পরম সত্তা এক আদিম একক, প্লটিনাস যাকে দ্য ওয়ান বলেছেন। প্রতিটি বস্তু অস্তিত্বের জন্যে এই সক্ষম সত্তার কাছে ঋণী। দ্য ওয়ান যেহেতু নিজেই সরল, এর সম্পর্কে বলার কিছু নেই: এর এসেন্স বা মূলসুর হতে সুস্পষ্ট পার্থক্য সম্পন্ন এমন কিছু নেই যে সাধারণ বর্ণনা সম্ভবপর করে তুলবে। স্রেফ এটা ছিল। স্বভাবতই দ্য ওয়ান নামহীন। আমরা ‘দ্য ওয়ান’ সম্পর্কে ইতিবাচক চিন্তা করতে চাইলে, ব্যাখ্যা দিয়েছেন পুটিনাস, সেক্ষেত্রে ‘নীরবতাতেই অনেক বেশি সত্যের সন্ধান মিলব ।’[৪৬] এর অস্তিত্ব আছে, তাও বলতে পারব না আমরা, কেননা স্বত্তা স্বয়ং হওয়ায়, কোনও বস্তু নয়, বরং সকল বস্তু থেকে ভিন্ন।’[৪৭] প্রকৃতপক্ষেই, ব্যাখ্যা করেছেন প্রটিনাস, এটা ‘সবকিছু, আবার কিছুই না, অস্তিত্বমান কোনও বস্তু হতে পারে না এটা, তারপরও এটাই সব।’[৪৮] আমরা দেখব, এই ধারণাটি ঈশ্বরের ইতিহাসে একটা স্থির সুরে পরিণত হবে।
কিন্তু যেহেতু ঈশ্বর সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারি, তাই এই নীরবতা পূর্ণাঙ্গ সত্য হতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছেন প্রটিনাস। দ্য ওয়ান তার দুর্ভেদ্য অস্পষ্টতার চাদরে আড়াল হয়ে থাকলে এটা সম্ভব হতো না। দ্য ওয়ান নিশ্চয়ই নিজেকে ছাড়িয়ে আমাদের মতো অপূর্ণ সত্তার কাছে নিজেকে বোধগম্য করে তুলতে আপন সারল্যের ঊর্ধ্বে উঠেছেন। এই স্বর্গীয় ঊর্ধ্বরোহণকে ‘পরম আনন্দ’ হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। এরকম বলার কারণ, এটা খুঁতহীন মহত্বের দিক দিয়ে ‘আপনাকে ছাড়িয়ে যাওয়া’: ‘কোনও চাওয়া নেই, কোনও কিছুর ওপর অধিকার নেই, কোনও অভাব নেই, দ্য ওয়ান নিখুঁত এবং রূপকার্থে, তিনি ছাপিয়ে গেছেন আর এর প্রাচুর্যই নতুনের সৃষ্টি করেছে।’[৪৯] এসবের মাঝে ব্যক্তিগত কিছুই ছিল না; প্লটিনাস দ্য ওয়ানকে ব্যক্তিত্বসহ সকল মানবীয় প্রকৃতির উর্ধ্বে চিন্তা করেছেন। চরম সরল এই ‘উৎস’ থেকে অস্তিত্বশীল সকল কিছুর ব্যাখ্যার করার জন্যে তিনি উৎসারণের প্রাচীন মিথের শরণাপন্ন হয়েছেন-এই প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করার লক্ষ্যে কিছু উপমার ব্যবহার করেছেন: এ যেন সূর্যের আলো বা আগুন থেকে বিকিরিত তাপের মতো, আপনি যত উত্তাপের কেন্দ্রের দিকে যাবেন ততই উত্তপ্ততর হয়ে ওঠে। প্রটিনাসের খুব প্রিয় একটা উপমা ছিল বৃত্তের কেন্দ্রের সঙ্গে দ্য ওয়ানের তুলনা, যাতে ভবিষ্যতের সকল সম্ভাব্য বৃত্তের সম্ভাবনা রয়েছে। জলাশয়ের পানিতে পাথর ফেললে সৃষ্টি হওয়া তরঙ্গের সঙ্গে মিল আছে এর। এনুমা এলিশের মতো মিথে উল্লিখিত উৎসারণের বিপরীতে-যেখানে দেবতাদের মতো জোড়া থেকে উদ্ভূত অপর জোড়া অধিকতর নিখুঁত এবং কার্যকর হয়ে ওঠে-পুঁটিনাসের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ছিল একেবারে উল্টো। নসটিকদের মিথের মতো কোনও বস্তু এর উৎস দ্য ওয়ান থেকে যত দূরে সরে আসবে, সেটা ততই দুর্বল হয়ে পড়বে।
দ্য ওয়ান থেকে বিকিরিত প্রথম দুটি উৎসারণকে স্বর্গীয় হিসাবে দেখেছেন প্লটিনাস, কেননা এগুলো ঈশ্বরকে জানতে ও ঈশ্বরের জীবনধারায় আমাদেরকে অংশগ্রহণে সক্ষম করে তোলে। দ্য ওয়ানের সঙ্গে মিলে এগুলো এক স্বর্গীয় এয়ী গড়ে তুলেছে যা ট্রিনিটির চুড়ান্ত ক্রিশ্চান সমাধানের মোটামুটিভাবে বেশ কাছাকাছি। প্রটিনাসের প্রকল্পের প্রথম উৎসারণ, মন প্লেটোর ধারণা জগতের অনুরূপ। দ্য ওয়ানের সারল্যকে বোধগম্য করেছে এটা; কিন্তু জ্ঞান এখানে সহজাত ও প্রত্যক্ষ । এটা গবেষণা ও যুক্তি প্রয়োগের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কষ্টকর উপায়ে অর্জিত নয়, বরং আমাদের অনুভূতি যেমন কোনও বস্তু সামগ্রীকে বুঝে নেয়, সেভাবে আত্মস্থ হয়েছে। আত্ম উৎসারিত হয় মন থেকে ঠিক যেমন মনের উৎসারণ দ্য ওয়ান থেকে । এটা পূর্ণাঙ্গতার চেয়ে খানিকটা দূরবর্তী, এই পর্যায়ে জ্ঞান কেবল অসংলগ্নভাবে সংগ্রহ করা যাবে, ফলে তাতে পরম সারল্য ও সামঞ্জস্যতার ঘাটতি হয় । আত্মা আমাদের চেনা বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই: বাকি সমস্ত ভৌত ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্বের উৎসারণ ঘটে আত্মা থেকে যা। আমাদের জগতকে এর যেটুকু ঐক্য ও সামঞ্জস্যতা আছে তার যোগান দেয় । এখানে আবার একটা বিষয় জোরের সঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে প্লটিনাস দ্য ওয়ান, মন ও আত্মার ত্রয়ীকে ‘মহাশূন্যে ঈশ্বর হিসাবে কল্পনা করেননি। স্বর্গ সকল অস্তিত্বের সম্মিলন। ঈশ্বর সর্বেসর্বা এবং নিম্নস্তরের সত্তা ততক্ষণই টিকে থাকে যতক্ষণ তারা দ্য ওয়ানের পরম সত্তায় অংশ নেয়।[৫০]
দ্য ওয়ানের দিকে প্রত্যাবর্তনের এক সমরূপ চলিষ্ণুতায় বহির্মুখী উৎসারণ রহিত হয়। আমাদের মনের কার্যধারা হতে আমরা যেমন জানি যে দ্বন্দ্ব ও বহুমাত্রিকতা থেকে অসন্তোষের কারণে সকল সত্তাই ঐক্যের আকাক্ষা করে আবার দ্য ওয়ানের কাছে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু এটা বাহ্যিক সত্তার দিকে আরোহণ নয়, বরং মনের গভীরে অভ্যন্তরীণ অবতরণ। আত্মাকে অবশ্যই হৃত সারল্য ফিরে পেতে হবে, ফিরে যেতে হবে তার প্রকৃত সত্তায়। যেহেতু সকল আত্মাই একই সত্তা দ্বারা সজীব হয়েছে, সুতরাং মানুষকে একজন শিল্পীকে ঘিরে থাকা কোরাসের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বিশেষ কোনও ব্যক্তির সুরভঙ্গে অসাম্য ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, কিন্তু সবাই পরিচালকের দিকে মনোনিবেশ করলে গোটা সমাজ লাভবান হবে, কেননা, ‘ওরা তখন যেভাবে গান গাওয়া উচিত সেভাবেই গাইবে এবং প্রকৃতই তার সঙ্গে থাকবে।’[৫১]
