ক্লিমেন্টের ধর্মতত্ত্ব জটিল প্রশ্নের জবাব দেয়নি। একজন সাধারণ মানুষ কী করে লগোস বা স্বর্গীয় কারণ হয়ে থাকতে পারে? জেসাস স্বর্গীয় ছিলেন বলে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে? লগোস ও ‘ঈশ্বর পুত্র’ কী একই আর হেলেনিক বিশ্বের এই ইহুদি উপাধি কী অর্থ প্রকাশ করেছে? একজন যন্ত্রণাবোধহীন ঈশ্বর কী করে জেসাসের মাঝে কষ্ট ভোগ করতে পারেন? ক্রিশ্চানরা কীভাবে বিশ্বাস করে যে তিনি স্বর্গীয় সত্তা ছিলেন, আবার একই সময়ে জোর দিয়ে বলে যে ঈশ্বর মাত্র একজন? তৃতীয় শতাব্দীতে ক্রিশ্চানরা এসব প্রশ্নের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করে। শতাব্দীর প্রথম বছরগুলোয় রোমে সাবেলিয়াস নামে প্রায় অখ্যাত এক ব্যক্তি মত প্রকাশ করেন যে, বাইবেলিয় পরিভাষার ‘পিতা, ‘পুত্র’ এবং ‘আত্মাকে’ নাটকের চরিত্র রূপায়নের জন্যে অভিনেতাদের মুখোশ (পারসোনা)-এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। অভিনেতারা নাটকীয় চরিত্র গ্রহণ ও তাদের কণ্ঠস্বর দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে মুখোশের। আশ্রয় নেয়। সুতরাং একক ঈশ্বর এভাবেই জগতের ব্যাপারে বিভিন্ন পারসোনা গ্রহণ করেছিলেন। সাবেলিয়াস কিছু অনুসারী আকৃষ্ট করেছিলেন বটে কিন্তু অধিকাংশ ক্রিশ্চান তার তত্ত্বে বিষণ্ণ সাড়া বোধ করেছে: এখানে বোঝানো হয়েছে যন্ত্রণাবোধের অতীত ঈশ্বর পুত্রের ভূমিকা পালনের সময় কোনও ভাবে কষ্ট সয়েছেন। এ ধারণা একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলে আবিষ্কার করেছে তারা। কিন্তু তারপরেও (২৬০ থেকে ২৭২) পল অভ সামোসাতা বিশপ অভ অ্যান্টিওক পর্যন্ত যখন বললেন যে জেসাস একজন সামান্য মানুষ ছিলেন যার মাঝে মন্দিরে থাকার মতো ঈশ্বরের বাণী এবং প্রজ্ঞার বাস ছিল-~-একেও একই রকম আন-অর্থডক্স বিবেচনা করা হলো। ২৬৪তে অ্যান্টিকের এক সিনদে পলের ধর্মতত্ত্বের নিন্দা করা হয়েছিল, যদিও রানি জেনোরিয়া অভ পালমিরার সমর্থন নিয়ে তিনি তাঁর পদ টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হন। জেসাস স্বর্গীয় ছিলেন, ক্রিশ্চানদের এই বিশ্বাসকে একই রকম জোরাল ঈশ্বর মাত্র একজন বিশ্বাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে উঠছিল।
২০২ সালে বিশপ অভ জেরুজালেমের সেবায় একজন যাজক হতে ক্লিমেন্ট আলেকজান্দ্রিয়া ত্যাগ করে কাতেসেতিকাল শিক্ষালয়ে গেলে তাঁরই এক মেধাবী ছাত্র তরুণ অরিগেন তাঁর স্থলাভিসিক্ত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল আনুমানিক বিশ বছর। তরুণ অরিগেন প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন যে শাহাদাৎ বরণই স্বর্গে যাবার উপায়। চার বছর আগে তাঁর বাবা লেনিদেস (Leonedes) অ্যারিনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন, অরিগেন তাঁর সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছিলেন। অবশ্য পোশাক লুকিয়ে রেখে তাকে বাঁচিয়েছিলেন তাঁর মা। ক্রিশ্চান জীবনের অর্থ জগতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করেছিলেন অরিগেন; কিন্তু পরে এই অবস্থান বদল করে ক্রিশ্চান প্লেটোনিজমের একটা রূপ খাড়া করেন তিনি। মাঝে এক অনতিক্রম্য দূরত্ব দেখার বদলে কেবল শাহাদাৎ বরণের মতো চরম স্থানচ্যুতি দিয়ে মানুষ ও ঈশ্বরকে সম্পর্কিত করা সম্ভব। অরিগেন এমন এক ধর্মতত্ত্বের অবতারণা করেন যেখানে বিশ্বজগতের সঙ্গে ঈশ্বরের ধারাবাহিকতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। তার আধ্যাত্মিকতা ছিল আলো, আশাবাদ ও আনন্দের। একজন ক্রিশ্চান পর্যায়ক্রমে সত্তার বা অস্তিত্বের ধাপ বেয়ে তার স্বাভাবিক উপাদান ও গন্তব্য ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে পারে।
প্লেটোনিস্ট হিসাবে ঈশ্বর ও আত্মার মাঝে সম্পর্কের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন অরিগেন: স্বর্গ সম্পর্কে জ্ঞান মানুষের স্বাভাবিক। বিশেষ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে একে আবার সজাগ ও জাগিয়ে তোলা যায়। সেমেটিক ঐশীগ্রন্থের সঙ্গে নিজ প্লেটোনিক দর্শনের সমন্বয়ের জন্যে বাইবেল পাঠের এক প্রতীকী পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন অরিগেন। এভাবে মেরির গর্ভে ক্রাইস্টের ভার্জিন বার্থকে প্রাথমিকভাবে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া যাবে না, বরং আত্মায় স্বর্গীয় প্রজ্ঞার জন্ম হিসাবে দেখতে হবে। নসটিকদের কিছু ধারণাও গ্রহণ করেছিলেন তিনি। মূলত আধ্যাত্মিক জগতের সকল সত্তা স্বর্গীয় বাণী ও প্রজ্ঞায় লোগোস নিজেকে প্রকাশকারী অতিপ্রাকৃত ঈশ্বরেরই ধ্যান করেছিল। কিন্তু এই নিখুঁত ধ্যানে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে স্বর্গীয় জগৎ থেকে দেহে পতিত হয়, দেহ তাদের পতন থামিয়ে দেয়। অবশ্য সব আশা তিরোহিত হয়ে যায়নি। মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকবে এমন এক দীর্ঘ অবিরাম যাত্রায় আত্মা আবার ঈশ্বরের কাছে যেতে পারবে। এটা ক্রমশঃ দেহের শৃঙ্খল ছাড়িয়ে লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে উঠে খাঁটি আত্মায় পরিণত হবে। ধ্যান (থিয়োরিয়া)-এর মাধ্যমে আত্মা ঈশ্বরের জ্ঞানে (নসিস) সমৃদ্ধ হবে, যা একে পরিবর্তন করে চলবে যতক্ষণ না, প্লেটো স্বয়ং যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, নিজেই স্বর্গীয় রূপ নেয়। ঈশ্বর গভীর রহস্যময়, আমাদের মানবীয় ভাষা বা ধারণা কোনওটাই তাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু আত্মা যেহেতু ঈশ্বরের স্বর্গীয় প্রকৃতির অংশীদার; সুতরাং, ঈশ্বরকে বোঝার ক্ষমতা রয়েছে তার। লোগোসের ধ্যানমগ্ন হওয়া আমাদের স্বভাবজাত, কেননা সকল আধ্যাত্মিক সত্তা (লোগিকোই) আদিতে পরস্পরের সমান ছিল। যখন তাদের পতন ঘটে, কেবল জেসাস ক্রাইস্টের মনই স্বর্গীয় জগতে রয়ে গিয়ে পরম সন্তোষের সঙ্গে ঈশ্বরের বাণী নিয়ে ধ্যান করছিলেন এবং আমাদের নিজস্ব আত্মা ছিল তাঁরই আত্মার সমান। মানুষ জেসাসের ঐশ্বরিকতায় বিশ্বাস একটা স্তর বা পর্যায় মাত্র যা আমাদের যাত্রা পথে সাহায্য করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ঈশ্বরকে সামনা সামনি দেখার পর তা দুয়ে হয়ে উঠবে।
