ধর্ম নয়, জ্ঞান ও আলোকনের জন্যে শিক্ষিত পৌত্তলিকরা দর্শমের দ্বারস্থ হতো। তাদের সাধু-সন্যাসি এবং জ্ঞানীরা হলেন প্রাচীনকালের প্লেটো, পিথাগোরাস এবং এপিকতেতাসের মতো দার্শনিকগণ। তাদের এমনকি ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে দেখত তারা: উদাহরণ স্বরূপ, প্লেটোকে দেবতা অ্যাপোলো-পুত্র মনে করা হয়েছে। দার্শনিকগণ ধর্মের প্রতি শীতল শ্রদ্ধা বজায় রেখেছেন, তবে একে নিজেদের কর্মকাণ্ড হতে আবশ্যকীয়ভাবে আলাদা হিসাবেই দেখতেন। শ্বেত-প্রাসাদে অবস্থানকারী কেতাবী পণ্ডিত ছিলেন না ওঁরা তাঁদের একটা দায়িত্ব বা মিশন ছিল, তারা নিজস্ব মতবাদের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করে সমসাময়িকদের আত্মার মুক্তি ঘটাতে ব্যাকুল ছিলেন। সক্রেটিস এবং প্লেটো দুজনই তাদের দর্শনের ব্যাপারে ধার্মিক ছিলেন, তারা বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক গবেষণার ফলে বিশ্বজগতের মহিমা অবলোকন করার এক দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে আবিষ্কার করেছিলেন। সিই প্রথম শতাব্দী নাগাদ তাই বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে, অনুপ্রাণিত করার মতো আদর্শের খোঁজে ও নৈতিক প্রেরণার জন্যে তাদের শরণাপন্ন হয়। খৃস্টধর্মকে বর্বরোচিত বিশ্বাস বলে মনে হয়েছে। ক্রিশ্চান ঈশ্বরকে এক ভয়ঙ্কর আদিম উপাস্যের মতো মনে হয়েছে যিনি মানুষের জীবনে অযৌক্তিকভাবে বারবার হস্তক্ষেপে করে চলেন: তার সঙ্গে অ্যারিস্টটলদের মতো দার্শনিকদের সুদূরবর্তী পরিবর্তন রহিত ঈশ্বরের কোনওই মিল নেই। প্লেটো বা আলেকজান্দার দা গ্রেটের মতো মাপের মানুষকে ঈশ্বরের পুত্র ভাবা এক কথা, কিন্তু রোমান সাম্রাজ্যের কোনও এক অচেনা-অজানা কোণে অসম্মানজনক মৃত্যু বরণকারী এক সামান্য ইহুদিকে ঈশ্বর-পুত্র কল্পনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রাচীন যুগের শেষভাগে প্লেটোর মতবাদ সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শন ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর নব্য প্লেটোনিস্টরা নৈতিকতা ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ প্লেটোর প্রতি নয়, বরং অতিন্দ্রীয়বাদী প্লেটোর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তার শিক্ষা দার্শনিককে তাঁর প্রকৃত সত্তাকে দেহের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে আপন সত্তাকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করতে এবং স্বর্গীয় জগতে আরোহণে সক্ষম। করতে ইহুদিদের উপকারে আসত। এক চমৎকার ব্যবস্থা ছিল এটা, ধারাবাহিকতা ও সমরূপতার ইমেজ হিসেবেই সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যবহার করেছে। সকল সত্তার ধারায় একেবারে চূড়ায় অবস্থানকারী সময়ের পরিবর্তনের আঁচড়ের বাইরে আপন চিন্তায় মগ্ন দ্য ওয়ান। প্রকৃত সত্তার পরিণতি হিসাবে দ্য ওয়ান হতেই সবকিছু অস্তিত্ব পেয়েছে: অনন্ত আকৃতিসমূহ দ্য ওয়ান হতে উৎসারিত হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে নিজস্ব বলয়ে সূর্য, নক্ষত্ররাজি এবং চাঁদকে সক্রিয় করেছে; সবশেষে দেবতাগণ যাদের এখন দ্য ওয়ানের দেবসভার মন্ত্রণা দাতা হিসাবে দেখা হচ্ছে, মানুষের পার্থিব জগতে স্বর্গীয় প্রভাব প্রেরণ করেছেন। প্লেটোনিস্টদের কোনও বর্বর উপাস্যের প্রয়োজন হয়নি যিনি অকস্মাৎ বিশ্ব সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা মানুষের একটা ছোট দলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের জন্যে প্রতিষ্ঠিত স্তরকে অগ্রাহ্য করেছেন। কোনও ক্রুশবিদ্ধ মেসায়াহর মাধ্যমে ভীতিদায়ক মুক্তির প্রয়োজন ছিল না তার। সর্বপ্রাণে জীবনদানকারী ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে একজন দার্শনিক তার নিজস্ব যৌক্তিক শৃঙ্খলিত উপায়েই স্বর্গীয় জগতে আরোহণ করতে পারেন।
ক্রিশ্চানরা কীভাবে পৌত্তলিক সমাজে তাদের ধর্মবিশ্বাসের ব্যাখ্যা দিয়েছিল? একে দুটো আসনের মধ্যবর্তী একটা অবস্থা বলে ঠেকেছে, রোমান অর্থে ধর্মও মনে হয়নি, আবার দর্শনও নয়। তার ওপর, ক্রিশ্চানরা তাদের ‘বিশ্বাসের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে থাকবে এবং সম্ভবত নিজেদের আলাদা বিশেষ ধরনের চিন্তাধারা গড়ে তোলার ব্যাপারে সচেতন ছিল না; এদিক দিয়ে পৌত্তলিক পড়শীদের সঙ্গে মিল ছিল তাদের। তাদের ধর্মের কোনও সুসমন্বিত ধর্মতত্ত্ব ছিল না, কিন্তু একে অঙ্গীকারের সযত্ন। বিকাশ হিসাবে অনেক সঠিকভাবে বর্ণনা করা যেত। তারা তাদের ‘ক্রীড’ আবৃত্তি করার সময় কতগুলো নির্দিষ্ট প্রস্তাবনায় সম্মতি প্রকাশ করত না। উদাহরণ স্বরূপ, ক্রীড়ার শব্দটি মনে হয় কোর দেয়ার (Cor Dare) থেকে এসেছে: যার অর্থ হৃদয় দেওয়া। যখন তারা ক্রীড়ো (Credo) শব্দটি উচ্চারণ করত (কিংবা গ্রিক ভাষার পিস্তেনো), তখন মননশীলতার চেয়ে বরং আবেগের প্রকাশ ঘটত। এভাবে সিলিসিয়ার বিশপ অভ মপসুয়েস্তিয়া থিয়োদর (৩৯২ থেকে ৪২৮) ধর্মান্তরিতদের কাছে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
যখন তুমি ঈশ্বরের সকাশে ‘আমি নিজেকে আবদ্ধ করলাম (Pisteuo) কথাটা উচ্চারণ করো, তোমরা বোঝাও তাকে তোমরা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকবে, কখনও তার সঙ্গে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করবে না, তোমরা তার সঙ্গে থাকবে এবং জীবন কাঠামোকে অন্য যেকোনও কিছুর চেয়ে উচ্চতর মনে। করবে এবং এমনভাবে তোমাদের আচার-আচরণকে গড়ে তুলবে যাতে তা তাঁর নির্দেশাবলীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।[৩২]
পরবর্তীকালের ক্রিশ্চানদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে আরও তত্ত্বীয় বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেবে এবং তারা ধর্মের ইতিহাসে বিরল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের আবেগের জন্ম দেবে। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা দেখেছি, ইহুদিবাদে কোনও সুনির্দিষ্ট অর্থডক্সি ছিল না, বরং ঈশ্বর সম্পর্কিত সকল ধারণা আবিশ্যিকভাবে ব্যক্তিগত বিষয় ছিল। গোড়ার দিকে ক্রিশ্চানরা এই প্রবণতার অংশীদার ছিল।
