প্রথম শতাব্দীতে ক্রিশ্চানরা ইহুদিদের মতোই সম্পর্কিত ভাবনা ও প্রার্থনা অব্যাহত রেখেছিল। তারা র্যাবাইদের মতো যুক্তি দেখিয়েছে। তাদের গির্জাগুলো সিনাগগের মতোই ছিল। আশির দশকে ক্রিশ্চানরা তোরাহ্ অনুসরণে অস্বীকৃতি জানালে সিনাগগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয় তাদের, সেসময় ইহুদিদের সঙ্গে তাদের প্রবল বিরোধ দেখা দিয়েছিল। আমরা দেখেছি যে প্রথম শতাব্দীর গোড়ার দিকের দশকগুলোয় ইহুদিবাদ বহুজনকে ধর্মান্তরিত হতে আকৃষ্ট করেছিল, কিন্তু ৭০-এর পরে ইহুদিরা রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লে ওদের অবস্থানের অবনতি ঘটে। খৃস্টধর্মে গডফিয়ারাবদের পক্ষ ত্যাগ ধর্মান্তরিতদের ব্যাপারে ইহুদিদের সন্দিহান করে তোলে, তারা আর ধর্মান্তরকরণে আগ্রহ বোধ করেনি। পৌত্তলিকরা আগে যেখানে ইহুদিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল, এবার তারা খৃস্টধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ল, কিন্তু এরা ছিল প্রধানত দাস ও নিম্নশ্রেণীর সদস্য। দ্বিতীয় শতাব্দীর একেবারে শেষ দিকেই কেবল উচ্চ শিক্ষিত পৌত্তলিকরা ক্রিশ্চান ধর্ম গ্রহণ করে এবং এক সন্দিহান পৌত্তলিক সমাজের কাছে ধর্মের ব্যাখ্যা তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে ওঠে।
রোমান সাম্রাজ্যে খৃস্টধর্মকে ইহুদিবাদেরই একটা শাখা হিসাবে দেখা হয়েছিল, কিন্তু ক্রিশ্চানরা যখন স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে তারা আর সিনাগগের সদস্য নয়, তখন তাদের মূল ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতির মহাপাপ সংঘঠনকারী ধর্মান্ধদের একটা রিলিজিও’ হিসাবে তীব্র অসন্তোষের সঙ্গে দেখা হলো। রোমানদের রীতিনীতি কঠোরভাবে রক্ষণশীল ছিল: পরিবার প্রধান এবং আদি রীতিনীতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা হতো। প্রগতি’কে প্রায়ই ভবিষ্যতের দিকে নিঃশঙ্ক যাত্রা না ভেবে স্বর্ণযুগে প্রত্যাবর্তন হিসাবে দেখা হতো। অতীতের সঙ্গে ইচ্ছাকৃত সম্পর্ক চ্যুতিকে আমাদের সমাজের মতো সুপ্ত সৃজনশীল হিসাবে দেখা হতো না, আমাদের সামাজে যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। নতুন আবিষ্কারকে বিপজ্জনক ও রাষ্ট্রদ্রোহ হিসাবে দেখা হয়েছে। রোমানরা । ঐতিহ্যের বিধিনিষেধ ছিন্নকারী গণ-আন্দোলনের ব্যাপারে প্রবলভাবে সন্দেহপ্রবণ ছিল। নাগরিকরা যাতে ধর্মীয় হাতুড়ে’দের হাতে না পড়ে সেজন্যে সতর্কতা অবলম্বন করত। অবশ্য তখন সাম্রাজ্য জুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা ও উদ্বেগের আবহ বিরাজ করছিল। এক বিশাল সাম্রাজ্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা প্রাচীন ঈশ্বর বা দেবতাদের যেন তুচ্ছ ও অপর্যাপ্ত করে তুলেছিল। লোকে ভিনদেশী ও অস্বস্তিকর সংস্কৃতির ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছিল। এক নতুন আধ্যাত্মিক সমাধানের সন্ধান করেছিল তারা। প্রাচ্যের কাল্টের আমদানি ঘটেছিল ইউরোপে: রাষ্ট্রের অভিভাবক রোমের প্রথাগত দেবতাদের পাশাপাশি আইসিস ও সিমিলে-এর মতো দেবতাদের উপাসনা চলছিল। সিই প্রথম শতাব্দীতে নতুন রহস্য-ধর্মগুলো নবীশদের নিষ্কৃতি ও পরজগতের জ্ঞান দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এ সবটাই ধর্মীয় উৎসাহের কোনও প্রাচীন বিধানের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি। প্রাচ্যের দেবতারা প্রবল পরিবর্তন বা পরিচিত আচার-নিষ্ঠা ত্যাগের দাবি ওঠাননি বরং তাঁরা ছিলেন নবাগত সন্ন্যাসীর মতো, এক বৃহত্তর জগতের প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি ও বোধ জাগিয়ে তুলেছেন। আপনি যত ইচ্ছা ততগুলো রহস্য কাল্টে যোগ দিতে পারতেন কিন্তু শর্ত একটাই সেখানে প্রাচীন দেবতাদের অসম্মান করতে পারবেন না এবং মোটামুটিভাবে পরিমিতি বোধ বজায় রাখতে হবে, তাহলেই কোনও প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায় রহস্য-ধর্মগুলোকে মেনে নেওয়া হতো এবং তা অঙ্গীভূত হয়ে যেত।
ধর্ম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বা জীবনের অর্থের সন্ধান দেবে, এটা কেউ আশা করেনি। সে ধরনের আলোকনের জন্যে দর্শনের দারস্থ হতো মানুষ। প্রাচীন কালের রোমান সাম্রাজ্যে মানুষ দেবতাদের পূজা বা উপাসনা করত বিপদে সাহায্য কামনা, রাষ্ট্রের জন্যে স্বর্গীয় আশীর্বাদ প্রার্থনা এবং অতীতের সঙ্গে ধারাবাহিকতার নিরাময়মূলক অনুভূতির জন্যে। ধর্ম ছিল ধারণার চেয়ে বরং কাল্ট ও আচারের ব্যাপর; এর ভিত্তি ছিল আবেগ, আদর্শ বা সচেতনভাবে গৃহীত তত্ত্ব নয়। বর্তমানকালেও এটা একেবারে অপরিচিত বিষয় নয়: আমাদের সমাজে অনেকেই আছে যারা ধর্মীয় প্রার্থনা সভায় যোগ দিলেও ধর্মতত্ত্বে আগ্রহী নয়, তারা অতি অদ্ভুত কিছু চায় না, পরিবর্তনের ধারণাকেও অপছন্দ করে। এরা মনে করে প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত আচার-বিধিগুলো তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে এবং একধরনের নিরাপত্তা বোধের যোগান দেয়। সারমন থেকে এরা অসাধারণ ধারণা বেরিয়ে আসার আশা করে না, শাস্ত্রারের পরিবর্তনে অস্বস্তি বোধ করে। মোটামুটি একইভাবে প্রাচীন যুগের শেষ ভাগে বহু পৌত্তলিকই পূর্বপুরুষদের মতো আদি দেবতাদের উপাসনা করতে ভালোবাসত। প্রাচীন আচার-আচরণ তাদের আত্মপরিচয়ের অনুভূতি যোগাত, স্থানীয় ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দিত এবং সবকিছু বরাবরের মতো চলার নিশ্চয়তা বলে মনে হতো। সভ্যতা যেন নাজুক অর্জন ছিল, একে অস্তিত্বের নিরাপত্তা বিধানকারী পৃষ্ঠপোষক দেবতাদের নির্বিচারের উপেক্ষা করে। হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবে না। পূর্বপুরুষদের ধর্ম বিশ্বাস ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে কোনও কাল্ট প্রতিষ্ঠিত হতে দেখতে প্রচ্ছন্নভাবে শঙ্কিতই বোধ করত তারা। সুতরাং, খৃস্টধর্মের উভয় জগতেরই মন্দটুকু ছিল। ইহুদিবাদের মতো শ্রদ্ধাযযাগ্য প্রাচীনত্ব ছিল না এর, আবার আকর্ষণীয় পৌত্তলিকতাবাদের আচার-মালারও-যা সবার দৃষ্টিগ্রাহ্য ও উপভোগ্য ছিল-অভাব ছিল। এটা একটা প্রচ্ছন্ন হুমকিও ছিল, কেননা ক্রিশ্চানরা মাত্র একজন ঈশ্বরের কথা বলেছে, অন্য দেবতাদের আখ্যায়িত করছিল ভ্রান্তি হিসাবে। রোমান জীবনীকার গাইয়ুস সুতোনিয়াস (৭০-১৬০) খৃস্টধর্মকে অযৌক্তিক এবং উৎকেন্দ্রিক আন্দোলন মনে করেছেন, এটা একটি সুপারস্টিশিও নোভা এত্ প্রাভা-’নতুন’ বলেই এটি ‘খারাপ’। [৩১]
