একটা বিপর্যয়-এক আদিম পতনের ঘটনা ঘটে গিয়েছিল নসটিকরা যাকে নানাভাবে বর্ণনা করেছে। কেউ বলেছে সোফিয়া প্রেজ্ঞতা অগম্য গডহেড সম্পর্কে এক নিষিদ্ধ জ্ঞামের আকাভক্ষা করায় আশীর্বাদ বঞ্চিত হয়। তার মাত্রাছাড়া অনুমানের কারণে প্লেরোমা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পতিত হয় সে এবং তারই কষ্ট ও দুর্দশা বস্তুজগৎ গঠন করে। নির্বাসিত অবস্থায় দিশাহারা সোফিয়া স্বর্গীয় উৎসে ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সৃষ্টিজগতে ঘুরে বেড়িয়েছে। প্রাচ্য ও পৌত্তলিকদের ধারণার মিশেল এই বিশ্বাস নসটিকদের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করে যে, আমাদের বিশ্ব কোনওভাবে স্বর্গের বিকৃতি; অজ্ঞতা এবং স্থানচ্যুতি থেকে যার সৃষ্টি। অন্য নসটিকরা শিক্ষা দিয়েছে যে ঈশ্বর’ বস্তুজগৎ সৃষ্টি করেননি, কেননা মৌল বস্তুর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক ছিল না। এটা কোনও এক ঈয়নের কাজ, যাকে তারা দোমিনেশন্স (Dominations) বা স্রষ্টা আখ্যায়িত করেছে। ঈশ্বরের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে প্লেরোমার কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠেন ইনি। পরিণতিতে তাঁর পতন ঘটে এবং বিদ্রোহের প্রকাশ হিসাবে বিশ্ব সৃষ্টি করেন। ভ্যালেন্তিনাস যেমন ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, জ্ঞানবিহীন থেকেই স্বর্গমণ্ডলী তৈরি করেছেন; মানুষের জ্ঞান ছাড়াই মানুষকে ছাড়াই আকার দিয়েছেন; পৃথিবীকে না বুঝেই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।[৩৫] কিন্তু অন্য এক ঈয়ন লোগোস উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছিলেন এবং নারী ও পুরুষকে আবার ঈশ্বরের কাছে প্রত্যাবর্তনের পথ বাতলে দিতে জেসাসের দৈহিক রূপ ধরে পৃথিবীতে নেমেছেন। শেষ পর্যন্ত এধরনের খৃস্টধর্ম দমিত হবে, কিন্তু আমরা দেখব, বহু শতাব্দী পরে ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমরা আবার এ ধরনের মিথের দ্বারস্থ হচ্ছে, কারণ এটা অর্থডক্স ধর্মতত্ত্বের চেয়ে অনেক নির্ভুলভাবে তাদের ঈশ্বর সংক্রান্ত ধর্মীয় বোধ বা অনুভূতি প্রকাশ। করেছে।
এসব মিথ কখনওই সৃষ্টি ও মুক্তিলাভের আক্ষরিক বিবরণ হিসাবে বোঝানো হয়নি, স্রেফ অন্তর্গত সত্যের এক প্রতীকী প্রকাশ ছিল এগুলো। ‘ঈশ্বর’ এবং ‘প্লেরোমা’ ‘মহাশূন্যের কোনও বাহ্যিক বাস্তবতা নন বরং অন্তরে এর অস্তিত্ব অনুসন্ধান করতে হয়:
ঈশ্বর, সৃষ্টি এবং একই ধরনের অন্যান্য বিষয়ের অনুসন্ধান ত্যাগ কর।
নিজেকে দিয়েই শুরু করে তার সন্ধান। জেনে নাও তোমার অন্তরে কে সবকিছু তার বিষয় করে নিচ্ছে, আর বলছে, “আমার ঈশ্বর, আমার মন, আমার চিন্তা, আমার আত্মা, আমার দেহ। দুঃখ, আনন্দ, প্রেম আর ঘৃণার উৎস কোথায় জান। শেখ কীভাবে ইচ্ছা ছাড়াই কেউ দেখে, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও ভালোবাসে গভীরভাবে। এসব অনুসন্ধান কর, নিজের মাঝেই তাঁকে পাবে। [৩৬]
প্লেরোমা আত্মার একটা মানচিত্র তুলে ধরেছে। কোথায় খুঁজতে হবে তা। নসটিকের জানা থাকলে এমনকি এই অন্ধকার জগতেও স্বর্গীয় আলো অনুভব। করা সম্ভব: সোফিয়া কিংবা দেমিয়ার্জের (Demiurge) আদি পতনের সময় স্বর্গীয় আলোকচ্ছটাও প্লেরোমা থেকে ছিটকে বেরিয়ে বস্তুর মাঝে আটকা পড়ে গিয়েছে। নসটিক তার আপন আত্মার মাঝে স্বর্গীয় ছটার সন্ধান পেতে পারে, নিজের মাঝে অবস্থানরত স্বর্গীয় উপাদান সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারে, যা তাকে গন্তব্য দেখিয়ে দেবে।
নসটিকরা দেখিয়েছে যে, খৃস্টধর্মে নবদীক্ষিতদের অনেকেই ইহুদিবাদ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঈশ্বর সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণায় সন্তুষ্ট ছিল না। তারা একজন দয়াময় উপাস্যের সৃষ্টি ‘ভালো’ হিসাবে পায়নি। একই ধরনের দ্বৈতবাদ এবং স্থানচ্যুতি মারসিয়নের (১০০-১৬৫) মতবাদকে বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল। রোমে প্রতিদ্বন্দ্বী গির্জা প্রতিষ্ঠা করে প্রচুর অনুসারী পেয়েছিলেন মারসিয়ন। জেসাস বলেছিলেন, একটি ভালো গাছ ভালো ফলের জন্ম দেয়:[৩৭] পৃথিবী যেখানে মন্দ আর বেদনায় স্পষ্টভাবে পরিপূর্ণ সেখানে একজন ভালো ঈশ্বরের সৃষ্টি হয় কী করে? ইহুদি ধর্মগ্রন্থও মারসিয়নকে আতঙ্কিত করেছিল, যেখানে ন্যায়বিচারের উন্মাদনায় গোটা একটা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্নকারী রুক্ষ কঠোর ঈশ্বরের বর্ণনা রয়েছে। তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে যুদ্ধের জন্যে উদগ্রীব’ ইহুদি-ঈশ্বরই ‘তার কর্মকাণ্ডে অস্থির এবং স্ববিরোধী’[৩৮] পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু জেসাস দেখিয়েছেন যে, আরেকজন ঈশ্বর ছিলেন ইহুদি ধর্মগ্রন্থে যার কথা কখনও উল্লেখ করা হয়নি। দ্বিতীয় এই ঈশ্বর ‘প্রসন্ন, কোমল আর স্রেফ ভালো এবং অনন্যসাধারণ।’[৩৯] তিনি পৃথিবীর বিচারক সম’ স্রষ্টার চেয়ে সম্পূর্ণই ভিন্ন। এই পৃথিবী যেহেতু তাঁর সৃষ্টি নয়, সুতরাং আমাদের উচিত তাঁকে ত্যাগ করা, কেননা এটা সেই দয়াময় উপাস্য সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানাতে পারে না; আমাদের ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট প্রত্যাখ্যান করা উচিৎ, কেবল জেসাসের চেতনা বহনকারী নিউ টেস্টামেন্টের পুস্তকগুলোর দিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত। মারসিয়নের শিক্ষার জনপ্রিয়তা দেখায় তিনি এক সাধারণ উদ্বেগের জবাব যুগিয়েছিলেন। এক সময় এমনও মনে হয়েছিল যে তিনি বুঝি ভিন্ন চার্চের প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন। ক্রিশ্চানদের অভিজ্ঞতার এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হাত দিয়েছিলেন তিনি; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ক্রিশ্চানরা বস্তুজগতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা বোধ করেছে, এবং এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক আছে যারা জানে না হিব্রু ঈশ্বর-এর কী অর্থ করা যায়।
