দায়িত্বপ্রাপ্ত ধর্ম সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পল বলেছেন যে, ‘আমাদের পাপের’[১৯] জন্যে জেসাস কষ্ট ভোগ করেছেন এবং প্রাণ দিয়েছেন। এতে বোঝা যায় একেবারে গোড়ার দিকে জেসাসের অনুসারীরা তাঁর মৃত্যুর কেলেঙ্কারীতে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে এবং ঘটনাটি কোনওভাবে আমাদের স্বার্থেই ঘটেছে বলে ব্যাখ্যা করে। নবম অধ্যায়ে আমরা দেখব, সপ্তদশ শতাব্দীতে অন্য ইহুদিরাও আরও এক মেসায়াহর কলঙ্কজনক পরিসমাপ্তির প্রেক্ষিতে একই রকম ব্যাখ্যা খুঁজে পাবে। গোড়ার দিকের ক্রিশ্চানরা মনে করেছে যে কোনও রহস্যময় উপায়ে জেসাস বেঁচে আছেন এবং তার ক্ষমতা এখন তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের মাঝে স্থান পেয়েছে। পলের পত্রাবলী থেকে আমরা জানি যে, গোড়ার দিকের ক্রিশ্চানরা সব ধরনের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল যা হয়তো এক নতুন ধরনের মানবতার ইঙ্গিতবাহী হয়ে থাকবে কেউ কেউ ফেইথ-হীলার-এ পরিণত হয়েছিল, কেউ আবার স্বর্গীয় ভাষায় কথা বলত, অন্যরা ঈশ্বর থেকে প্রাপ্ত বলে বিশ্বাস করা বাণীর প্রচার করত। চার্চের প্রার্থনাগুলো কোলাহলপূর্ণ জাকাল ব্যাপার ছিল, মোটেই বর্তমান কালের প্যারিশ-চার্চের সান্ধ্য উপাসনা সঙ্গীতের মতো রুচিশীল নয়। জেসাসের মৃত্যু কোনওভাবে উপকারে এসেছিল বলেই মনে হয়: এটা এক নতুন ধরনের জীবন এবং এক নতুন সৃষ্টি’ সহজ করে তুলেছিল যা পলের পত্রাবলীর স্থায়ী সুর।[২০]
কুসিফিক্সশন আদমের কোনও ‘আদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত হওয়ার ব্যাপারে অবশ্য বিস্তারিত কোনও মতবাদ ছিল নাঃ আমরা দেখব, চতুর্থ শতাব্দীর আগে এই মতবাদ জন্ম নেয়নি এবং এটা শুধু পশ্চিমেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পল এবং অন্য নিউ টেস্টামেন্ট রচয়িতাগণ কখনওই তাদের নিষ্কৃতি লাভের (Salvation) স্পষ্ট, পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়াস পাননি। তবু ক্রাইস্টের আত্মউৎসর্গ-সূচক মৃত্যু একই সময়ে ভারতে বিকাশ পাওয়া বোধিসত্তার আদর্শের অনুরূপ। বোধিসত্তার মতো ক্রাইস্ট কার্যত মানুষ ও পরম সত্তার মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়েছিলেন, পার্থক্য হচ্ছে, জেসাসই একমাত্র মধ্যস্থতাকারী এবং তার দেওয়া মুক্তি বোধিসত্তাদের মতো ভবিষ্যতের অনাদায়ী অনুপ্রেরণা নয়, বরং তর্কাতীত ব্যাপার। পল জোর দিয়ে বলেছেন জেসাসের ত্যাগ ছিল অনন্য। তিনি যদিও বিশ্বাস করতেন যে অন্যের স্বার্থে তাঁর নিজস্ব ভোগান্তি ছিল মঙ্গলকর, কিন্তু তাঁর স্পষ্ট বিশ্বাস ছিল জেসাসের দুর্ভোগ এবং মৃত্যু সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ের।[২১] এখানে সুপ্ত বিপদ রয়েছে। অসংখ্য বুদ্ধ এবং ছলনাময় ও বৈপরীত্যে পূর্ণ সকল অবতার বিশ্বাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে, পরমসত্তাকে কোনও একটা আকারে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা বা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। খৃস্টধর্মের একক অবতারবাদ বোঝাতে চায় যে, ঈশ্বরের অন্তহীন সত্তা মাত্র একজন মানুষের মাঝে প্রকাশ পেয়েছিল যা তাঁকে একধরনের অপরিপকু পৌত্তলিকতার দিকে ঠেলে দিতে থাকে।
জেসাস জোর দিয়ে বলে গেছেন যে, ঈশ্বরের ‘ক্ষমতা’ কেবল তার একার জন্যে নয়। জেসাস এক নতুন ধরনের মানুষের প্রথম উদাহরণ, এই যুক্তি দেখিয়ে পল এই দর্শনকে আরও বিকশিত করেছেন। প্রাচীন ইসরায়েল যা কিছু অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে তিনি কেবল সেগুলো অর্জনই করেননি, বরং এক নতুন আদমে পরিণত হয়েছেন, এক নতুন মানবতা যেখানে গোয়িমসহ সব মানুষ যেভাবেই হোক যোগ দিতে বাধ্য।[২২] আবার, এটার সঙ্গে বৌদ্ধদের বিশ্বাস, যেহেতু সকল বুদ্ধ পরমসত্তার সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছেন, সেহেতু, এক বুদ্ধসমাজে (Buddhahood) যোগ দেওয়াই মানুষের আদর্শ হতে ভিন্ন নয়।
ফিলিপিন্থ চার্চের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে কিছু জরুরি প্রসঙ্গ উত্থাপনকারী গোড়ার দিকের ক্রিশ্চান-হাইম বলে বিবেচিত গানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন তিনি। নবদীক্ষিতদের তিনি বলেছেন, তাদের অবশ্যই জেসাসের মতো আত্মত্যাগের প্রবণতা থাকতে হবে,
ঈশ্বরের স্বরূপ বিশিষ্ট থাকিতে তিনি ঈশ্বরের
সমান থাকা ধরিয়া লইবার বিষয় জ্ঞান করিলেন না,
কিন্তু আপনাকে শূন্য করিলেন,
দাসের রূপ ধারণ করিলেন,
মনুষ্যদের সাহায্যে জন্মিলেন;
এবং আকারে প্রকারে মনুষ্যবৎ প্রত্যক্ষ হইয়া
আপনাকে অবনত করিলেন;
মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি, ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত আজ্ঞাবহ হইলেন।
এই কারণ ঈশ্বর তাহাকে অতিশয় উচ্চ-পদান্বিতও করিলেন,
এবং তাহাকে সেই নাম দান করিলেন,
যাহা সমুদয় নাম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ;
যেন যীশুর নামে স্বর্গ, মর্ত্য পাতালনিবাসীদের
‘সমুদয় জানু পতিত হয়, এবং সমুদয় জিহ্বা যেন স্বীকার করে’
যে যীশু খৃস্টের প্রভু (Kyrios),
এই রূপে পিতা ঈশ্বর যেন মহিমান্বিত হন।[২৩]
এই প্রার্থনা সঙ্গীতে যেন ক্রিশ্চানদের এমন একটা বিশ্বাস প্রতিফলিত হচ্ছে যে ‘আত্মশূন্য’ (Kenosis) করার ভেতর দিয়ে মানুষ হওয়ার আগে জেসাস ‘ঈশ্বরের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন, এবং মানবরূপে বোধিসত্তার মতো মানবীয় অবস্থার দুর্ভোগের অংশীদার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অনন্ত কাল ধরে YHWH-এর পাশে দ্বিতীয় স্বর্গীয় সত্তা হিসাবে খৃস্টের অস্তিত্বের ধারণা গ্রহণ করা পলের মতো ইহুদির পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রার্থনা সঙ্গীত দেখাচ্ছে মহিমান্বিত হওয়ার পরেও জেসাস ঈশ্বরের চেয়ে ভিন্ন এবং নিম্নস্তরে রয়ে গেছেন। ঈশ্বর তাকে উন্নীত করে কাইরিয়স উপাধি দিচ্ছেন। জেসাস নিজে এই উপাধি গ্রহণ করতে পারেন না, উপাধিটি দেওয়া হয়েছে কেবল পিতা ঈশ্বরের মহিমায়।
