অবশ্য দ্বিতীয় শতাব্দীতে খৃস্টধর্ম গ্রহণকারী কিছু সংখ্যক পৌত্তলিক তাদের ধর্মটি ঐতিহ্যের ধ্বংসাত্মক কোনও লঙ্ঘন নয় বোঝাতে অবিশ্বাসী পড়শীদের নিকটবর্তী হওয়ার প্রয়াস পায়; এসব অ্যাপোলোজিস্টের অন্যতম প্রধান ছিলেন জাস্টিন অভ সিসেরা (১০০-১৬৫)। ইনি ধর্মের জন্যে শাহাদাৎ বরণ করেছিলেন। অর্থের সন্ধানে তাঁর অস্থিরতার মাঝে আমরা সেসময়ের আধাত্মিক উৎকণ্ঠার ধারণা পাই। জাস্টিন তেমন গভীর বা মেধাবী চিন্তাবিদ ছিলেন না। খৃস্টধর্মে দীক্ষা নেওয়ার আগে তিনি স্টয়িকদের অনুগামী ভবঘুরে দার্শনিক ও পিথাগোরিয়ান ছিলেন, কিন্তু তাদের পদ্ধতির মূল কথা বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন তিনি। দর্শনের প্রয়োজনীয় মেজাজ মেধার অভাব ছিল তার, কিন্তু কাল্টের উপাসনা ও আচার-আচরণের অতীত কিছু যেন প্রয়োজন ছিল। খৃস্টধর্মে তিনি তার সমাধান খুঁজে পান। তাঁর দুই ‘অ্যাপোলজিয়ায় (১৫০ এবং ১৫৫) তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ক্রিশ্চানরা স্রেফ প্লেটোকে অনুসরণ করছে, যিনি ঈশ্বর মাত্র একজন বলে উল্লেখ করে গেছেন। গ্রিক দার্শনিকগণ এবং ইহুদি পয়গম্বরদের সকলেই ক্রাইস্টের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন-একটা যুক্তি যা তাঁর আমলের পৌত্তলিকদের প্রভাবিত করে থাকবে, কেননা ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি নতুন আগ্রহ জন্ম নিয়েছিল তখন। তিনি আরও যুক্তি দেখিয়েছেন যে, জেসাস ছিলেন লোগোস বা স্বর্গীয় কারণের মানবরূপ, স্টয়িকরা যাঁকে কসমসের শৃঙ্খলার মাঝে দেখতে পেয়েছে গোটা ইতিহাস জুড়ে লোগোস বিশ্বে ক্রিয়াশীল ছিলেন, গ্রিক এবং হিব্রুদের সমানভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি অবশ্য এই উন্নত ধরনের ধারণাটির কোনও ব্যাখ্যা দেননিঃ একজন মানব সন্তান কী করে লোগোসের অবতার হতে পারেন, লোগোসই কি বাইবেলের প্রতীক বাণী বা প্রজ্ঞা? একক ঈশ্বরের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী ছিল?
অন্য ক্রিশ্চানরা আঁচ-অনুমানের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয় বরং গভীর উদ্বেগকে প্রশমিত করার স্বার্থে আরও উগ্র ধর্মতত্ত্ব গড়ে তুলছিল। বিশেষ করে নসটিকোয়রা (জ্ঞানীগণ) স্বর্গীয় জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দর্শন ছেড়ে মিথলজির শরণাপন্ন হয়েছিল। তাদের মিথসমূহ ঈশ্বর এবং স্বর্গ সম্পর্কে অজ্ঞতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, যাকে দুর্ভোগ ও গ্লানির উৎস হিসাবে অনুভব করেছিল তারা। ১৩০ থেকে ২৬০ সাল সময় কালে আলেকজান্দ্রিয়ায় শিক্ষা দান করেছিলেন বাসিলিদেস ও তার সমসাময়িক ভ্যালেন্তিনাসরোমে শিক্ষা দানের জন্যে মিশর ত্যাগ করেছিলেন তিনি-এরা দুজনই প্রচুর অনুসারী পেয়েছেন এবং দেখিয়েছেন যে, খৃস্টধর্ম গ্রহণকারী অনেকের মাঝেই দিশাহারা, উনুল এবং প্রবলভাবে স্থানচ্যুতির অনুভূতি ক্রিয়াশীল ছিল।
অতি দুর্বোধ্য এক সত্তার কথা বলতে শুরু করেছিল নস্টিকোয়রা, তারা এর নাম দিয়েছিল গডহেড-যেহেতু এটাই আমরা যে নিম্নতর সত্তাকে “ঈশ্বর’ বলি তাঁর উৎস। এর সম্পর্কে আমাদের বলার মতো কিছুই নাই, কেননা আমাদের মনের সীমিত সাধ্যের বাইরে এর অবস্থান। ভ্যালেন্তিনাস গডহেডের। ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এভাবে:
নিখুঁত এবং পূর্বাহ্নেই বিদ্যমান…অদৃশ্য ও নামহীন শূন্যতায় বাসরত: এটাই সূচনার শুরু এবং পূর্বপুরুষ এবং গভীরতা। এটা আধেয় এবং অদৃশ্য, চিরন্তন এবং অজাত, অনন্তকাল থেকে এটা শান্ত এবং গভীর নিঃসঙ্গ। এর সঙ্গে ছিল ভাবনা, যাকে মহিমা আর নৈঃশব্দ্যও বলা হয়। [৩৩]
মানুষ সবসময় এই পরম বা অ্যাবসোলিউট সম্পর্কে বহু জল্পনা-কল্পনা করেছে, কিন্তু তাদের কোনও ব্যাখ্যাই পর্যাপ্ত ছিল না। গডহেডকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব, যা ‘ভালো’ও না আবার মন্দ’ও না; এমনকি একে ‘অস্তিত্ববান’ও বলা যাবে না। বাসিলিদেস শিক্ষা দিয়েছেন যে, একেবারে আদিতে কেবল ঈশ্বর নন, কেবল গডহেডই ছিলেন, সঠিক করে বলতে গেলে যা আসলে কিছুই না, কারণ আমাদের বোধগম্য অর্থে এর কোনও অস্তিত্ব ছিল না। [৩৪]
কিন্তু এই ‘কিছু না’ নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছা পোষণ করলেন, তিনি আর গভীর এবং নৈঃশব্দ্যে একাকী অবস্থান করে সন্তোষ বোধ করছিলেন না। তখন এর অতলান্ত গভীরতায় এক অন্তস্থ আন্দোলন ঘটে যার ফলে প্রাচীন পৌত্তলিক মিথলজিতে বর্ণিত উৎসারণগুলোর মতো ধারাবাহিক উৎসারণের সৃষ্টি হয়। এইসব উৎসারণের প্রথমটি ছিলেন ‘ঈশ্বর’, যাকে আমরা চিনি এবং যার কাছে আমরা প্রার্থনা করি। কিন্তু এমনকি ঈশ্বরও আমাদের অগম্য ছিলেন এবং আরও বিশদ হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। ফলস্বরূপ ঈশ্বর হতে জোড়ায় জোড়ায় আরও উৎসারণ ঘটতে থাকল, যার প্রত্যেকটি তার স্বর্গীয় গুণাবলীর প্রকাশ করেছে। ঈশ্বর লিঙ্গভেদের উর্ধ্বে, এনুমা এলিশের মতো, কিন্তু উৎসারিত প্রত্যেক জোড়ার একটি পুরুষ এবং অপরটি নারী-অধিকতর প্রথাগত একেশ্বরবাদের পৌরুষ বাচক পরিচয় দূর করার একটা প্রয়াস ছিল এটা। উৎসারিত প্রত্যেকটি জোড়া দুর্বলতর ও ক্ষীণকায় হয়ে ওঠে, কেননা এগুলো স্বর্গীয় উৎস হতে ক্রমশঃ দূরে সরে যাচ্ছিল। অবশেষে যখন এরকম ৩০টি উৎসারণ (বা ঈয়ন: যুগ) আবির্ভূত হওয়ার পর প্রক্রিয়াটির থেমে যায় এবং স্বর্গীয় জগৎ প্লেয়োমা (Pleroma) গঠিত হয়। নসটিকরা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য এক সৃষ্টিতত্ত্বের প্রস্তাবনা রাখছিল না, কেননা সবাই বিশ্বাস করত যে সৃষ্টি এধরনের যুগ, অপদেবতা ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় পরিপূর্ণ। সেইন্ট পল সিংহাসন, প্রাচীর (Dominations), সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছিলেন, অন্যদিকে দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন যে, এইসব অদৃশ্য শক্তি ছিল প্রাচীন দেবতা, এগুলোকে তারা মানুষ এবং দ্য ওয়ান-এর মাঝে মধ্যস্থতাকারীতে পরিবর্তন করেছেন।
