এতে করে চার্চ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটা শক্তিতে পরিণত হয়েছিল যা সম্রাট কন্সতান্তাইনের পছন্দ হয়েছিল। ৩১২ সালের মিলভিয়ান যুদ্ধের পর খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তিনি এবং এর পরের বছর খৃস্টধর্মকে বৈধতা দেন। এর ফলে ক্রিশ্চানদের সম্পত্তির মালিকানা পাওয়ার অধিকার জন্মে, স্বাধীনভাবে উপাসনা করার সুযোগ পায় তারা এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হয়ে ওঠে। যদিও আরও দুশো বছর ধরে পৌত্তলিকতার বিকাশ ঘটেছিল কিন্তু খৃস্টধর্মই সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়। বস্তুগত অগ্রগতির স্বার্থে চার্চে যাতায়াতকারীরা ধর্মান্তরিত হতে শুরু করে। সহিষ্ণুতার আবেদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত নির্যাতিত গোষ্ঠী এই চার্চ অচিরেই নিজস্ব আইন ও বিধি বিধানের প্রতি আনুগত্য দাবি করে বসবে। খৃস্টধর্মের বিজয়ের কারণগুলো অস্পষ্ট; রোমান সম্রাটের সমর্থন ছাড়া এটা কিছুতেই সাফল্য অর্জন করতে পারত না, যদিও অনিবার্যভাবে তা নিজস্ব সমস্যার জন্ম দিয়েছিল। পুরোপুরি প্রতিকূলতার ধর্ম বলে সমৃদ্ধির কালে কখনওই এটা তুঙ্গ অবস্থায় থাকতে পারেনি। যেসব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান জরুরি হয়ে পড়েছিল, তার অন্যতম ছিল ঈশ্বরের মতবাদ: কন্সতান্তাইন চার্চে শান্তি স্থাপন করার পরপরই ভেতর থেকে এক নতুন বিপদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল যা খৃস্টধর্মকে তিক্ত বিরোধে লিপ্ত দুটো শিবিরে ভাগ করে দেয়।
০৪. ট্রিনিটি : ক্রিশ্চান ঈশ্বর
মোটামুটিভাবে ৩২০ সাল নাগাদ এক প্রবল ধর্মতত্ত্বীয় আবেগ মিশর, সিরিয়া এবং এশিয়া মাইনরের দেশসমূহে জোরাল হয়ে উঠেছিল। নাবিক ও পর্যটকরা জনপ্রিয় লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন ভাষ্য গাইতে শুরু করেছিল যেখানে দাবি করা হয়েছে যে পিতা অগম্য এবং অদ্বিতীয় প্রকৃত ঈশ্বর, কিন্তু পুত্র চিরন্তনও নন এবং নন অজাতও; যেহেতু তিনি পিতার কাছ থেকে প্রাণ ও অস্তিত্ব লাভ করেছেন। স্নানাগারের একজন পরিচারকের ‘পুত্র এসেছিলেন শূন্যতা থেকে জোরের সাথে একথা বলে স্নানার্থীদের হয়রানি করার কথা শুনতে পাই, জনৈক মানিচেঞ্জার, বিনিময় হার জানতে চাওয়া হলে জবাব দেওয়ার আগে সৃষ্ট জগৎ ও অসৃষ্ট ঈশ্বরের পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখে; আরেকজন রুটিপ্রস্তুতকারী ক্রেতাকে জানায় যে, পিতা তার পুত্রের চেয়ে শ্রেয়তর । আজকের দিনে লোকে যেভাবে ফুটবল নিয়ে আলাপ করে ঠিক সেই একই রকম উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এইসব বিমূর্ত প্রশ্ন সম্পর্কে আলোচনায় মত্ত হয়ে উঠেছিল লোকে। আলেকজান্দ্রিয়ার আরিয়াস নামের ক্যারিশম্যাটিক, সুদর্শন প্রেসবিটার এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছিলেন। আকর্ষণীয় কোমল কণ্ঠের অধিকারী ছিলে আরিয়াস, চেহারায় দারুণ নির্বিকার ছাপ। বিশপ আলেকজান্দারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তিনি, বিশপ উপেক্ষাও করতে পারেননি আবার জবাব দেওয়াও হয়ে উঠেছিল তাঁর জন্যে কঠিন: পিতা ঈশ্বরের মতো একইভাবে জেসাস ক্রাইস্ট ঈশ্বর ছিলেন কীভাবে? আরিয়াস ক্রাইস্টের ঐশ্বরিকতা অস্বীকার করছিলেন না; প্রকৃতপক্ষে জেসাসকে তিনি শক্তিশালী ঈশ্বর’ এবং পূর্ণ ঈশ্বর বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর যুক্তি ছিল জেসাসকে প্রকৃতিগতভাবে স্বর্গীয় ভাবাটা ব্লাসফেমাস হবে: জেসাস স্পষ্ট করে বলেছেন যে, পিতা তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আলেকজান্দার এবং তাঁর তরুণ সহকারী আথানাসিয়াস অচিরেই বুঝতে পারলেন যে ব্যাপারটা আর সামান্য ধর্মতাত্বিক শোভনতায় সীমিত নেই। ঈশ্বরের প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছিলেন আরিয়াস। এদিকে দক্ষ প্রচারবিদ আরিয়াস আপন ধারণায় সুর দিলেন এবং অচিরেই বিশপদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এসব বিশপদের মতোই প্রবল উৎসাহে বিতর্কে লিপ্ত হলো।
বিতর্ক এতই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে সম্রাট কন্সতাইন বিষয়টি সুরাহা করার উদ্দেশ্যে হস্তক্ষেপ করেন এবং আধুনিক তুরস্কের নাইসিয়াতে এক সিন আহ্বান করেন। বর্তমানে আরিয়াসের নাম ধর্মোদ্রোহের প্রতিশব্দ, কিন্তু বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার সময় কোনও আনুষ্ঠানিক অর্থডক্স অবস্থান ছিল না তার এবং কেন বা কীভাবে আরিয়াসের ভুল হয়েছে নিশ্চিত করে জানার উপায় ছিল না। তার দাবিতে নতুন কিছু ছিল নাঃ উভয় পক্ষের কাছে অতি সম্মানিত অরিগেনও একই ধরণের মতবাদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু অরিগেনের আমলের চেয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল, মানুষ প্লেটোর ঈশ্বরকে বাইবেলের ঈশ্বরের সঙ্গে সাফল্যের সঙ্গে সমন্বিত করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে পারছিল না। উদাহরণস্বরূপ, আরিয়াস, আলেকজান্দার এবং আথানাসিয়াস এমন একটা মতবাদে বিশ্বাস রাখতে শুরু করেছিলেন যা যেকোনও প্লেটোবাদীকে চমকে দিত; তাঁরা ঐশীগ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে মনে করেছেন, ঈশ্বর শূন্য হতে বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। আসলে, জেনেসিস এই দাবি করেনি। প্রিস্টলি লেখকগণ বোঝানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন যে, ঈশ্বর আদিম বিশৃঙ্খলা থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বর একেবারে শূন্য হতে গোটা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন, এই ধারণাটি ছিল একেবারে নতুন। গ্রিক মননে এটা ছিল একেবারে আনকোরা, ক্লিমেন্ট ও অরিগেনের মতো ধর্মবিদরা যারা প্লেটোর উৎসারণ প্রকল্প বিশ্বাস করে গেছেন, তারা কখনও এমন কথা বলেননি। কিন্তু চতুর্থ শতাব্দী নাগাদ ক্রিশ্চানরা জগৎ উৎপত্তিগতভাবে নাজুক, অপূর্ণ এবং এক বিশাল গহ্বর দ্বারা ঈশ্বর হতে বিচ্ছিন্ন থাকার নসটিকদের ধারণা গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। শূন্য হতে সৃষ্টির এই নতুন মতবাদ মহাবিশ্ব সৃষ্টিকে। অপরিহার্যভাবে ভঙ্গুর আর অস্তিত্বের জন্যে পুরোপুরি ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীলতার উপর জোর দেয়। গ্রিক চিন্তাধারার মতো ঈশ্বর ও মানুষ আর । নিকটবর্তী থাকল না। এক বিরাট শূন্যতা থেকে ঈশ্বর প্রতিটি সত্তাকে সৃষ্টি করেছেন, যেকোনও মুহূর্তে তিনি তাঁর হেফাযতের হাত তুলে নিতে পারেন। ঈশ্বরের নিকট হতে সত্তার চিরন্তন উৎসারণের বিশাল ধারা আর রইল না; পৃথিবীতে স্বর্গীয় মানা প্রেরণকারী আধ্যাত্মিক সত্তাসমূহের মধ্যবর্তী একটা জগৎও অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলল। আপন প্রচেষ্টায় সত্তার ধারা বেয়ে আর ঈশ্বরের কাছে পৌঁছার উপায় থাকল না। নারী ও পুরুষের একমাত্র ঈশ্বর যিনি মূলত শূন্য হতে তাদের সৃষ্টি করেছেন এবং প্রাণশক্তি বজায় রেখেছেন, কেবল তার পক্ষেই চিরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
