উত্তর আফ্রিকার ধর্মতাত্ত্বিক তাতুলিয়ান (১৬০-২২০) অবশ্য দেখিয়েছিলেন যে মারসিয়নের ‘ভালো’ ঈশ্বরের সঙ্গে বাইবেলের ঈশ্বরের চেয়ে বরং গ্রিক দর্শনের ঈশ্বরের মিল বেশি। এই অটল উপাস্য যার সঙ্গে ক্রটিযুক্ত এই জগতের কোনও সম্পর্ক নেই, জেসাস ক্রাইস্টের ইহুদি ঈশ্বরের চেয়ে বর্ণিত অটল চালকের (Unmoved Mover)-এর অনেক কাছাকাছি। প্রকৃতপক্ষে, গ্রিকো-রোমান বিশ্বের অনেকেই বাইবেলিয় ঈশ্বরকে ভ্রান্তিময়, হিংস্র উপাস্য হিসাবে দেখেছে, যার উপাসনা প্রাপ্তির যোগ্যতা নেই। ১৭৮ সালের দিকে পৌত্তলিক দার্শনিক সেলসাস ক্রিশ্চানদের বিরুদ্ধে ঈশ্বর সম্পর্কে সংকীর্ণ আঞ্চলিক ধারণা পোষণ করার অভিযোগ এনেছিলেন। ক্রিশ্চানদের নিজস্ব বিশেষ প্রত্যাদেশের দাবি করার ব্যাপারটা তাঁকে হতবাক করেছিল: ঈশ্বর সকল মানুষের কাছেই সুলভ অথচ ক্রিশ্চানরা ছোট ছোট দলে জড়ো হয়ে ঘোষণা দেয়: ঈশ্বর এমনকি কেবল আমাদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার জন্যে গোটা জগৎ, স্বর্গের সঞ্চালন পরিত্যাগ করেছেন, অগ্রাহ্য করেছেন বিশাল পৃথিবীকে।[৪০] রোমান কতৃপক্ষের হাতে নির্যাতিত হওয়ার সময় ক্রিশ্চানদের ধারণা রোমানদের বিশ্বাসের প্রতি ব্যাপক আক্রমণসূচক ছিল বলে তাদের বিরুদ্ধে নাস্তিক্যবাদের অভিযোগ আনা হয়েছিল। প্রচলিত দেবতাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্রিস্টানরা রাষ্ট্রের বিপদ ডেকে আনবে এবং নাজুক শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করবে ভেবে মানুষ শঙ্কিত হয়েছিল। খৃস্টধর্মকে সভ্যতার সাফল্যকে অগ্রাহ্যকারী এক বর্বর বিশ্বাস মনে হয়েছিল।
দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ নাগাদ অবশ্য সত্যিকার অর্থে সংস্কৃত কিছু পৌত্তলিক খৃস্টধর্মে দীক্ষা নিতে শুরু করে। তারা গ্রিকো-রোমান আদর্শের সঙ্গে বাইবেলের সেমেটিক ঈশ্বরকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এদের মাঝে প্রথম ছিলেন ক্লিমেন্ট অভ আলেকজান্দ্রিয়া (১৫০-২১৫), তিনি হয়তো ধর্মান্তরের আগে এথেন্সে দর্শন পাঠ করেছিলেন। ইয়াহ্ওয়েহ্ ও গ্রিক দার্শনিকদের ঈশ্বর যে একই, এব্যাপারে ক্লিমেন্টের মনে কোনও রকম সন্দেহ বা সংশয় ছিল নাঃ প্লেটোকে তিনি অ্যাটিক মোজেস বলেছেন। তবু জেসাস ও সেইন্ট পল উভয়েই হয়তো তার ধর্মতত্ত্বে অবাক মানতেন। প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের ঈশ্বরের মতো ক্লিমেন্টের ঈশ্বর তার অ্যাপাথিয়া দিয়ে বৈশিষ্ট্যায়িত হয়েছেন: তিনি সম্পূর্ণ আবেগ কষ্টভোগ বা পরিবর্তনে অক্ষম। স্বয়ং ঈশ্বরের স্থিরতা ও নিস্পৃহতার অনুকরণ করার মাধ্যমে ক্রিশ্চানরা স্বর্গীয় জীবনে অংশ নিতে পারে। ক্লিমেন্ট জীবন যাপনের একটা নিয়ম প্রণয়ন করেছিলেন আশ্চর্যজনকভাবে যা র্যাবাইদের প্রণীত আচরণবিধির অনুরূপ, পার্থক্য একটাই স্টয়িক আদর্শের সঙ্গে এর মিল ছিল অনেক বেশি। একজন ক্রিশ্চানকে। জীবনের সব পর্যায়ে ঈশ্বরের অচঞ্চলতার অনুকরণ করতে হবে: তাকে অবশ্যই ঠিক হয়ে বসতে হবে, শান্তভাবে কথা বলতে হবে, শরীর কাঁপানো অট্টহাসি থেকে বিরত থাকতে হবে, এমনকি টেকুরও তুলতে হবে ধীরে। শান্ত থাকার এই অধ্যাবসায়ী চর্চার ভেতর দিয়ে ক্রিশ্চানরা অন্তর্গত বিপুল শান্তি সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠবে, যা আসলে তাদের মাঝে খোদিত ঈশ্বরেরই ইমেজ। ঈশ্বর। ও মানুষের মাঝে কোনও দূরত্ব নেই। ক্রিশ্চানরা একবার স্বর্গীয় জগতের উপযোগি হয়ে উঠলে তারা দেখবে এক স্বর্গীয় সঙ্গী আমাদের সঙ্গে একই ঘরে বাস করছে, টেবিলে বসছে, আমাদের জীবনের সকল নৈতিক প্রয়াসে অংশ নিচ্ছে। [৪১]
তারপরেও ক্লিমেন্ট বিশ্বাস করতেন জেসাসই ঈশ্বর ছিলেন। জীবিত ঈশ্বর, যিনি কষ্ট সয়েছেন এবং উপাসিত হচ্ছেন।[৪২] তিনিই ‘তাদের পা ধুইয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন বিশ্বজগতের প্রভু ও নিরহঙ্কার ঈশ্বর’[৪৩] ক্রিশ্চানরা ক্রাইস্টের অনুকরণ করলে তারাও স্বর্গীয়, অপাপবিদ্ধ ও যন্ত্রণাবোধহীন উপাস্যে পরিণত হবে। প্রকৃতই ক্রাইস্ট স্বর্গীয় লোগোস ছিলেন যিনি মানব রূপ গ্রহণ করেছেন যাতে তোমরা একজন মানুষের কাছ থেকে ঈশ্বরে পরিণত হওয়ার উপায় শিখতে পার।[৪৪] পশ্চিমে বিশপ অভ লিয়ন্স ইরেনিয়াস (১৩০-২০০) একই ধরনের মতবাদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। জেসাস ছিলেন স্বর্গীয় কারণ লোগোসের অবতার। তিনি মানব রূপ নেওয়ার পর মানুষের উন্নতির প্রত্যেকটা স্তরকে পবিত্র করেছেন এবং ক্রিশ্চানদের জন্যে আদর্শে পরিণত হয়েছেন। একজন অভিনেতা যেভাবে তার অভিনীত চরিত্রটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় বলে বিশ্বাস করা হয়, তাদেরও ঠিক সেভাবে তার অনুকরণ করতে হবে; তাহলেই তাদের মানবীয় সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে।[৪৫] ক্লিমেন্ট এবং ইবেনিয়াস তাদের নিজস্ব সময় ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহের সঙ্গে ইহুদি ঈশ্বরকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছিলেন। যদিও পয়গম্বরদের ঈশ্বরের-যার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তার করুণরস (Pathos) এবং আক্রম্যতা (Vulnerability)-সঙ্গে তেমন মিল ছিল না, তবু ক্লিমেন্টের অ্যাপ্যাথিয়া মতবাদ ঈশ্বর সম্পর্কে ক্রিশ্চানদের ধারণার মৌল বিষয়ে পরিণত হবে। গ্রিক বিশ্বে আবেগ ও পরিবর্তনের চক্র হতে ঊর্ধ্বে উঠে অতিমানবীয় স্থৈর্যের আকাক্ষা করেছে মানুষ। অন্তর্গত বৈপরীত্য সত্ত্বেও এই আদর্শ টিকে গেছে।
