যা আমাদের পুণ্যাত্মা পূর্বপুরুষেরা নীরবে সংরক্ষণ করেছেন, যা উৎকণ্ঠা আর কৌতূহল রোধ করেছে…এই নীরবতার সাহায্যে রহস্যের পবিত্র রূপ সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে। অদীক্ষিতজনদের এই শিক্ষা বহন করার অনুমোদন নেই: লিখিতরূপে এদের অর্থ প্রকাশ করা যাবে না।
.
শাস্ত্রীয় প্রতীক ও জেসাসের শিক্ষার সাবলীলতার আড়ালে ছিল অধিকতর গোপন এক ডগমা, যা ধর্মবিশ্বাসের আরও উন্নত উপলব্ধি তুলে ধরে।
নিগূঢ় এবং প্রকাশিত সত্যের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য ঈশ্বরের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। কেবল গ্রিক ক্রিশ্চানদের মাঝেই এটা সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং ইহুদি ও মুসলিমরাও নিগূঢ় ঐতিহ্য গড়ে তুলবে। গোপন মতবাদের ধারণার পেছনে মানুষের মত বন্ধ করার উদ্দেশ্য কাজ করেনি। ফ্রিম্যাসনরির কোনও আদি ধরনের কথা বলেননি বাসিল। তিনি কেবল এই। সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন যে সকল ধর্মীয় সত্য স্পষ্ট এবং যৌক্তিকভাবে প্রকাশ উপযোগি নয়। কোনও কোনও ধর্মীয় দর্শনের অভ্যন্তরীণ অনুরণন রয়েছে যা কেবল কেউ তার একান্ত নিজস্ব সময়ে প্লেটোর সংজ্ঞানুযায়ী থিয়োরিয়া বা ধ্যানের মাধ্যমেই উপলব্ধি করতে পারে। যেহেতু সকল ধর্ম স্বাভাবিক ধারণা এবং বৈশিষ্ট্যের অতীত এক অনিবৰ্চনীয় সত্তার প্রতি নিবেদিত, সেহেতু বক্তব্য সীমাবদ্ধ এবং বিভ্রান্তিকর। আত্মার চোখ দিয়ে এসব সত্যকে না দেখলে যেসব লোক এখনও খুব অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেনি তারা ভ্রান্ত ধারণা পেয়ে বসতে পারে। সুতরাং, আক্ষরিক অর্থের পাশাপাশি ঐশীগ্রন্থসমূহের অ্যাধ্যাত্মিক তাৎপর্যও রয়েছে যা সবসময় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বুদ্ধও উল্লেখ করেছেন যে কিছু কিছু প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা ‘অসংগত’ বা বেমানান, যেহেতু এগুলো ভাষার আয়ত্তের অতীত বাস্তবতার কথা বলে। ধ্যানের এক অন্তর্মুখী কৌশলের আশ্রয় নিয়েই কেবল আপনি তা আবিষ্কার করতে পারবেন: এক অর্থে আপনাকেই তা তৈরি করে নিতে হবে। ভাষায় এগুলোর বর্ণনা দেওয়ার প্রয়াস বিতোফেনের শেষ কোয়ারটেট এর কোনও একটার মৌখিক বর্ণনা দেওয়ার মতোই অদ্ভুত হয়ে উঠতে পারে। বাসিল যেমন বলেছেন, এসব দুর্বোধ্য ধর্মীয় বাস্তবতা কেবল শাস্ত্রের প্রতীকী ভঙ্গি বা আরও ভালো, নীরবতার সাহায্যে বোঝানো যেতে পারে।
পশ্চিমের খৃস্টধর্ম আরও বাগাড়ম্বরপূর্ণ ধর্মে পরিণত হবে এবং অনিবার্যভাবে কেরিগমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে; এটাই হয়ে দাঁড়াবে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে এর প্রধান সমস্যা। অবশ্য গ্রিক অর্থডক্স চার্চে উন্নত সকল ধর্মতত্ত্ব নীরব বা অ্যাপফ্যাটিক হবে। গ্রেগরি অভ নাইসা যেমন বলেছেন, ঈশ্বর সম্পর্কিত প্রতিটি ধারণাই সদস্যপূর্ণ, এক মিথ্যা সমরূপতা, প্রতিমা: এটা স্বয়ং ঈশ্বরকে প্রকাশ করতে পারে না। ক্রিশ্চানদের অবশ্যই আব্রাহামের মতো হতে হবে, যিনি গ্রেগরির উপস্থাপিত জীবনীতে ঈশ্বর সম্পর্কে সকল ধারণা বাদ দিয়ে এমন এক বিশ্বাস গ্রহণ করেছিলেন যা, যে কোনও ধারণার চেয়ে অবিমিশ্র এবং খাঁটি ছিল। গ্রেগরি তার লাইফ অভ মোজেস-এ জোর দিয়ে বলেছেন, আমরা যার প্রত্যাশা করি তার প্রকৃত দর্শন এবং জ্ঞান দেখার সঙ্গে জড়িত নয় বরং এমন এক সচেতনতার সঙ্গে সম্পর্কিত যার ফলে আমাদের লক্ষ্য সকল জ্ঞানকে ছাপিয়ে যায় এবং দুর্বোধ্যতার অন্ধকার দিয়ে সবদিক থেকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন। আমরা বুদ্ধি দিয়ে ঈশ্বরকে দেখতে পারি না, কিন্তু সিনাই পর্বতে নেমে আসা মেঘের আড়ালে নিজেদের ঢাকতে পারলেই কেবল আমরা তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতে পারব। ঈশ্বরের সত্তা {ousia) এবং বিশ্বে তার কর্মধারা (energaiai)-র মাঝে ফিলো যে পার্থক্য টেনেছিলেন, বাসিল তারই শরণাপন্ন হয়েছেন: ‘আমরা কেবল তার কাজ (energeial) দিয়েই ঈশ্বরকে জানতে পারি, কিন্তু আমরা তার সত্তার দিকে অগ্রসর হই না। এটাই ইস্টার্ন চার্চের ভবিষ্যতের সকল মূল কথায় পরিণত হবে।
কাপাদোসিয়রা পবিত্র আত্মার ধারণা গড়ে তুলতেও বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল যে নাইসিয়ায় দায়সারাভাবে এদিকটাতে নজর দেওয়া হয়েছিল: আর আমরা বিশ্বাস করি পবিত্র আত্মায়’ কথাগুলো যেন শেষ বিবেচনায় আথানাসিয়াসের বিশ্বাসে যোগ করা হয়েছিল। পবিত্র আত্মার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিল মানুষ। এটা কি কেবল ঈশ্বরের একটি প্রতীক বা সমার্থক শব্দ নাকি আরও বেশি কিছু? কেউ কেউ একে (আত্মা) এক ধরনের কাজ ভেবেছিল,’ বলেছেন গ্রেগরি অভ নাযিয়ানস, কেউ ভেবেছে সৃষ্ট প্রাণী, কেউ ভেবেছে ঈশ্বর, কেউ বুঝে উঠতে পারেনি তাকে কি ডাকা যায়।২০ সেইন্ট পল নবায়ন, সৃষ্টি এবং পবিত্রকরণ সম্পর্কে পবিত্র আত্মার উল্লেখ করেছিলেন, কিন্তু এসব কাজ কেবল ঈশ্বর দ্বারাই সম্পাদন সম্ভব। সুতরাং বোঝা যায়, পবিত্র আত্মা, আমাদের মাঝে যার উপস্থিতিকে আমাদের মুক্তি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, নিশ্চয়ই স্বর্গীয়, সামান্য সৃষ্টি নন। কাপাদোসিয়রা একটা ফর্মুলা প্রয়োগ করেছিলেন যা আরিয়াসের সঙ্গে বিরোধের সময় ব্যবহার করেছেন আথানাসিয়াস: ঈশ্বরের একক সত্তা (ousia) রয়েছে যা আমাদের বোধের অতীত রয়ে গেছে-কিন্তু তিনটি অভিব্যক্তি তাঁকে জ্ঞাত করেছে।
