প্রায় চল্লিশ বছর পর সেইন্ট জনের গস্পেলের রচয়িতা (রচনাকাল Ca ১০০) একই ধরনের মত প্রকাশ করেন। সূচনায় তিনি সৃষ্টির নিমিত্ত বাণী ‘শুরু হতেই ঈশ্বরের সঙ্গে’ ছিল বলে বর্ণনা করেছেন: ‘সকলেই তাঁহার দ্বারা হইয়াছিল, যাহা হইয়াছে, তাহার কিছুই তারা ব্যতিরেকে হয় নাই।’[২৪] লেখক ফিলোর মতো একই অর্থ বোঝাতে লোগোস শব্দটি ব্যবহার করছিলেন নাঃ তাঁকে হেলেনাইজড ইহুদিবাদের চেয়ে বরং প্যালেস্তাইনি ইহুদিবাদের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত বলে মনে হয়। এই সময়ে লিপিবদ্ধ তারগামস (Targums) নামে পরিচিত হিব্রু ঐশীগ্রন্থের আরামিক অনুবাদে মেমরা (বাণী) শব্দটি পৃথিবীতে ঈশ্বরের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতাপ, ‘পবিত্র আত্মা’ ও ‘শেকিনাহ্’র মতো অন্যান্য কারিগরি পরিভাষার মতোই ছিল এর অর্থ যা পৃথিবীতে ঈশ্বরের উপস্থিতি এবং স্বয়ং ঈশ্বরের দুর্বোধ্য সত্তার পার্থক্যের উপর জোর দেয়। স্বর্গীয় প্রজ্ঞার মতো, বাণী’ ঈশ্বরের সৃষ্টির আদি পরিকল্পনাকে প্রতীকায়িত করে। পল এবং জন জেসাসের পূর্বজীবন থাকার কথা বলার সময় আসলে এটা বোঝাতে চাননি যে তিনি পরবর্তীকালে ত্রিত্ববাদী ধারণা অনুযায়ী দ্বিতীয় স্বর্গীয় ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা বুঝিয়েছেন, জেসাস মানবীয় এবং ব্যক্তিক অস্তিত্বের উর্ধ্বে উঠেছিলেন। যেহেতু তাঁর প্রদর্শিত ‘ক্ষমতা’ ও ‘প্রজ্ঞা’ ঈশ্বর থেকে গৃহীত কর্মকাণ্ড, তাই কোনওভাবে ‘যাত্রা হইতে তিনি ছিলেন’[২৫] বলে তা প্রকাশ করেছিলেন।
কঠোর ইহুদি পটভূমিতে এইসব ধারণা বোধগম্য ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ের গ্রিক পটভূমির ক্রিশ্চানরা এগুলোকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবে। সিই ১০০ সালের দিকে রচিত অ্যাক্টস অভ দ্য অ্যাপসলস-এ আমরা দেখতে পাই, প্রথম দিকের ক্রিশ্চানদের তখনও ঈশ্বরের ইহুদি ধারণাই ছিল। পেন্টেস্টের ভোজে যখন সিনাই পর্বতে তোরাহ্ অবতীর্ণ হওয়ার বার্ষিকী উদযাপনের উদ্দেশ্যে ডায়াসপোরা থেকে শত শত ইহুদি জেরুজালেমে সমবেত হয়েছিল, তখন জেসাসের সঙ্গীদের ওপর পবিত্র আত্মা অবতরণ করেছিলেন। ‘হঠাৎ আকাশ হইতে প্রচণ্ড বায়ুর বেগের শব্দবৎ একটা শব্দ আসিল…এমন অনেক অগ্নিবৎ জিহ্বা তাহাদের দৃষ্টিগোচর হইল।’[২৬] এই প্রথম ইহুদি ক্রিশ্চানদের সামনে তাদের সমসাময়িক তেন্নাইমদের মতো পবিত্র আত্মা নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন। অবিলম্বে অনুসারীরা দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে ‘পার্থীয়, মাদীয় ও এলমীয় লোক এবং মিসমপতামিয়া, যিহুদিয়া ও কাপ্পাদকিয়া, পন্ত ও আশিয়া, ফরুগিয়া ও পাফুলিয়া, মিসর এবং লুবিয়া দেশস্থ, কুবীনির নিকটবর্তী এই অঞ্চল নিবাসী এবং প্রবাসকারী রোমীয়’[২৭] থেকে আগত ইহুদি ও গডফিয়ারারদের মাঝে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছিলেন। সবিস্ময়ে তারা আবিষ্কার করে যে, অনুসারীরা তাদের নিজস্ব ভাষাতেই প্রচার করছে। পিটার জমায়েতের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে উঠে দাঁড়ানোর পর এই ঘটনাকে ইহুদিদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বলে তুলে ধরেন তিনি। পয়গম্বরগণ ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন, এমন একদিন আসবে যখন ঈশ্বর মানবজাতির ওপর তার আত্মা অবতরণ করাবেন যার ফলে এমনকি নারী ও দাসরাও দিব্যদর্শন পাবে, স্বপ্ন দেখবে।[২৮] সেইদিন মেসিয়ানিক রাজ্যের উদ্বোধন ঘটবে এবং ঈশ্বর তার জাতির সঙ্গে পৃথিবীতে বসবাস করবেন। নাযারেথের জেসাসই যে ঈশ্বর, এ দাবি করেননি পিটার। তিনি ছিলেন অদ্ভুত লক্ষণ ও চিহ্নসমূহ দ্বারা তোমাদের নিকটে ঈশ্বর কর্তৃক প্রমাণিত মনুষ্য: তাহারই দ্বারা ঈশ্বর তোমাদের মধ্যে ঐসকল কাৰ্য্য করিয়াছেন, যেমন তোমরা নিজেই জান। তার নিষ্ঠুর মৃত্যুর পর ঈশ্বর আবার তাঁকে জীবন দান করেছেন এবং ঈশ্বরের দক্ষিণ হস্ত দ্বারা উচ্চীকৃত হওয়াতে তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। পয়গম্বর এবং শ্লোক রচয়িতাগণ সবাই এই ঘটনার আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন; এইভাবে ইস্রায়েলের সমস্ত কুল নিশ্চয়ই জানুক যে, জেসাসই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই মেসায়াহ।[২৯] এই বক্তৃতাটিকে গোড়ার দিকের ক্রিশ্চানদের বার্তা (Kerygma) বলে মনে হয়।
চতুর্থ শতাব্দীর শেষ নাগাদ অ্যাক্টস-এর রচয়িতার উল্লিখিত স্থানগুলোতেই খৃস্টধর্ম শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল; ডায়াসপোরার ইহুদি সিনাগগগুলোতে এর শেকড় ছড়িয়ে পড়ে যা বিপুলসংখ্যক গড়ফিয়ারার বা ধর্মান্তরিতদের আকৃষ্ট করে। পলের পরিমার্জিত বা সংস্কৃত ইহুদিবাদ যেন তাদের বহু দোদুল্যমানতার সমাধান দিয়েছিল। তারাও বিভিন্ন ভাষায় কথা বলেছে বলে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর এবং একটা সুসঙ্গত অবস্থানের অভাব ছিল। ডায়াসপোরার বহু ইহুদি পশুর রক্তে সিক্ত জেরুজালেম-মন্দিরকে আদিম ও বর্বর প্রতিষ্ঠান ভাবতে শুরু করেছিল। জনৈক হেলেনিস্টিক ইহুদি স্তিফেন এর গল্পের ভেতর দিয়ে অ্যাক্টস অভ দ্য অ্যাপসলস এই দৃষ্টিভঙ্গিটি ধরে রেখেছে। এই ব্যক্তি জেসাসের গোত্রে দীক্ষা নিয়েছিল এবং ব্লাসফেমির অভিযোগে তাকে ইহুদিদের শাসক সভা স্যানহেদ্রিন পাথর ছুঁড়ে হত্যা করেছিল। স্তিফেন তার আবেগময় শেষ বক্তব্যে মন্দির ঈশ্বরের প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক অসম্মান বলে দাবি করেছিল, তথাপি তিনি পরাৎপর (Most High), তিনি হস্তনিৰ্মিত গৃহে বাস করেন না।[৩০] মন্দির ধ্বংসের পর ডায়াসপোরার ইহুদিদের কেউ কেউ র্যাবাইদের হাতে বিকশিত তলমুদিয় ইহুদিদের গ্রহণ করেছিল। অন্যারা তাদের খৃস্টধর্মের মাঝে তোরাহ্র অবস্থান এবং ইহুদিবাদের বিশ্বজনীনতা সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজে পেয়েছিল। এটা অবশ্যই গডফিয়ারারদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল, যারা ৬১৩টি মিতযভোত-এর ভার ছাড়াই নব্য ইসরায়েলের পূর্ণ সদস্য হতে পেরেছিল।
