নবম শতাব্দীতে অরিগেনের কোনও কোনও ধারণাকে ধর্মদ্রোহী বলে নিন্দা জানাবে চার্চ। অরিগেন বা ক্লিমেন্ট কেউই বিশ্বাস করেননি যে, ঈশ্বর শূন্য হতে জগৎ সৃষ্টি করেছেন যা পরে অর্থডক্স ক্রিশ্চান মতবাদে পরিণত হয়। জেসাসের অলৌকিতা ও মানুষের মুক্তি সম্পর্কিত অরিগেনের ধারণা স্পষ্টই পরবর্তীকালের ক্রিশ্চান শিক্ষার সঙ্গে যায় নাঃ ক্রাইস্টের মৃত্যুর ফলে আমরা। ‘রক্ষা পেয়েছি বলে বিশ্বাস করতেন না তিনি, বরং তার বিশ্বাস ছিল আমরা আমাদের নিজস্ব শক্তিতেই ঈশ্বরের দিকে উত্থিত হব। আসল কথা হচ্ছে অরিগেন ও ক্লিমেন্ট তাদের ক্রিশ্চান-প্লেটোনিজম শিক্ষা দেওয়ার সময় কোনও আনুষ্ঠানিক মতবাদ ছিল না। ঈশ্বর জগৎ সৃষ্টি করেছেন কিনা কিংবা মানুষ কীভাবে স্বর্গীয় হতে পারে নিশ্চিত করে জানত না কেউ। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর অস্থির ঘটনাপ্রবাহ এক যন্ত্রণাদায়ক সংগ্রামের পরেই কেবল অর্থডক্স বিশ্বাসের সংজ্ঞার পথে নিয়ে যাবে।
অরিগেন সম্ভবত তার স্ব-নপুংসীকরণের জন্যে বিখ্যাত হয়ে আছেন। গস্পেলে জেসাস বলেছেন, কেউ কেউ স্বর্গীয় রাজ্যের স্বার্থে নিজেদের পুরুষত্ব বিনষ্ট করেছে। একথা অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করেছেন অরিগেন । প্রাচীন কালের শেষ পাদে পুরুষত্ব বিনষ্টকরণ বেশ চালু একটা ব্যাপার ছিল; অরিগেন অবশ্য নিজের ওপর ছুরি চালিয়ে বসেননি, কিংবা তাঁর এ সিদ্ধান্তটি সেইন্ট জেরোমি (৪৪২-৪২০)-দের মতো কোনও কোনও পশ্চিমা ধর্মতাত্ত্বিকের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়া যৌনতার প্রতি কোনও বিকারগ্রসূত ঘৃণা থেকেও সৃষ্টি হয়নি। বৃটিশ পণ্ডিত পিটার ব্রাউন মত প্রকাশ করেছেন, এটা হয়তো তাঁর মানবীয় অবস্থার অনিশ্চয়তার মতবাদ তুলে ধরার প্রয়াস ছিল, যাকে আত্মা কর্তৃক অচিরেই ছাপিয়ে যাবার কথা। দৃশ্যত, ঈশ্বর যেহেতু নারী বা পুরুষ কোনওটাই নন, তাই স্বর্গীয়করণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় লিঙ্গের মতো অসংখ্য উপাদান পেছনে ফেলে যেতে হবে। যে কালে লম্বা দাড়ি (প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের প্রতীক) দার্শনিকদের বৈশিষ্ট্য ছিল সে যুগে অরিগেনের মসৃণ গাল এবং উচ্চ কণ্ঠস্বর হয়তো বা চমকপ্রদ একটা দৃশ্য ছিল।
আলেকজান্দ্রিয়ায় অরিগেনের পুরোনো শিক্ষক অমোনিয়াম সাক্কাসের কাছে শিক্ষা নিয়েছিলেন প্রটিনাস (২০৫-২৭০) এবং পরে ভারতে আসার সুযোগ পাওয়ার আশায় রোমান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ভারতে পড়াশোনা করতে উদগীব ছিলেন তিনি। দুর্ভাগ্যক্রমে এই অভিযানের দুঃখজনক। পরিসমাপ্তি ঘটে, অ্যান্টিওকে পালিয়ে যান প্লটিনাস। পরবর্তী সময়ে রোমে এক উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন দার্শনিক মতবাদের প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। নিজের ব্যাপারে তেমন প্রচারমুখী ছিলেন না তিনি, এমনকি জন্মদিনও পালন করতেন না, তাই তাঁর সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি খুব সামান্য। সেলসাসের মতো প্লটিনাসও খৃস্টধর্মকে সম্পূর্ণ আপত্তিকর বিশ্বাস বিবেচনা করেছিলেন, কিন্তু তারপরেও ঈশ্বরের তিনটি ধর্মের অসংখ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। সুতরাং ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর দর্শনের একটু বিস্তৃত আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্লটিনাসকে একটা জলাধার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে: তিনি গ্রিক ধ্যান ধারণার ৮০০ বছরের মূল ধারা আত্মস্থ করে তাকে এমন এক রূপে প্রকাশ করেছেন যা আমাদের শতাব্দীর টি. এস. এলিয়ট এবং হেনরি বার্গসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও প্রভাবিত করে গেছে। প্লেটোর ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্লটিনাস সত্তাকে উপলব্ধি করার একটা পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু, মহাবিশ্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজায় আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বা জীবনের ভৌত উৎসও ব্যাখ্যা করারও প্রয়াস পাননি। একটা বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যার জন্যে মহাশূন্যের দিকে তাকানোর বদলে প্লটিনাস অনুসারীদের নিজেদের মাঝে আশ্রয় নিতে বলেছেন এবং মননের গভীরে অনুসন্ধান চালানোর তাগিদ দিয়েছেন।
মানুষ একটা ব্যাপারে সচেতন যে তাদের বর্তমান অবস্থায় কোথাও গড়মিল আছে; নিজেকে নিয়ে বা অপরের বেলায় বেকায়দা অবস্থানে আছে বলে মনে হয় তাদের, অন্তস্থ প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগহীন এবং দিশাহারা। দ্বন্দ্ব ও সারল্যের ঘাটতি যেন আমাদের অস্তিত্বের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা ক্রমাগত বহুমাত্রিক ঘটনাবলীকে একসূত্রে গাথতে চাইছি এবং সুশৃঙ্খল সমগ্রে পরিণত করতে চাইছি। আমরা যখন কোনও ব্যক্তির দিকে চোখ ফেরাই একটা পা, একটা হাত, তারপর আরেকটা হাত, মাথা, এভাবে দেখি না, বরং আপনাআপনি এসব উপাদানকে একজন পরিপূর্ণ মানুষের মাঝে সংগঠিত করি। একতার জন্যে এই আকাক্ষা আমাদের মানসিক কাজের ধারায় মৌলিক বিষয়। আমাদের অবশ্যই, পুঁটিনাসের বিশ্বাস অনুযায়ী, বস্তুনিচয়ের মূলসুরের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বাস্তবতার অন্তর্নিহিত সূত্র আবিষ্কারের জন্যে আত্মাকে অবশ্যই প্লেটোর পরামর্শ অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে হবে, পরিশুদ্ধতার একটা পর্যায় অতিক্রম করতে হবে এবং ধ্যানে (থিয়োরিয়া) মগ্ন হতে হবে, বিশ্বজগৎ ছাড়িয়ে, অনুভবের জগৎ পার হয়ে এমনকি বুদ্ধি বা মননের সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে উঠে বস্তুর বা সত্তার অন্তস্থল দেখার জন্যে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। তবে এটা আমাদের বস্তুর কোনও সত্তা অভিমুখে উত্তরণ নয় বরং মনের গহীন গভীরে ডুব দেওয়া। একে বলা যায় অভ্যন্তরে আরোহন।
