প্রায় একই সময়ে ভারতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাবলীর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে জেসাসের চমকপ্রদ স্বর্গীয়করণের পেছনে ক্রিয়াশীল ধর্মীয় প্রেরণা বুঝতে পারি আমরা। বৌদ্ধ এবং হিন্দু উভয় ধর্মে স্বয়ং বুদ্ধ এবং মানবরূপে আবির্ভূত হিন্দু দেবতার মতো উন্নত সত্তার প্রতি প্রবল ভক্তি প্রকাশের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল । ভক্তি নামে পরিচিত এ ধরনের ব্যক্তিগত আনুগত্য, মানবায়িত ধর্মের জন্যে মানুষের চিরন্তন আকাক্ষার প্রকাশ বলে মনে হয়। এটা একেবারে নতুন ধরনের বিচ্যুতি হলেও উভয় ধর্মবিশ্বাসে অত্যাবশ্যকীয় শর্তাবলী বাদ না দিয়েই ধর্মের সঙ্গে যোগ করা হয়েছিল।
আনুমানিক বিসিই দুই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বুদ্ধের মৃত্যুর পর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তার একটা স্মৃতিচিহ্নের আকাঙ্ক্ষা করেছিল, কিন্তু তারা এও ভেবেছে যে কোনও মূর্তি নির্মাণ সঙ্গত হবে না, কেননা নির্বাণ লাভের পর স্বাভাবিক অর্থে তাঁর আর কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু তারপরেও বুদ্ধের প্রতি ব্যক্তিগত অনুরাগ ও তার আলোকপ্রাপ্ত মানব রূপ নিয়ে ধ্যান করার প্রয়োজন এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, শেষ অবধি বিসিই প্রথম শতাব্দীতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের গান্ধারা ও যমুনা নদী তীরবর্তী মথুরায় প্রথমবারের মতো তার মূর্তির আবির্ভাব ঘটে। এই প্রতিমাগুলো থেকে পাওয়া ক্ষমতা ও প্রেরণা বৌদ্ধ আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যদিও গৌতমের দেওয়া শিক্ষা অন্তরের শৃঙ্খলা ও সত্তার বাইরের কারও প্রতি ভক্তি প্রকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সব ধর্মই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়। তা না হলে সেগুলো অচল হয়ে পড়বে। অধিকাংশ বৌদ্ধের কাছে ভক্তি অপরিসীম মূল্যবান বলে মনে হয়েছে । এটা বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা বেশ কিছু আবশ্যকীয় সত্য তাদের মনে করিয়ে দেয়। স্মরণ করা যেতে পারে, বুদ্ধ প্রথম আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার পর ব্যাপারটি গোপন রাখতে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু যন্ত্রণাকাতর মানুষের প্রতি দরদ থেকে পরবর্তী চল্লিশ বছর পথ প্রদর্শনে বাধ্য হয়েছেন। তারপরেও বিসিই প্রথম শতাব্দী নাগাদ বৌদ্ধ মঙ্ক বা ভিক্ষুরা আপন নির্বাণ লাভের প্রয়াসে মঠে মঠে বন্দি হয়ে যাওয়ায় এই বিষয়টি বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছিলেন যেন। ভিক্ষু পেশা অত্যন্ত কঠিন ছিল বলে অনেকেই একে সাধ্যের অতীত মনে করেছে। সিই প্রথম শতাব্দীতে এক নতুন ধরনের বৌদ্ধ বীরের আবির্ভাব ঘটে: বোধিসত্তা, যিনি বুদ্ধের উদাহরণ অনুসরণ করেন এবং মানুষের জন্যে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে আপন নির্বাণ বিসর্জন দেন। দুর্গত মানুষকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে তিনি পুনর্জন্মের কষ্ট ভোগে প্রস্তুত। বিসিই প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে সংকলিত প্রজ্ঞা-পারমিতা সূত্ৰসমূহ (Sermons on the Perfection of Wisdom)-এ যেমন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বোধিসত্তারা:
আপন নির্বাণ লাভের আকাঙ্ক্ষা করেন না। বরং বিপরীতে, তাঁরা সত্তার অত্যন্ত যন্ত্রণাময় পৃথিবী জরিপ করেছেন, কিন্তু তারপরেও উচ্চমার্গের আলোক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা করেন, জন্ম ও মৃত্যুর পালায় কম্পিত ওরা নন। পৃথিবীর প্রতি করুণাবশত পৃথিবীর উপকার সাধনের ব্রত নিয়েছেন ওরা, পৃথিবীকে শান্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ওরা স্থির করেছেন: ‘আমরা পৃথিবীর জন্যে আশ্রয়ে পরিণত হব, পৃথিবীর বিশ্রামের স্থল, পৃথিবীর পরম স্বস্তি, পৃথিবীর শান্তির দ্বীপ, পৃথিবীর আলোকমালা, পৃথিবীর উদ্ধারপ্রাপ্তির উপায়ের পথ প্রদর্শক।’[১১]
এছাড়াও, বোধিসত্ত্ব অপরিসীম মেধার অধিকারী হয়েছিলেন, যা আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে দুর্বলকে সাহায্য করতে সক্ষম। বোধিসত্তার কাছে প্রার্থনাকারী বৌদ্ধ জগতের এক স্বর্গে পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে পারবে, যেখানকার পরিবেশ আলোকপ্রাপ্তি অনেক সহজ করে দেবে ।
টেক্সট জোর দিয়েছে যে এসব ধারণা আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করার নয়। এগুলো মামুলি যুক্তি বা পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহের সাথে সম্পর্কহীন, বরং স্রেফ ধরাছোঁয়ার অতীত এক সত্যের প্রতীক মাত্র। সিই দ্বিতীয় শতাব্দীর গোড়ার দিকে দার্শনিক নাগার্জুন দ্বন্দ্বমূলক শূন্য (void) মতবাদের প্রবর্তক, সাধারণ ধারাণাগত ভাষার অপূর্ণাঙ্গতা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে বিপরীত ও দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির ব্যবহার করেছিলেন তিনি। তার জোরাল বক্তব্য ছিল পরম সত্য কেবল সাধনা বা ধ্যানের মাধ্যমে মানসিক শৃঙ্খলার ভেতর দিয়েই অর্জন করা। সম্ভব। এমনকি বুদ্ধের শিক্ষাও ছিল প্রথাগত, মানবসৃষ্ট ধারণা যা তিনি যে সত্য বোঝানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন তার প্রতি সুবিচার করেনি। এই দর্শন গ্রহণকারী বৌদ্ধরা এমন ধারণা গড়ে তুলেছিল যে, আমরা যা কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করি তা আসলে মায়া। পশ্চিমে আমরা এদের হয়তো আদর্শবাদী বলব । সকল বস্তুর মূল সত্তা, পরম বা অ্যাবসোলিউট আসলে শূন্য, কিছু না, স্বাভাবিক জ্ঞানে যার কোনও অস্তিত্ব নেই। এই শূন্যতাকে নির্বাণের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলাটা স্বাভাবিক। যেহেতু গৌতমের মতো একজন বুদ্ধ নির্বাণ লাভ করেছেন, এর মানে অলৌকিক কোনও উপায়ে তিনি স্বয়ং নির্বাণে পরিণত হয়েছেন, পরমের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছেন। সুতরাং নির্বাণাকাক্ষী প্রত্যেকেই বুদ্ধদের সঙ্গে একীভূত হওয়ারও প্রত্যাশী।
