুজন সাহসী সহচর তার ক্রীডে সাক্ষাদানে অস্বীকৃতি জানান। ফলে প্রথমবারের মতো শূন্য হতে সৃষ্টি মতবাদ সরকারী মতবাদে পরিণত হয়, যেখানে ক্রাইস্ট নগণ্য সৃষ্টি বা ঈয়ন নন বলে জোর দেওয়া হয়েছে। স্রষ্টা ও উদ্ধারকারী ছিলেন একই সত্তা।
আমরা একমাত্র ঈশ্বর,
পিতা সর্বশক্তিমানের উপর বিশ্বাস রাখি,
যিনি দৃশ্য অদৃশ্য সকল বস্তুর স্রষ্টা,
এবং বিশ্বাস করি একজন প্রভু ঈশ্বর, পুত্র জেসাস ক্রাইস্টে,
ঈশ্বরের একমাত্র সন্তান,
অর্থাৎ পিতার সত্তা (ousia) থেকে সৃষ্ট,
ঈশ্বর হতে ঈশ্বর,
আলো হতে আলো,
প্রকৃত ঈশ্বর হতে প্রকৃত ঈশ্বর,
জাত, পিতার সঙ্গে
একই বস্তু দ্বারা (homousion) সৃষ্ট নয়,
যার মাধ্যমে সকল বস্তু সৃষ্টি হয়েছে,
যেসব জিনিস স্বর্গে আছে আর
যেসব জিনিস আছে মর্ত্যে,
যিনি আমাদের জন্যে ও আমাদের
মুক্তির জন্যে মানুষের রূপ নিয়েছেন,
কষ্ট সয়েছেন,
তৃতীয় দিবসে আবার পুনরুত্থিত হয়েছেন,
আরোহণ করেছেন স্বর্গে
এবং নেমে আসবেন
জীবিত ও মৃতদের বিচারের জন্যে।
এবং আমরা বিশ্বাস করি পবিত্র আত্মায় ।
কন্সতন্তাইন ধর্মতত্ত্বীয় বিষয়াদি না বুঝলেও এই ঐকমত্যের প্রদর্শনে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু আসলে নাইসিয়ায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। সম্মেলন শেষ হওয়ার পর বিশপগণ আগের মতোই আবার যার যার শিক্ষাদানে ফিরে গিয়েছিলেন। পরবর্তী আরও ষাট বছর আরিয়ান সংকট অব্যাহত ছিল। আরিয়াস ও তার অনুসারীগণ পাল্টা লড়াই করে রাজকীয় অনুগ্রহ লাভে সফল হন। কমপক্ষে পাঁচবার নির্বাসিত হয়েছিলেন আথানাসিয়াস। নিজের ক্রীড টিকিয়ে রাখা খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছিল তাঁর পক্ষে। বিশেষ করে homoonsion শব্দটি (আক্ষরিক অর্থে, একই উপাদানে তৈরি) দারুণ বিতর্কিত ছিল, কারণ এটা ঐশীগ্রন্থ বিরোধী এবং এতে বস্তুগত সংযোগ রয়েছে। এভাবে দুটো তামার মুদ্রাকে homousion বলা যেতে পারে, কেননা দুটোই একই বস্তু থেকে তৈরি ।
আবার, আথানাসিয়াসের ক্রীড বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব হীন। এখানে জেসাসকে স্বর্গীয় বলা হলেও ব্যাখ্যা করা হয়নি লোগোস দ্বিতীয় ঈশ্বর না হয়েও কীভাবে তিনি পিতার মতো একই উপাদানের হতে পারেন । ৩৩৯ সালে আথানাসিয়াসের বিশ্বস্ত বন্ধু ও সহকর্মী বিশপ অভ আনসিরা মার্সেলাস, যিনি এমনকি নির্বাসনে একবার তার সঙ্গীও হয়েছিলেন-যুক্তি দেখিয়েছেন যে লোগোস চিরন্তন স্বর্গীয় সত্তা হতে পারেন না। তিনি ঈশ্বরের মাঝে প্রচ্ছন্ন গুন; এ হিসাবে, নাইসিন ফরমুলাকে ত্রি-ঈশ্বরবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করা যেতে পারত: তিন ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসের কথা রয়েছে এখানে: পিতা, পুত্র এবং আত্মা। বিতর্কিত homiousion শব্দের পরিবর্তে মার্সেলাস আপোস রফার জন্যে homiousion অর্থাৎ একরকম’ বা ‘একই স্বভাবের’ শব্দটি প্রস্তাব করেন। এই বিতর্কের জটিল ধারা প্রায়শঃ পরিহাসের সৃষ্টি করেছে; উল্লেখযোগ্যভাবে গিবন মনে করেছেন, তুচ্ছ বিষয়ে ক্রিস্টান ঐক্য হুমকির মুখে পড়াটা অসম্ভব একটা ব্যাপার। অবশ্য ধারণাগত দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করা অসুবিধাজনক হওয়া সত্ত্বেও ক্রাইস্টের অলৌকিত্বের আবশ্যকতার প্রতি ক্রিশ্চানদের আঁকড়ে থাকার ব্যাপারটা বেশ চমকপ্রদ। মার্সেলাসের মতো বহু ক্রিশ্চান ঈশ্বরের একত্বের প্রতি হুমকিতে অস্বস্তিতে ভুগছিল। মার্সেলাস বোধ হয় বিশ্বাস করেছিলেন যে লোগোস কেবল একটা অতিক্রমশীল পর্যায় ছিল: সৃষ্টির সময় ঈশ্বর হতে আবির্ভূত হয়েছিল এটা, জেসাসের মাঝে স্থান করে নিয়েছে ও নিষ্কৃতি সমাপ্ত হওয়ার পর আবার স্বর্গীয় রূপে হারিয়ে যাবে, যাতে কেবল ঈশ্বরই সর্বেসর্বা রয়ে যাবেন।
