জেসাসের মৃত্যুর পর অনুসারীরা তিনি স্বর্গীয় সত্তা ছিলেন বলে সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাপারটি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ঘটেনি, আমরা যেমনটি দেখব, জেসাস মানবরূপে ঈশ্বর ছিলেন, এই মতবাদ চতুর্থ শতাব্দীর আগে চুড়ান্ত হয়নি। ক্রিশ্চানদের অবতারবাদে বিশ্বাস ধীরে ধীরে, জটিল এক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে। জেসাস নিঃসন্দেহে কখনও নিজেকে ঈশ্বর দাবি করেননি। দীক্ষা গ্রহণের সময় স্বর্গীয় কণ্ঠস্বর তাঁকে ‘ঈশ্বর পুত্র’ বলে আহ্বান করেছিল, কিন্তু এটা হয়তো প্রিয় মেসায়াহ হিসাবে তার স্বীকৃতি ছিল। আকাশ থেকে ধ্বনিত এধরনের ঘোষণায় তেমন অস্বাভাবিক কিছু ছিল না প্রায়শঃই, র্যাবাইগণ প্রায়শঃই তাদের ভাষায় বাত কোল- আক্ষরিক অর্থে, “কণ্ঠস্বরের কন্যা”-এর অনুভূতি লাভ করতেন, যা ছিল সরাসরি পয়গম্বর সুলভ প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির বিকল্প একধরনের অনুপ্রেরণা।[৭] পবিত্র আত্মা যখন র্যাবাই ইয়োহান্নান বেন যাক্কাই ও তার অনুসারীদের ওপর আগুনের রূপ নিয়ে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর মিশনের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, সেই সময় এরকম বাত কোল শুনতে পেয়েছিলেন তিনি। জেসাস স্বয়ং নিজেকে ‘দ্য সান অভ ম্যান’ হিসাবে পরিচয়। দিতেন। এই উপাধি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু এটা মনে হয় যে মূল আরামাইক বাকধারা বার নাশা মানবীয় অবস্থার দুর্বলতা এবং মরণশীলতার উপরই জোর দিয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে জেসাস নিজেকে ক্রমে একদিন কষ্ট সয়ে মারা যাবেন এমন একজন অসহায় মানব সন্তান হওয়ার ব্যাপারে জোর দিয়ে বরং অপ্রত্যাশিত কাজই করে থাকবেন।
অবশ্য গস্পেলসমূহ আমাদের বলে যে, ঈশ্বর জেসাসকে নির্দিষ্ট কিছু স্বর্গীয় ‘ক্ষমতা’ (dunamis) দিয়েছিলেন যে কারণে তিনি কিছুটা মরণশীল থাকলেও রোগ মুক্ত করা ও পাপ মোচনের মতো ঈশ্বর-সম কাজ করার সমর্থ হয়েছিলেন। সুতরাং লোকে যখন জেসাসকে কর্মরত দেখেছে, তখন তারা ঈশ্বর কেমন তার জীবন্ত, চলমান মূর্তির দেখাই পেয়েছে। একবার তাঁর তিন শিষ্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে তাঁকে দেখার দাবি করেছেন । এ কাহিনীটি তিনটি সিপনোটিক গস্পেলেই রক্ষিত আছে। পরবর্তীকালের ক্রিশ্চানদের কাছে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এখানে বলা হয়েছে, পিটার, জেমস এবং জন নামের তিনজন অনুসারীসহ এক উঁচু পাহাড়ে উঠেছিলেন জেসাস-ওটাকে সাধারণভাবে গ্যালিলির তাবর পাহাড় বলে মনে করা হয়। সেখানে অনুসারীদের সামনে ‘দেহের পরিবর্তন’ ঘটান তিনিঃ তাঁহার মুখ সূর্যের ন্যায় দেদীপ্যমান এবং তাহার বস্ত্র দীপ্তির ন্যায় শুভ্র হইল।[৮] আইন ও পয়গম্বরদের প্রতিভূ হিসাবে মোজেস ও এলিযা সহসা তাঁর পাশে হাজির হলেন এবং তিনজনে কথোপকথনে লিপ্ত হলেন। পিটার পুরোপুরি হতবিহ্বল হয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, কি বলছেন বুঝতে পারেননি, এই দিব্যদর্শনকে স্মরণীয় করে রাখতে ওদের তিনখানা কুটির নির্মাণ করতে হবে। সিনাই পর্বতে মোজেসের ওপর নেমে আসা সেই উজ্জ্বল মেঘের মতো মেঘ পাহাড়চূড়া ঢেকে ফেলে এবং একটা বাত কোল ঘোষণা দেয়: ইনিই আমার প্রিয় পুন্ত্র, ইহাতেই আমি প্রীত, ইহার কথা শুন।[৯] বহু শতাব্দী পরে গ্রিক ক্রিশ্চানরা এই দিব্যদর্শনের অর্থ নিয়ে ভাবতে গিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ঈশ্বরের ক্ষমতাই জেসাসের পরিবর্তিত দেহায়বয়বের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তারা আরও উল্লেখ করেছে যে জেসাস কখনও এইসব স্বর্গীয় ক্ষমতা বা দিনামেইজ কেবল নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকার দাবি করেননি। জেসাস বারবার অনুসারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারা বিশ্বাস রাখলে অবশ্যই এসব ‘ক্ষমতা’ ভোগ করতে পারবে। বিশ্বাস দিয়ে অবশ্যই সঠিক ধর্মতত্ত্ব গ্রহণ করার কথা বোঝননি তিনি, বরং ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ এবং উন্মুক্ত হওয়ার এক অন্তর্গত প্রবণতার চর্চার কথা বুঝিয়েছেন। অনুসারীরা মনে কোনও রকম সন্দেহ পুষে না রেখে ঈশ্বরের কাছে উন্মুক্ত হতে পারলে তার মতো তারাও সব কিছু করতে পারবে । র্যাবাইদের মতো জেসাস একথা বিশ্বাস করতেন না যে আত্মা (Spitit) কেবল সুবিধাপ্রাপ্ত অভিজাতদের জন্যে, বরং সদিচ্ছাধারী সকল মানুষের কোনও কোনও অনুচ্ছেদে সেই র্যাবাইদের কারও কারও মতে এমনও মত প্রকাশিত হয়েছে যে, এমনকি গোয়িমরাও ‘আত্মাকে গ্রহণ করতে পারে বলে বিশ্বাস করতেন জেসাস। তাঁর অনুসারী ‘বিশ্বাস’ থাকলে তারা এমনকি আরও বড় কেরামতি দেখাতে পারবে। কেবল তারা যে পাপ মোচন ঘটাতে আর দূরাত্মা তাড়াতে পারবে তাই নয়, গোটা একটা পাহাড়কে সাগরে ছুঁড়ে ফেলতে পর্যন্ত সক্ষম হবে।[১০] তারা আবিষ্কার করবে যে তাদের নাজুক মরণশীল জীবনই মেসিয়ানিক রাজ্যে ক্রিয়াশীল ঈশ্বরের ‘ক্ষমতা’য় অলৌকিক রূপ ধারণ করেছে।
জেসাসের মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীরা এই বিশ্বাস ত্যাগ করতে পারেনি যে তিনি কোনও না কোনওভাবে ঈশ্বরের একটা ইমেজের ধারক ছিলেন। প্রায় সূচনা থেকেই তারা জেসাসকে উদ্দেশ্য করে প্রার্থনা শুরু করেছিল। সেইন্ট পলের বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বরের ক্ষমতাকে গোমিয়দের কাছে গ্রহণ উপযোগি করে তোলা উচিত, তিনি তাই বর্তমান তুরস্ক, ম্যাসিদোনিয়া-এর গ্রিসে গস্পেল প্রচার করেছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কোনও অ-ইহুদি মোজেসের আইনের পুরোপুরি অনুসরণ না করেও নব্য ইসরায়েলের সদস্য হতে পারে। এতে অনুসারীদের মূল দলটি ক্ষুব্ধ হয়, আলাদা ইহুদি গোত্র হিসাবে পরিচিত হতে চেয়েছিল ওরা। এক আবেগময় বিরোধের পর পলের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায় তারা। অবশ্য পলের ধর্মান্তরিতদের অধিকাংশই ছিল ডায়াসপোরার ইহুদি বা ‘গডফিয়ারার’, ফলে নব্য ইসরায়েল গভীরভাবে ইহুদিবাদী রয়ে গিয়েছিলে। পল কখনওই জেসাসকে ‘ঈশ্বর’ সম্বোধন করেননি। তিনি ইহুদি অর্থে তাঁকে ‘সান অভ গড়’ বলে ডেকেছেন; জেসাস স্বয়ং ঈশ্বরের অবতার ছিলেন, একথা তিনি বিলকুল বিশ্বাস করতেন নাঃ স্রেফ ঈশ্বরের ক্ষমতা’ আর ‘আত্মা ছিল তার আয়ত্তে যা পৃথিবীতে ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডের প্রকাশ ঘটায় এবং স্বর্গীয় সত্তার সঙ্গে যাকে একাকার করা যায় না। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, জেন্টাইল জগতে নব্য-ক্রিশ্চানরা এই সূক্ষ্ম পার্থক্যের বোধ বজায় রাখত না; ফলে শেষ পর্যন্ত একজন মানুষ যে দুর্বল ও মরণশীল মানবজীবনের ওপর জোর দিয়েছেন তাঁকে স্বর্গীয় বলে বিশ্বাস করা হয়েছে। জেসাসের দেহে ঈশ্বরের অবতারের ধারণা বা মতবাদ বরাবরই ইহুদিদের বিক্ষুব্ধ করেছে, এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিমরাও ব্লাসফেমাস বলে আবিষ্কার করবে। সুনির্দিষ্ট বিপদ সম্বলিত কঠিন মতবাদ এটা। ক্রিশ্চানরা প্রায়শঃই আনাড়িভাবে একে ব্যাখ্যা করে থাকে। তারপরেও ধর্মের ইতিহাসে এ ধরনের অবতারবাদী ভক্তি মোটামুটি একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য: আমরা দেখব, এমনকি ইহুদি ও মুসলিমরাও আশ্চর্যরকম সাদৃশ্যপূর্ণ নিজস্ব ধর্মতত্ত্বের জন্ম দিয়েছে।
