আনুমানিক সিই ৩০ সালে জেসাসের মৃত্যুর সময় ইহুদিরা আন্তরিকভাবে গোড়া একেশ্বরবাদী ছিল, সুতরাং মেসায়াহ স্বর্গীয় সত্তা হবেন এমনটা কেউ আশা করেনিঃ তিনি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হলেও একজন সাধারণ মানুষই হবেন । কোনও কোনও র্যাবাই মত প্রকাশ করেছেন যে, অনন্তকাল থেকেই ঈশ্বর তাঁর নাম ও পরিচয় জানতেন। সুতরাং, এদিক দিয়ে ভাবলে একথা বলা যেতে পারে যে, সময়ের সূচনার আগে থেকেই প্রোভাবর্স এবং এক্লেসিয়াস্টিকাসের স্বর্গীয় প্রজ্ঞার সত্তার মতো একই প্রতীকী রূপে ঈশ্বরের সঙ্গে ছিলেন মেসায়াহ্। ইহুদিরা মনোনীত সত্তা মেসায়াহকে জেরুজালেমে প্রথমবারের মতো স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী রাজা ও আধ্যাত্মিক নেতা রাজা ডেভিডের বংশধরকে প্রত্যাশা করেছিল। শ্লোক (Psalms) সমূহ কখনও কখনও ডেভিড বা মেসায়াহকে ঈশ্বরের পুত্র’ অ্যাখ্যা দিয়েছে, কিন্তু সেটা ছিল ইয়াহ্ওয়েহ্র সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতা বোঝানোর একটা স্বাভাবিক কায়দা। বাবিলন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে গোয়িমদের ঘৃণিত উপাস্যদের মতো ইয়াহ্ওয়েহ্রও একজন পুত্র আছে, এটা কল্পনাও করেনি কেউ।
আদি রচনা হিসাবে সবচেয়ে বিশ্বস্ত বিবেচিত মার্কের গস্পেল জেসাসকে সম্পূর্ণ সাধারণ স্বাভাবিক মানুষ হিসাবে উপস্থাপন করেছে, যার পরিবার আছে, আছে ভাই ও বোন। কোনও দেবদূত তার জন্মের ঘোষণা দেয়নি বা তাঁর দোলনাকে ঘিরে গান করেনি। শিশু বা কৈশোরে কোনওভাবেই তাঁকে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বলে মনে হয়নি। যখন তিনি শিক্ষা দান শুরু করেন, নাযারেথের শহরবাসীরা একজন সামান্য ছুতোরের ছেলের এমন প্রতিভাবান হয়ে ওঠায় বিস্মিত হয়েছিল । জেসাসের কর্মজীবন দিয়ে বর্ণনা শুরু করেছেন মার্ক। মনে হয়, তিনি সম্ভবত মূলত ভবঘুরে সন্ন্যাসী জন দ্য ব্যাপটিস্ট-এর অনুসারী ছিলেন, যিনি সম্ভবত একজন এসিন: জেরুজালেমকে মারাত্মকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত বিবেচনা করেছেন জন এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় প্রচারণা চালিয়েছেন। জনগণকে অনুশোচনা করে জর্দান নদীতে স্নান করে পবিত্র হওয়ার এসিন আচার আপন করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। লুক জেসাস এবং জন প্রকৃতই সম্পর্কিত ছিলেন বলে মত প্রকাশ করেছেন। জনের কাছে দীক্ষা নেওয়ার জন্যে নাযারেথ থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জুদাহয় এসেছিলেন জেসাস। মার্ক যেমন আমাদের বলছেন: “আর তৎক্ষণাৎ জলের মধ্য হইতে উঠিবার সময়ে দেখিলেন, আর স্বর্গ হইতে এই বাণী হইল, “তুমিই আমার প্রিয় পুত্র, তোমাতেই আমি প্রীত”।[১] জেসাসকে নিমেষে মেসায়াহ বলে শনাক্ত করেছেন জন দ্য ব্যাপটিস্ট। জেসাস সম্পর্কে এরপর আমরা যা শুনতে পাই তা হলো, তিনি গ্যালিলির সমস্ত গ্রাম আর শহরে ‘ঈশ্বরের রাজ্য সন্নিকট হইল’[২] ঘোষণাসহ শিক্ষা দান শুরু করেছিলেন।
জেসাসের মিশনের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে নানান ধারণা রয়েছে। তাঁর বাণীর খুব অল্প অংশই গস্পেলসমূহে নথিভুক্ত করা হয়েছিল বলে মনে হয় এবং পরবর্তীকালের পরিমার্জনায় এসব বাণীর অনেকাংশই তার মৃত্যুর পর সেইন্ট পল প্রতিষ্ঠিত চার্চসমূহে বিকৃত বা পরিবর্তিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, এমন কিছু সূত্র রয়ে গেছে যেগুলো তার কর্মধারার আবশ্যকীয় ইহুদি প্রকৃতির প্রতি ইঙ্গিত দেয়। ফেইথ হীলারবা গ্যালিলির পরিচিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে: জেসাসের মতোই ভিক্ষুকের জীবন যাপন করত তারা, ধর্মপ্রচার করত, অসুস্থদের সারাত এবং দুরাত্মা তাড়াত। আবার জেসাসের মতোই এইসব গ্যালিলিয় পবিত্র ব্যক্তির বিপুল সংখ্যক নারী শিষ্য থাকতে দেখা যেত। অন্যরা যুক্তি দেখিয়ে থাকেন যে, জেসাস সম্ভবত হিল্লেল-এর মতো একই ভাবধারার ফারিজি ছিলেন, ঠিক পলের মতো, যিনি খৃস্টধর্মে দীক্ষা নেওয়ার আগে নিজেকে ফারিজি দাবি করেছিলে। তিনি র্যাবাই গামালিয়েলের শিষ্য ছিলেন বলে বর্ণিত আছে।[৩] নিঃসন্দেহে জেসাসের শিক্ষা ফারিজিদের প্রধান মতামতের অনুসারী ছিল, কারণ তিনিও বিশ্বাস করতেন যে দান ও প্রেমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ mitzvot; ফারিজিদের মতো তোরাহুর অনুসারী ছিলেন তিনি এবং বলা হয়ে থাকে যে সমসাময়িকদের তুলনায় অনেক কঠোর অনুসরণের শিক্ষা দিতেন।[৪] হিল্লেলের সোনালি বিধির (Golden Rule) একটি ভাষ্যের শিক্ষা দিয়েছিলেন তিনি, তার যুক্তি ছিল গোটা আইনকে ‘সর্ববিষয়ে তোমরা যাহা যাহা ইচ্ছা কর যে, লোকে তোমাদের প্রতি করে, তোমরাও তাহাদের প্রতি তাহা করিও এই একটা মাত্র সাধারণ বাক্য প্রকাশ সম্ভব।’[৫] সেইন্ট ম্যাথুর গস্পেলে জেসাস ‘স্ক্রাইব ও ফারিজিদের’ বিরুদ্ধে তীব্র ও অশ্লীল মন্তব্য উচ্চারণ করেছেন, তাদেরকে ভয়ানক কপটাচারী হিসাবে তুলে ধরেছেন।[৬] এটা প্রকৃত তথ্যের বা ঘটনার বিকৃত বিবৃতি এবং জেসাসের মিশনের মূল বৈশিষ্ট্য দানের মারাত্মক লজ্জন তো বটেই সেই সঙ্গে ফারিজিদের বিরুদ্ধে তিক্ত বিষোদগারও প্রায় নিশ্চিতভাবেই অসত্যও। উদাহরণ স্বরূপ, লুক তাঁর গস্পেল এবং অ্যাক্টস অভ দ্য অ্যাপসলস উভয়েই ফারিজিদের প্রতি বেশ সুবিচার করেছেন এবং ফারিজিরা যদি সত্যি জেসাসকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া চরম শত্রু হতো তাহলে পল তার ফারিজি পটভূমি নিয়ে বাগাড়ম্বর। করতে যেতেন না। ম্যাথুর গস্পেলের অ্যান্টি-সেমিটিক সুর ৮০র দশকে ইহুদি ও ক্রিশ্চানদের মধ্যকার টানাপোড়েন তুলে ধরে। গস্পেল প্রায়ই দেখায় জেসাস ফারিজিদের সঙ্গে তর্ক করছেন, কিন্তু আলোচনা হয় আন্তরিকতাপূর্ণ কিংবা শাম্মাইয়ের অধিকতর কঠোর মতবাদের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে।
