ক্রিশ্চানরা জানত জেসাস ক্রাইস্ট নিজের মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মাধ্যমে তাদের রক্ষা করেছেন; তারা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং একদিন ঈশ্বরের অস্তিত্বের মুখোমুখি হতে পারবে, যিনি স্বয়ং সত্তা এবং প্রাণ। কোনওভাবে ক্রাইস্ট ঈশ্বর ও মানবজাতিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা দূরত্বটুকু অতিক্রম করে যেতে সক্ষম করে তুলেছেন তাদের। প্রশ্ন হলো, কাজটা কীভাবে করেছেন তিনি? মহাবিভক্তির কোন পাশে ছিলেন তিনি? প্লেরোমা, মধ্যস্থতাকারী ও ঈয়নের পূর্ণতার আর কোনও স্থান ছিল না। হয় ক্রাইস্ট, বাণী স্বর্গীয় রাজ্যের অধিবাসী ছিলেন (যেটা এখন কেবল ঈশ্বরের নিজস্ব অঞ্চল) না হয় নাজুক সৃষ্ট ব্যবস্থার অংশ ছিলেন তিনি। আরিয়াস ও আথানাসিয়াস মহাগহ্বরের বিপরীত দিকে স্থাপন করেছিলেন তাঁকে: আথানাসিয়াস রেখেছেন স্বর্গীয় অঞ্চলে এবং সৃষ্ট জগতে রেখেছেন আরিয়াস।
অদ্বিতীয় ঈশ্বর ও তার সকল সৃষ্টির মাঝে আবশ্যকীয় পার্থক্যের ওপর জোর দিতে চেয়েছিলেন আরিয়াস। বিশপ আলেকজান্দারের উদ্দেশে তিনি যেমন লিখেছিলেন, ঈশ্বর একমাত্র অজন্ম, একমাত্র চিরকালীন, একমাত্র তারই কোনও আদি নেই, তিনিই একমাত্র সত্য, একমাত্র তিনিই অমরত্বের অধিকারী, একমাত্র সর্বজ্ঞানী, সর্বোত্তম, একমাত্র স্রষ্টা। ঐশীগ্রন্থ ভালো করেই রপ্ত ছিল আরিয়াসের। ক্রাইস্ট-বাণী কেবল আমাদের মতোই সৃষ্ট জীব, এ দাবির সপক্ষে অসংখ্য দলিল উপস্থাপন করেছেন তিনি। প্রোভার্বসে দেওয়া স্বর্গীয় প্রজ্ঞার বর্ণনা ছিল তাঁর মূল অনুচ্ছেদ, যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, আদিতে ঈশ্বর প্রজ্ঞা সৃষ্টি করেছিলেন। এই টেক্সট-এ আরও বলা হয়েছে যে প্রজ্ঞা ছিল সৃষ্টির এজেন্ট। সেইন্ট জনের গস্পেলের উপক্রমণিকায় এ ধারনাটির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। আদিতে বাণী ছিল ঈশ্বরের সঙ্গে:
সকলেই তাঁহার দ্বারা হইয়াছিল, যাহা হইয়াছে,
তাহার কিছুই তাহা ব্যতিরেকে হয় নাই।
অন্যান্য সৃষ্ট জীবকে অস্তিত্ব দানের জন্যে ঈশ্বরের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ছিল লোগোস । সুতরাং, এটা অন্য সকল বস্তু বা সত্তা থেকে একেবারেই ভিন্ন ও ব্যতিক্রমী উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু যেহেতু ঈশ্বর একে সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং লোগোস আবশ্যিকভাবে স্বয়ং ঈশ্বরের চেয়ে আলাদা এবং ভিন্ন।
সেইন্ট জন পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে জেসাসই লোগোস ছিলেন, তিনি এও বলেছেন লোগোসই ছিলেন ঈশ্বর। তবু প্রকৃতিগতভাবে তিনি ঈশ্বর ছিলেন না, জোর দিয়ে বলেছেন আরিয়াস, বরং ঈশ্বর কর্তৃক স্বর্গীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। আমাদের বাকি সবার চেয়ে তিনি আলাদা, কারণ ঈশ্বর আগে থেকেই জানতেন যে লোগোস মানুষ হওয়ার পর নিখুঁতভাবে তাকে মানবেন এবং, বলা যায়, জেসাসের প্রতি আগাম ঐশ্বরিকতা আরোপ করেছিলেন। কিন্তু জেসাসের অলৌকিকত্ব সহজাত ছিল না। এটা ছিল স্রেফ উপহার বা পুরস্কার। এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনেও বহু বিবরণ উপস্থাপনে সফল হয়েছিলেন আরিয়াস। জেসাস ঈশ্বরকে ‘পিতা’ সম্বোধন করেছিলেন, এই ব্যাপারটাই একটা পার্থক্য থাকার কথা প্রকাশ করে; পিতৃত্বের প্রকৃতির কারণেই পূর্বঅস্তিত্ব ও পুত্রের উপর সুনির্দিষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব বোঝায়। বাইবেলের উল্লিখিত ক্রাইস্টের অসম্মান ও দুর্বলতা সম্পর্কিত অনুচ্ছেদগুলোর প্রতিও জোর দিয়েছেন আরিয়াস। যেমনটি তার প্রতিপক্ষ দাবি করেছে, জেসাসকে অসম্মানিত করার কোনও উদ্দেশ্য আরিয়াসের ছিল না। ক্রাইস্টের গুণাবলী এবং আমৃত্যু আনুগত্য সম্পর্কে উঁচু ধারণা পোেষণ করতেন তিনি, যা আমাদের মুক্তি নিশ্চিত করেছে। আরিয়াসের ঈশ্বর গ্রিক দার্শনিকদের ঈশ্বরের কাছাকাছি ছিলেন, দূরবর্তী ও বিশ্বজগতের ঊর্ধ্বে; তিনিও মুক্তির গ্রিক ধারণার অনুসারী ছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, স্টয়িকরা সব সময় শিক্ষা দিয়েছে যে গুণবান মানুষের পক্ষে সবসময়ই স্বর্গীয় মর্যাদা লাভ সম্ভব। প্লেটোনিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও এটা আবশ্যিক ছিল। আরিয়াস আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে ক্রিশ্চানরা নিস্কৃতি পেয়েছে ও স্বর্গীয় মর্যাদা লাভ করেছে, তারা ঈশ্বরের প্রকৃতির অংশীদার। এটা সম্ভব হয়েছে কেবল জেসাস আমাদের জন্যে পথ তৈরি করে গেছেন বলে। তিনি নিখুঁত মানব জীবন যাপন করে গেছেন; আমৃত্যু এমনকি ক্রুশবিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত ঈশ্বরের আনুগত্য করেছেন। সেইন্ট পল যেমন বলেছেন, আমৃত্যু আনুগত্য প্রদর্শনের সুবাদেই ঈশ্বর তাঁকে বিশেষ মর্যাদার আসনে উন্নীত করেছেন এবং স্বর্গীয় প্রভু (Kyrios) উপাধি দান করেছেন।’ জেসাস মানুষ না হলে আমাদের কোনও আশাই থাকত না। প্রকৃতিগতভাবে ঈশ্বর হলে তার জীবনে অসাধারণত্ব বলে কিছুই থাকত না, অনুকরণ করার মতো কিছু থাকত না আমাদের। ক্রাইস্টের পুত্রানুগত্যের আদর্শ নিয়ে ধ্যান করার মাধ্যমে ক্রিশ্চানরাও স্বর্গীয় হয়ে উঠতে পারবে। নিখুঁত সৃষ্টি ক্রাইস্টকে অনুকরণের ভেতর দিয়ে তারাও ‘অপরিবর্তনীয় ও অপনোদনযোগ্য ঈশ্বরের নিখুঁত সৃষ্টিতে পরিণত হতে পারবে।
কিন্তু মানুষের ঈশ্বরকে ধারণ করার ক্ষমতা সম্পর্কে আথানাসিয়াসের ধারণা এতটা আশাবাদী ছিল না। মানুষকে জন্মগতভাবে নাজুক হিসাবে দেখেছেন তিনিঃ শূন্য হতে এসেছি আমরা এবং পাপের ফলে আবার শূন্যতায় নিক্ষিপ্ত হয়েছি। সুতরাং ঈশ্বর যখন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে ভাবেন তিনি,
