দ্য ওয়ান কঠোরভাবে নৈর্ব্যক্তিক; এর কোনও লিঙ্গ পরিচয় নেই এবং আমাদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। একইভাবে ব্যাকরণগতভাবে মন পুরুষবাচক এবং আত্মা (Psyche) নারীবাচক শব্দ, এখানে লিঙ্গের ভারসাম্য ও সমতা সম্পর্কিত পৌত্তলিকদের প্রাচীন দর্শন রক্ষা করার ক্ষেত্রে প্রটিনাসের আগ্রহ প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে। বাইবেলিয় ঈশ্বরের বিপরীতে, এটা আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে বাড়ির পথ দেখাতে আসে না, আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে না, কিংবা ভালোবাসে না, কিংবা নিজেকে আমাদের সামনে প্রকাশ করে না। নিজ সম্পর্কে ছাড়া অন্য কিছুর জ্ঞান নেই এর।[৫২] তারপরেও মানব আত্মা কখনও কখনও দ্য ওয়ানের উপলব্ধিতে আনন্দে উদ্বেলিত হয়। প্রটিনাসের দর্শন যৌক্তিক প্রক্রিয়া নয় বরং এক আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান ছিল:
এখানে আমাদের, আমাদের দিক থেকে, সবকিছু একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল এর দিকে মনোনিবেশ করে আমাদের সকল বন্ধন ছেড়ে তাতেই পরিণত হতে হবে, এখান থেকে পলায়নের জন্যে অবশ্যই আমাদের তাড়াহুড়ো করতে হবে, আমাদের সকল সত্তা দিয়ে ঈশ্বরকে আলিঙ্গন করার জন্যে আমাদের পার্থিব বন্ধন নিয়ে অধৈর্য হতে হবে, যেন আমাদের কোনও অংশই ঈশ্বরের থেকে সরে না থাকে। সেখানে হয়তো আমরা ঈশ্বরকে দেখতে পাব এবং বিধি যেমন প্রকাশ করেছে যেভাবে আমাদের দেখব: বুদ্ধির আলোয় পরিপূর্ণ বা স্বয়ং আলোয়, খাঁটি, প্রফুল্ল, বায়বীয়, জাত-প্রকৃত অর্থে, সত্তা–প্রকৃত নামে দেবতা হিসাবে। [৫৩]
এই ঈশ্বর কোনও অজ্ঞাত বস্তু নন, বরং আমাদের সর্বোত্তম সত্তা, ‘জানার বা উপলব্ধির মাধ্যমে আসে না, যা কিনা বুদ্ধিমান সত্তা আবিষ্কার করে (মন বা nons-এ) বরং এটা উপস্থিতি (Parousia), যা সকল জ্ঞানকে অতিক্রম করে।[৫৪]
প্লেটোনিয় ধারণার প্রভাব বলয়ে খৃস্টধর্ম ভিন্ন অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে ক্রিশ্চান চিন্তাবিদরা যখনই নিজস্ব ধর্মীয় অনুভূতি ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন, স্বভাবতই তারা প্রটিনাস ও তাঁর পৌত্তলিক অনুসারীদের নিওপ্লেটোনিক দর্শনের আশ্রয় নিয়েছেন। এক নৈর্ব্যক্তিক, মানবীয় বৈশিষ্ট্যের অতীত, মানুষের জন্যে স্বাভাবিক আলোকপ্রাপ্তির এই ধারণা ভারতের হিন্দু-বুদ্ধ মতাদর্শের অনেক বেশি কাছাকাছি, যেখানে পড়াশোনায় গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন প্রটিনাস । সুতরাং বাহ্যিক পার্থক্য সত্ত্বেও পরম সত্তা সম্পর্কিত দর্শনের ক্ষেত্রে একেশ্বরবাদী ও অন্যান্য ধারণার গভীর সাদৃশ্য ছিল । লোকে পরম সত্তা সম্পর্কে ধ্যান করার সময় একই ধরনের ধারণা বা উপলব্ধি বোধ করে। কোনও এক সত্তার উপস্থিতিতে আনন্দ ও আতঙ্কের বোধ-যাকে নির্বাণ, দ্য ওয়ান, ব্রহ্মা বা ঈশ্বর বলা হয়-মনের একটা বিশেষ অবস্থা এবং প্রত্যক্ষ উপলব্ধি যা খুবই স্বাভাবিক, মানুষের অন্তহীন আকাক্ষার বিষয়।
ক্রিশ্চানদের কেউ কেউ গ্রিক বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল । অন্যরা এনিয়ে মাথা ঘামাতে চায়নি। ১৭০ সাল নাগাদ এক প্রবল নির্যাতনকালে মন্তানুস নামে এক নতুন পয়গম্বর আধুনিক তুরস্কের ফ্রাইগিয়ায় আবির্ভূত হয়ে নিজেকে স্বর্গীয় অবতার দাবি করেন: ‘আমিই প্রভু সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, মানুষের মাঝে যিনি অবতরণ করেছেন, চেঁচিয়ে বলতেন তিনি। আমি পিতা, পুত্র ও প্যারাক্লিট।’[৫৫] তাঁর সহচর প্রিসিলা ও ম্যাক্সিমিলাও একই রকম দাবি করেছিলেন। মস্তানিজম প্রবল প্রলয়বাদী বিশ্বাস ছিল যা ঈশ্বরের এক ভীতিজনক চিত্র এঁকেছিল। এর অনুসারীরা শুধু যে ইহজাগতিক জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য ছিল তা নয় বরং তাদের এও বলা হয়েছে যে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের একমাত্র পথ হচ্ছে শাহাদাৎ বরণ । বিশ্বাসের স্বার্থে তাদের যন্ত্রণাময় মৃত্যু ক্রাইস্টের আগমন তরান্বিত করবে: শহীদরা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঈশ্বরের সৈনিক। ভয়ঙ্কর এই বিশ্বাস ক্রিশ্চানদের চেতনায় এক সুপ্ত চরমপন্থাকে উস্কে দিয়েছিল: ফাইগিয়া, সিরিয়া ও গলে দাবানলের মতো মস্তানিজমের বিস্তার ঘটে। উত্তর আফ্রিকায় যেখানকার জনগণ মানুষের বলী। দাবি করে, এমন দেবতায় অভ্যস্থ ছিল বলে সেখানে তা বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ভূমিষ্ঠ প্রথম শিশুর উৎসর্গ দাবিকারী তাদের বাআলের কাল্ট মাত্র দ্বিতীয় শতাব্দীতে সম্রাট কর্তৃক রদ হয়েছিল। অচিরেই এই বিদ্রোহী। বিশ্বাসটি (ক্রিড) লাতিন চার্চের নেতৃস্থানীয় ধর্মতাত্ত্বিক তারতুলিয়ানের মতো ব্যক্তিকে আকৃষ্ট করেছিল। প্রাচ্যে ক্লিমেন্ট ও অরিগেন এক প্রশান্ত, প্রফুল্ল অবস্থায় ঈশ্বরে প্রত্যাবর্তনের শিক্ষা দিয়েছিলেন, কিন্তু পশ্চিমের চার্চ ঈশ্বর মুক্তির শর্ত হিসাবে ভয়ঙ্কর মৃত্যু দাবি করে বসলেন। এই পর্যায়ে পশ্চিমে ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় খৃস্টধর্মকে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হচ্ছিল আর একেবারে গোড়া থেকে চরমপন্থা ও জরবদস্তির একটা প্রবণতা কাজ করছিল।
কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রাচ্যে খৃস্টধর্ম দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। ২৩৫ সাল নাগাদ রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মে পরিণত হয়েছিল তা। ক্রিশ্চানরা এ সময় একটি মাত্র বিশ্বাসের এমন এক মহান চার্চের কথা বলত যেখানে। চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ির স্থান নেই। এই অর্থডক্স ধর্মতাত্ত্বিকরা নসটিক, মারসিয়নাইট, মন্তানিস্টদের নৈরাশ্যবাদী দর্শন বাতি ঘোষণা করে মধ্যপন্থা বেছে নেন। ধর্মবিশ্বাসে রহস্যময় কাল্ট ও কঠিন সন্ন্যাসব্রতের জটিলতা পরিহার গ্রিকো-রোমান বিশ্বের বোধগম্য পথে ধর্ম বিশ্বাস গড়ে তুলতে সক্ষম উচ্চ বুদ্ধিমত্তার লোকজনের কাছে আবেদন রাখতে শুরু করেছিল এটা। নতুন। এই ধর্ম নারীদেরও আগ্রহী করে তোলে: এর ঐশীগ্রন্থগুলো শিখিয়েছে যে স্রষ্টা। নারী বা পুরুষ নন এবং জোর দিয়ে বলে ক্রাইস্ট যেভাবে চার্চের আকাঙ্ক্ষা করেন ঠিক তেমনিভাবে পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের প্রত্যাশায় থাকে। ইহুদিবাদ। এককালে যেমন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ধর্ম হয়ে উঠেছিল, ঠিক তেমনি সব সুবিধার অধিকারী হয়ে উঠেছিল খৃস্টধর্ম, তদুপরি খত্না ও ভিনদেশী ‘আইনে’র সমস্যা ছিল না এর। চার্চগুলোর প্রতিষ্ঠিত জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা ও পরস্পরের প্রতি ক্রিশ্চানদের দরদী ব্যবহারে পৌত্তলিকরা বিশেষ করে আকৃষ্ট হয়েছিল। নির্যাতন থেকে রক্ষা আর ভেতরের অসন্তোষ থেকে বাঁচার দীর্ঘ সংগ্রামকালে। চার্চ এমন এক দক্ষ সংগঠন গড়ে তুলেছিল যা প্রায় একটা সাম্রাজ্যের অনুরূপ: এটা বহুগোত্রীয় ক্যাথলিক, আন্তর্জাতিক, সর্বজনীন এবং দক্ষ আমলাদের হাতে পরিচালিত হচ্ছিল।
