বুদ্ধ এবং বোধিসত্তাদের প্রতি এই ভক্তির সঙ্গে জেসাসের প্রতি ক্রিশ্চানদের ভক্তির মিল আছে। এটা ধর্মকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে, যেমন পল ইহুদিদের গোয়িমদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। একই সময়ে হিন্দুদের মাঝেও একই ধরনের ভক্তির একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিলেন অন্যতম বৈদিক দেবতা শিব এবং বিষ্ণু। তারপরও সাধারণ মানুষের ভক্তি উপনিষদের দার্শনিক মিতাচারের চেয়ে শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছিল। কার্যত, হিন্দুরা এক ত্রিত্ববাদ জন্ম দিয়েছিল: ব্রক্ষ্মা, শিব এবং বিষ্ণু ছিলেন এক একক অলৌকিক সত্তার তিন প্রতীক বা বৈশিষ্ট্য।
অনেক সময় শিবরূপে ঈশ্বরের রহস্য সম্পর্কে চিন্তাভাবনা অনেক সহজ হয়ে থাকে: তিনি একাধারে ভালো-মন্দ, উর্বরতা-সংযমের দেবতা, যিনি স্রষ্টা এবং ধ্বংসকারী। জনপ্রিয় কিংবদন্তী অনুযায়ী শিব একজন মহান যোগিও ছিলেন, আবার ভক্তবৃন্দকে তিনি ধ্যানের মাধ্যমে ঈশ্বর সম্পর্কে ব্যক্তিগত ধারণার উর্ধ্বে ওঠারও অনুপ্রেরণা যোগান। বিষ্ণু মূলত আরও দয়াময় ও কর্মতৎপর। তিনি বিভিন্ন অবতাররূপে মানুষের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত রূপ হচ্ছে কৃষ্ণ চরিত্রটি, যিনি অভিজাত পরিবারে জন্ম নিলেও বেড়ে উঠেছিলেন রাখাল হিসাবে। জনপ্রিয় কিংবদন্তীগুলোয় রাখালীনিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গল্প অত্যন্ত প্রিয়, এসব গল্প ঈশ্বরকে আত্মার প্রেমিক হিসাবে উপস্থাপন করেছে। তারপরেও ভগবদ গীতায় বিষ্ণু যখন কৃষ্ণরূপে রাজপুত্র অর্জুনের সামনে উপস্থিত হন সে এক, ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা:
হে ঈশ্বর, তোমার দেহে আমি দেবতাদের দেখি,
আর বহু প্রাণের অস্তিত্ব:
মহাবিশ্বের স্রষ্টা ব্রহ্মা,
বসে আছেন পদ্ম সিংহাসনে,
দেবতা সকল আর স্বর্গীয় সরিসৃপ।[১২]
যেভাবেই হোক, কৃষ্ণের দেহে সব কিছুই আছে তার কোনও আদি বা অন্ত নেই, মহাশূন্য পূর্ণ করে আছেন তিনি এবং সব সম্ভাব্য উপাস্যদের ধারণ করছেন: ‘সংক্ষুব্ধ ঝড়-দেবতা, সূর্য দেবতাগণ, উজ্জ্বল দেবতাগণ এবং ‘আচারের দেবতাগণ।’[১৩] তিনি মানুষের ক্লান্তিহীন চেতনা’, মানুষের মূল সত্তা।[১৪] সমস্ত কিছু কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হয়: সমস্ত নদীসমূহ যেমন সাগরের দিকে ধেয়ে যায় বা আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে মথ। এই ভয়ানক দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে সম্পূর্ণ দিশাহারা অর্জুনের কম্পিত হওয়া আর কিছুই করার থাকে না।
ভক্তির বিকাশ পরম সত্তার সঙ্গে মানুষের যেকোনও ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার গভীর চাহিদার জবাব দেয়। ব্রাক্ষ্মণকে পুরোপুরি দুয়ে হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার পর তার একেবারে দূরবর্তী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রাচীন ‘স্কাই গডে’র মতো মানুষের চেতনা থেকে পুরোপুরি মুছে যেতে পারেন তিনি। বুদ্ধ ধর্মে বোধিসত্তা মতবাদ এবং বিষ্ণুর অবতারসমূহ যেন ধর্মীয় বিকাশের আরেকটি পর্যায় নির্দেশ করে, যখন মানুষ পরম সত্তা মানুষের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হতে পারে না বলে জোর দিয়েছে। এইসব প্রতীকী মতবাদ এবং মিথ একটামাত্র এপিফ্যানি দিয়ে পরম সত্তাকে প্রকাশ করার ব্যাপারটি অস্বীকার করে: বোধিসত্তা এবং বুদ্ধের কোনও সীমা পরিসীমা নেই; আর অসংখ্য অবতার রয়েছে বিষ্ণুর। এসব মিথ মানুষের জন্যে আদর্শও প্রকাশ করে: মানবজাতিকে আলোকপ্রাপ্ত বা দেবতৃপ্রাপ্ত হিসাবে দেখায় এগুলো, যা মানুষের উদ্দীষ্ট।
সিই প্রথম শতাব্দী নাগাদ ইহুদিদেরও একই ধরনের স্বর্গীয় পরিব্যাপীতার তৃষ্ণা দেখা দিয়েছিল। জেসাসের ব্যক্তিসত্তা এই চাহিদা মিটিয়েছিল বলে মনে হয়। আমাদের জানা ক্রিস্টান ধর্মটির স্রষ্টা গোড়ার দিকের ক্রিশ্চান লেখক সেইন্ট পল বিশ্বাস করতেন, জেসাস জগতে ঈশ্বরের মূল প্রত্যাদেশ হিসাবে তোরাহুকে প্রতিস্থাপিত করেছেন।[১৫] তিনি একথা দিয়ে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, জানা সহজ নয়। পলের পত্রাবলী এক সুসমন্বিত ধর্মতত্ত্বের বিবরণ চেয়ে বরং কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্নমালার উত্তর। জেসাসকে তিনি অবশ্যই মেসায়াহ্ বলে বিশ্বাস করতেন: ‘ক্রাইস্ট’ শব্দটি হিব্রু মসিয়াক শব্দটির অনুবাদ, যার অর্থ মনোনীত জন। পল ব্যক্তি জেসাস সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলেছেন যেন তিনি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি কিছু ছিলেন, যদিও ইহুদি হিসাবে পল জেসাস ঈশ্বরের অবতার ছিলেন বলে বিশ্বাস করতেন না। জেসাস সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বারবার যিশু খৃস্টে (In christ) শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন: ক্রিশ্চানদের বাস ‘যিশু খৃস্টে’, তাঁর মৃত্যুতে তারা ব্যাপ্টাইজ হয়েছে, চার্চ কোনওভাবে তাঁর দেহ গঠন করেছে।[১৬] পল যুক্তি দিয়ে এই সত্যের পক্ষে কথা বলেননি। বহু ইহুদির মতো তিনি গ্রিক যুক্তিবাদের প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন, যাকে তিনি স্রেফ ‘বোকামি’[১৭] বলে বর্ণনা করেছেন। এক আধ্যাত্মিক ও অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতার ফলে তিনি জেসাসকে এক ধরনের পরিবেশ হিসাবে বর্ণনা করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সেখানে আমরা বাস করি, চলাফেরা করি এবং আমাদের সত্তার সন্ধান পাই।[১৮] পলের ধর্মীয় বোধের উৎসে পরিণত হয়েছিলেন জেসাস: সেই কারণেই জেসাস সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলেছিলেন তিনি তাঁর সমসাময়িকরা যেমন করে ঈশ্বরের আলোচনা করে থাকবেন।
